গ্রামের বাইরে ছোট্ট এয়ার স্ট্রিপে ল্যান্ড করলেন শাসা। ইঞ্জিন বন্ধ করে তাকালেন এলসা’র দিকে। বিস্মিত চোখ জোড়া প্রায় ধর্মীয় ভাবাবেশের মতই বিভোর হয়ে আছে। “এবারে আফ্রিকা ক্যাথেড্রালে তোমার উপাসনার পালা।” মোলায়েম গলায় জানালেন শাসা।
“এই একটামাত্র জায়গায় খুঁজে পাবে পুরো মহাদেশের সত্যিকারের রহস্য আর বিশালতা।”
***
ভাগ্য ভালো যে হোটেলে লিভিংস্টোন সুইট খালি পেয়ে গেলেন শাসা আর এলসা।
প্রাচীন আমলের নকশা মেনে তৈরি করা হয়েছে পুরো দালান। দেয়ালগুলো পুরু আর রুমগুলোও বেশ বড় বড়; একই সাথে ঠাণ্ডা আর আরামদায়য়কও বটে।
ডেভিড লিভিংস্টোনের প্রথমবার আবিষ্কারের মাত্র কিছু বছর পরেই-জলপ্রপাতটা খুঁজে পান অভিযাত্রী থমাস বেইনস; উনার আঁকা ড্রইং এর প্রিন্ট আউট দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো সুইট। সিটিং রুমের জানালা দিয়ে তাকাতেই গিরি সংকর আর উপরকার রেলওয়ে সেতু দেখা গেল। পুরো কাঠামোটা এতটা হালকা দেখাচ্ছে যে ঠিক যেন একটা উড়ন্ত ঈগলের পাখা।
সুইট থেকে বের হয়ে হাতে হাত রেখে পায়ে হাঁটা পথ ধরে দুজনে ঘুরে দেখল গিরিখাদ, রেইন ফরেস্ট পানির ফোয়ারা। নিরন্তর পানি পাওয়ায় এখানকার উদ্ভিদ প্রজাতি অত্যন্ত সবুজ। আছড়ে পড়া পানির ভার কাঁপছে পায়ের নিচের জমিন। পানির ছিটে এসে ভিজিয়ে দিল দুজনের পোশাক, মাথা, চুল। আনন্দে হেসে ফেললেন শাসা আর এলসা।
একেবারে কিনারের কাছে পড়ে থাকা পাথরের উপর দু’জনে পাশাপাশি বসে গিরিখাদের উপর পা ঝুলিয়ে দিলেন; ঠিক নিচেই সবুজ রঙা ঘূর্ণি বানিয়েছে উন্মত্ত জল।
“দেখো!” আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন শাসা। সূর্যের কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একটা শিকারি পাখি; ছুরির ফলার মতো পাখাগুলো সোজা তীরবেগে নেমে আসছে নিচে।
“টাইটা’র বাজপাখি।” উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন শাসা, “আফ্রিকার সবচেয়ে রেয়ার পাখিগুলোর একটি।”
উড়ন্ত অবস্থাতেই শিকার ধরে নিল বাজপাখি, পালক ছড়িয়ে সাথে সাথে মেরেও ফেলল। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল বহু নিচে।
কুমিরের লেজের স্টেক দিয়ে ডিনার সারলেও স্বাদটা মনে হলো লবসটারের মতোই। কিন্তু স্যুইটে ঢুকতেই রাজ্যের লজ্জা এসে ঘিরে ধরল দু’জনকে। সিটিং রুমে বসে ক্যানাকে খেলেন শাসা। অবশেষে সাহস করে বেডরুমে ঢুকতেই দেখতে পেলেন বালিশের উপর শুয়ে থাকা এলসা। চকচকে কালো চুল ছড়িয়ে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে; কিন্তু হঠাৎ কেন যেন আতঙ্কে জমে গেলেন শাসা। শেষ বার দুয়েকের ঘটনাতে আত্মবিশ্বাসের অনেকখানিই টলে গেছে। আর বয়সও তো কম হল না।
অন্যদিকে হেসে ফেললেন এলসা। হাত দুটো তুলে আমন্ত্রণ জানালেন শাসা’কে। মনে মনে নিজেকে সামলালেন শাসা। চিন্তার কিছু নেই; এমনভাবে আর কোনো নারীকে দেখে এত আকর্ষণ বোধ করেননি আগে।
সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গার পরে পরস্পরকে একে অন্যের বাহুতে আবিষ্কার করলেন দুজনে। ততক্ষণে উঁচু জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে রোদ।
আত্মতৃপ্তিতে হেসে ফেললেন এলসা : “মাই ম্যান।”
***
একদিন পার হয়ে গেলেও শেষ হলো না তাদের হানিমুন। গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগল দিনের পর দিন। ছোট ছোট তুচ্ছ কাজগুলোও দুজনে মিলে একত্রে করে ফেলেন। এতদিন যেগুলো নিয়ে শাসা কোন চিন্তাই করতেন না। কিংবা সময়ও পেতেন না।
প্রতিদিনি দেরি করে ঘুম থেকে উঠেও বাকি সময়টা পুলের পাশে বসেই কাটিয়ে দেন শাসা আর এলসা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরস্পরের সান্নিধ্যে বসে বই পড়ে পার করে দেন আর সান ট্যান অয়েল লাগাবার অযুহাতে স্পর্শ করেন একে অন্যের দেহ।
এলসা’র পরিপূর্ণ নারী দেহে খুঁত বলতে শুধু সন্তান ধারণের চিহ্নগুলোই ফুটে আছে। কিন্তু এতে আরো বেশি করে আকৃষ্ট হন শাসা। ফুটে উঠেছে তার অভিজ্ঞতা আর জীবনবোধের নিদর্শন।
কথা বলার সময়ে যা আরো বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। গল্প করতে করতে কোথা দিয়ে যে অলস সময় ফুরিয়ে যায় কেউই টের পান না।
ব্রুনোর ক্যানসারে মৃত্যু আর তাঁর নিজের অসহায়তার কথা বলে যান এলসা। এরপর কেটে গেছে সাতটি বছর। ভেবেছিলেন সেই একাকীত্ব বুঝি আর কখনোই পূরণ হবে না; এরপর শাসা’র হাত ধরে বুঝিয়ে দেন যে, এবারে তিনি হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সন্ধান পেয়েছেন।
ছেলেমেয়েদের কথা জানিয়ে ছেলের ব্যাপারেও আপেক্ষ করেন পিতার মতো পরাক্রশালী হয়নি ব্রুনেনা।
নিজ পুত্রদের কথা স্মরণ করেন শাসা। দু’জনেই ভালবাসেন গান, বই আর থিয়েটার। দু’জনেরই আছে ঘোড়া আর শিকার প্রীতি। সবশেষে একে অন্যের কাছে স্বীকার করেছেন অর্থ আর ক্ষমতার প্রতি পরস্পরের দুবর্লতা।
কোনো কিছুই বাদ না দিয়ে এক পর্যায়ে তো এলসা বলেই ফেললেন যে, “আমার মনে হচ্ছে তুমি আর আমি মিলে চমৎকার একটা জুটি হবো।”
“আমিও তাই বিশ্বাস করি” গভীরভাবে বলে উঠলেন শাসা; যেন পরস্পরের কাছে প্রতিজ্ঞা করছেন।
“ওহ, ঈশ্বর!” সত্যিকার অর্থেই অবাক হয়ে গেছেন শাসা, “আজ বৃহস্পতিবার। চারদিন কেটে গেছে যে আমরা এখানে। বাচ্চারা নিশ্চয়ই চিন্তায় পড়ে গেছে।” খোলা ছাদে বসে নাশতা করছেন দু’জনে।
“আমার মনে হয় ওরা অনুমান করে নিয়েছে। শাসা’র জন্য আমের টুকরো কাটতে গিয়ে চোখ তুলে তাকালেন এলসা। হাসলেন।” আর আমার তো মনে হয় তোমার ভয়ংকর ছেলে-মেয়েগুলোকে বাচ্চা বলারও কিছু নেই।”
