ঝাড়া এক মিনিট ধরে নিঃশব্দে বসে আছেন শাসা আর এলসা। অবশেষে ছোট্ট একটা ক্লিক করে সেফটি ক্যাচ অফ করে রাইফেল নামিয়ে রাখলেন এলসা। চোখ ঘুরিয়ে শাসার দিকে তাকালেন। প্রভাতের আলোয় দেখা গেল মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু “এত সুন্দর!” ফিসফিসিয়ে উঠলেন এলসা, “আমি মারতে পারব না, অন্তত আজকে তো নয়ই।”
সাথে সাথে বুঝে ফেললেন শাসা। আজ তাদের দিন। দু’জনেই দুজনের প্রেমে পড়ে গেছেন।
“চিতাটাকে তোমাকে উৎসর্গ করলাম।” জানালেন এলসা।
“আমাকে এতটা সম্মান দেবার জন্য-” এলসা’কে কিস করলেন শাসা। প্রায় শিশুর মতই সরলভাবে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন দুজনে। এই মিলন হল আত্মিক। তাই আজকের মতো আশীর্বাদ ধন্য এই দিনে কোনো হত্যা নয়।
***
ঠিক যেন কাকতালীয় ভাবে সম্পূর্ণ সেরে উঠল শন। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে শিকারীদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। সাফারি কোম্পানির খ্যাতিই নির্ভর করে ক্লায়েন্টের অর্জনের উপর।
তাই টয়োটা ঢুকতেই আশা নিয়ে পেছনে তাকালেও অসন্তুষ্টিতে বেঁকে গেল মুখ। প্রথমেই কথা বলল মাতাতু’র সাথে। বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়ল জোরাবো ট্র্যাকার,
“শয়তানটা দেরিতে এসে তাড়াতাড়ি চলে গেছে।”
“আই এম সরি, সিগনোরারা।” ট্রাক থেকে এলসা’কে নামতে সাহায্য করল শন্।
“এটাই তো শিকার।” বিড়বিড় করে উঠলেন এলসা। মহিলার এমন দার্শনিক মার্কা চেহারা আগে আর কখনো দেখেনি শন। সাধারণত ব্যর্থ হলেই তার মতই ক্ষেপে উঠেন।
“যেমনটা পছন্দ করেন, সেভাবে হট শাওয়ার তৈরি করা আছে। নাশতা’ও এসে যাবে।”
ডাইনিং টেন্টে এলসা আর শাসা’কে ঢুকতে দেখেই সকলের চেহারায় ফুটে উঠল সান্তনা। দু’জনেই স্নান সেরে পরিষ্কার পোশাক পরেছেন। শাসা’তো একেবারে শেভ করে লোশনও লাগিয়েছেন।
“ব্যাড লাক্ বাবা; সো সরি সিগনোরা” সকলে মিলে বলে উঠলেও শাসা আর এলসা’র তৃপ্তি মাথা চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেল প্রত্যেকে। যাই হোক এমনভাবে নাশতা সারা হলো যেন বিশ্ব রেকর্ড হয়ে গেছে, চিতা মারা প্রতিযোগিতাতে।
“ব্রেকফাস্টের পরেই আমরা মিটিং শুরু করতে পারি।” পরামর্শ দিল গ্যারি।
“আর আমিও নতুন করে ফাঁদ পাতবো।” যোগ দিল শন্।
“মাতাতু বলেছে। চিতা’রা কখনোই আতঙ্কিত হয় না। তাই আজ রাতে আবার চেষ্টা করা যাবে। এইবার আপনার সাথে আমি যাবো। যার যার কাজ আসলে তাকেই করতে দিতে হয়।”
কিছু না বলে শাসার দিকে তাকালেন এলসা। তারপর চোখ নামালেন কফি-কাপে।
“আসলে, হয়েছে কী শুরু করলেন শাসা, “সত্যি কথা বলতে, আমি আর এলসা মানে সিগনোরা পিগটেলি আর আমি…” শব্দ খুঁজতে লাগলেন শাসা। হা করে বেকুব বনে যাওয়া বাবার দিকে তাকিয়ে রইল তিন ইয়াং কোর্টনি।
“তোমাদের বাবা আমাকে ভিক্টোরিয়া ফলস দেখাবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন।” শাসা’কে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন এলসা। কোন মতে বাঁচলেন শাসা।
“আমরা বীচক্রাফট নিয়ে যাবো।” তাড়াতাড়ি অজুহাত বানালেন, “সিগনোরা পিগটেলি কখনো জলপ্রপাতটা দেখেননি। তাই এ সুযোগটাই ভাল মনে হলো।”
পরিবারের অন্য সদস্যরাও হাফ ছেড়ে বাঁচল। “বাহু, আইডিয়াটা তো চমৎকার। এত সুন্দর একটা জায়গা, আপনার বেশ ভালো লাগবে। সিগনোরা।”
“মাত্র এক ঘণ্টার জার্নি।” মাথা নাড়ল গ্যারি। “আপনারা ভিক ফলস্ হোটেলে লাঞ্চ করে নাশতার আগেই এখানে ফিরতে পারবেন।”
“আর তারপরে চারটায় আবার চিতার খোঁজে হাইড আউটে যেতেও কষ্ট হবে না।” এমত হল শন্। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে এলসা’র সম্মতির জন্য।
আবারো চকিতে শাসা’র দিকে তাকালেন এলসা। বড় করে শ্বাস নিয়ে শাসা জানালেন, “আমরা আসলে ভিক ফলস হোটেলে দুই-একদিন বেড়াব।”
আস্তে আস্তে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা এসে ভর করল তরুণ মুখগুলোতে।
“ঠিক তাই। ঘুরে দেখতে তোমাদের তো সময় লাগবে। সবার আগে সম্বিত ফিরে পেল বেলা।
“বেলা ঠিকই বলেছে। তিন থেকে চারদিন লেগে যাবে সবটুকু ঘুরে দেখতে।”
“গ্যারি সপ্তাহ লেগে যাবে বললেই তো পারো।” শনে’র দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাল গ্যারি আর বেলা।
***
পরিষ্কার ঠাণ্ডা বাতাসের মাঝে ছড়ানো ছিটানো মেঘপুঞ্জ ভেদ করে আট মাইল দূরে দেখা দিল ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। দুই হাজার ফুট উঁচুতে সোজা আকাশের বুকে উঠে যাওয়া রুপালি পর্বতমালা ঠিক তুষারের মতই সাদা দেখাচ্ছে।
সামনেই সূর্যের আলো পড়ে চমকাচ্ছে বিশাল জাম্বোজি। একটু পরেই দেখা দিল প্রধান গিরি সংকট। নিচে তাকিয়ে নদীটা দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন শাসা আর এলসা। এক মাইলেরও বেশি চওড়া বড় সড় নদীটা তীব্র বেগে এসে নেমে গেছে ঝাড়া সাড়ে তিনশ ফুট নিচে। ফেনা আর ফেনা চারপাশে; ফোয়ারার মতো আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ছে পানি। গভীর খাদের কিনারে কালো পাথরের দুর্গ দু’ভাগ করে দিয়েছে নদী। এর উপরে টাওয়ারের মতো উঁচু হয়ে আছে ফোয়ারার মেঘ; চট করে তাকালে রংধনুর সাত রঙ দেখা যাবে।
জলপ্রপাতের নিচে নদীর সবটুকু পানি সেকেন্ডে আটত্রিশ হাজার কিউবিক ফুট হিসেবে পাথরের চূড়া দিয়ে ধেয়ে এসে পড়ছে গিরিখাদের ভেতরে।
ডান হাতি মোড় নিয়ে এয়ারক্রাফট চালাচ্ছেন শাসা; যেন নিচের দৃশ্য পুরোটাই উপভোগ করতে পারেন এলসা।
প্রতিবার ঘূর্ণনের সাথে আরো নিচে নেমে আসছে বীচ ক্রাফট। একবার তো রুপালি পানির ফোয়ারা এয়ারক্রাফটের গায়ে এমন ভাবে আচড়ে পড়ল যে খানিকের জন্য মনে হলো দুজন অন্ধ হয়ে যাবেন; আবার উর্বকাশে সূর্যের আলোয় উঠে গিয়ে রংধনুর হার দেখতে পেলেন শাসা আর এলসা।
