অন্ধকারের মাঝে স্পষ্ট শোনা গেল মাংসের গায়ে চোখা দাঁত বসিয়ে ছিঁড়ে খাওয়ার শব্দ।
রাতটা অসম্ভব দীর্ঘ হলেও একটুও ঘুমাতে পারলেন না শাসা। শিকারি হিসেবে উনার দায়িত্ব হলো চিতা বাঘটার দিকে লক্ষ রাখা। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা। পরেই কাঁধে ধাক্কা খেল এলসার ঘুমন্ত মুখ। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন শাসা; যেন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন এলসা।
ক্লান্ত, ছোট্ট একটা শিশুর মতই অঘোরে ঘুমালেন এলসা। শাসা’র গালে এসে লাগছে নিঃশ্বাসের উষ্ণতা। নিজের হাত দুটো একেবারে অবশ হয়ে গেলেও একটুও নড়লেন না শাসা।
অন্যদিকে বাইরে থেমে থেমে একটু পরপরই হাড় চিবোচ্ছে চিতা। একবারও শব্দ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভয় পেয়ে গেলেন শাসা। চলে গেল নাকি! কিন্তু নাহ, একটু পরেই আবার শিকল টানার শব্দ হলো।
তিনি চাইলেই স্পটলাইট ফেলে চিতার চারপাশে আলোকিত করে তুলতে পারতেন; কিন্তু শাসা’র মাথায় এরকম কোনো দুই নম্বরী বুদ্ধি আসেইনি।
শাসা নিজে কিন্তু ফাঁদ পেতে পশু মারা পন্দ করেন না। এভাবে কখনোই শিকার করেন নি।
জীবনে তিনি যত চিতা কিংবা সিংহ মেরেছেন সব সময় পায়ে হেঁটেই ওগুলোকে অনুসরণ করেছিলেন। অবশ্য এতে করে শ’খানেক ব্যর্থতার দায় বহন করতে হয়েছে। তবে সফল ডজন খানেক শিকারই এখন পর্যন্ত জ্বলজ্বল করছে স্মৃতির মণিকোঠায়।
তাই বলে এলসা কিংবা অন্য ক্লায়েন্টরা টোপ ফেলে শিকার করলেও কিছু মনে করেন না শাসা। এরা কেউই তার মতো আফ্রিকান নয়; এছাড়া বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করেই এ সুবিধা ভোগ করেন। কিন্তু তিনি আলাদাভাবেই ভাবেন।
অন্ধকার হাইড আউটে এলসার পাশে বসে কেন যেন মনে হলো যে তিনি আর কোনদিন শিকার করতে পারবেন না। তিনি তার শেষতম হাতি, সিংহ আর চিতা মেরে ফেলেছেন। চিন্তাটা মাথায় আসতেই একই সাথে আনন্দ আর বিষণ্ণতা উভয়ই অনুভব করলেন। কল্পনা করলেন ভবিষ্যতে এই নারীকে পাশে নিয়ে আনন্দ ভ্রমণগুলো কেমন কাটবে! রাশিয়া, কানাডা, ব্রাজিল আর তানজানিয়া; পোলার বিয়ার থেকে শুরু করে পঞ্চাশ ইঞ্চি চওড়া শিং অলা ষাড় শিকার করতেই বা কতটা রোমাঞ্চ উপভোগ করবেন। এসব সুখচিন্তা করতে করতেই কেটে গেল সারা রাত।
খানিক বাদে নদী তীর থেকে ভেসে এলো এক জোড়া রবিনের ডুয়েট কোরাস! ঠিক যেন বলতে চাইছে “করো না! এটা করো না।”
উপরের দিকে তাকিয়ে প্রভাতের আগমনী আলো দেখতে পেলেন শাসা। আর ঠিক পনের মিনিটের মাঝেই গুলি ছোঁড়ার মত আলোকিত হয়ে যাবে চারপাশ।
এলসা’র গাল ধরে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলেন শাসা। অথচ সাথে সাথে জেগে গেলেন মহিলা। তার মানে বহু আগেই ঘুম ভাঙ্গলেও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলেন শাসা’র সান্নিধ্য।
“চিতাটা কী এখনো আছে?” প্রায় শাসা’র কানে কানে জানতে চাইলেন এলসা।
“জানি না।” একই রকম মোলায়েম স্বরে উত্তর দিলেন শাসা। প্রায় দুই ঘন্টা আগে শেষ শব্দ শুনেছেন। “তৈরি হয়ে যান।”
চেয়ারে বসে সিধে হয়েই রাইফেলের হাতল ধরলেন এলসা। এতক্ষণে রক্ত চলাচল শুরু হয়েছে শাসার হাতে আর কাঁধে। অথচ কেমন যেন আনন্দে ভরে উঠল বুক।
আবলুস গাছের ঘন পাতার চাঁদোয়া সরিয়ে উঁকি দিলেন শাসা। নাহ, ফাঁদ পাতা গাছটার ডালগুলো তো শূন্যই মনে হচ্ছে। এলসা’র জন্য দুঃখ হলো। চলে গেছে চিতা।
মাথা ঘুরিয়ে যেই না বলতে যাবেন তখনই আবার উত্তেজনায় দুরু দুরু করে উঠল বুক।
ইম্পালা হরিণটার বেশির ভাগ অংশই উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু একই সাথে সাপের মতো কিছু একটাও ঝুলছে। প্রথমে বুঝতে না পারলেও হঠাৎ করেই উপলব্ধি করলেন, “লেজ চিতা’র লেজ।” ছবির ধাঁধা মেলাবার মতো করেই মিলে গেল পুরো চিত্র।
গলা আগে বাড়িয়ে ডালের গায়ে সমান হয়ে শুয়ে আছে চিতা। পেটভর্তি খাবার থাকায় একেবারে অলস ভঙ্গিতে চিবুক ঠেকিয়ে পড়ে আছে। কেবল লেজটা ঝুলছে।
এলসাও বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু আস্তে করে উনাকে থামালেন শাসা। বাইরে আরেকটু আলো ফোঁটার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। কিন্তু টেনশনে পড়ে গেছেন এলসা।
একটু পরেই বেশ আলো দেখা গেল চারপাশে। চিতাটাকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাথাখানিক তুলে কিছু একটা শোনার জন্য কান পেতে ছিল। চোখে এসে পড়েছে আলো আর ঠিক যেন শাসাদের দিকে তাকিয়েই রাজকীয় ভঙ্গিতে চোখ পিটপিট করে তাকাল। পুরো ভঙ্গিমাটা এতটাই সুন্দর যে শাসা’র বুকে মোচড় দিয়ে উঠল।
এবারে সময় হয়েছে। এলসা’র হাতে আলতো করে টোকা দিলেন শাসা। রাইফেলের টেলিস্কোপিক সাইটের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে আছেন এলসা। শাসা মনে মনে আশা করলেন গুলিটা যেন ঠিক চিতার হৃদপিণ্ডে গিয়ে ঢোকে।
কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল।
পুরো শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল চিতা। আড়মোড়া ভাঙ্গতেই বেঁকে গেল পেছন দিক। “নাউ!” আস্তে করে নিঃশব্দে এলসা’কে আদেশ দিলেন শাসা। “গুলি করুন!”
হাই তুলল চিতা। দেখা গেল গোলাপি জিহ্বা।
“নাউ!” টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে শাসা মনে মনে চাইলেন এলসা’কে দিয়ে গুলি ছুঁড়তে। কথা বলতে কিংবা স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছেন। পাছে এলসা’র একাগ্রতা ভঙ্গ হয়।
হঠাৎ করেই লেজ নাড়িয়ে কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এক লাফ দিয়ে বিশ ফুট উঁচু থেকে মাটিতে নেমে এলো চিতা। একটুও কোনো শব্দ হলো না।
