ক্যাম্প চেয়ারে পাশাপাশি বসে আছেন শাসা আর এলসা। পেছনেই ছড়ানো আছে স্লিপিং ব্যাগ। দু’জনেরই গায়ে লেদার জ্যাকেট, শুধু যে শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য তা নয়; এমারজেন্সিতে তীক্ষ্ণ নখের আঁচর থেকেও এড়িয়ে বাঁচা যাবে।
ফায়ারিং অ্যাপাচারে লম্বা রাইফেলের নল ঢুকিয়ে অপেক্ষা করছেন এলসা। যে কোনো নড়াচড়া দেখলেই বন্দুক কাঁধে তুলে নিতে প্রস্তুত। দু’জনের কনুই প্রায় পাশাপাশি থাকলেও এখনো স্পর্শ করেনি।
টয়েটোর শব্দ দূরে মিলিয়ে যেতেই ঝপ করে নৈঃশব্দের চাদর নেমে এলো চারপাশে। এতটাই নিশ্চুপ যে শোনা যাচ্ছে সব তুচ্ছ শব্দও; মাথার উপরে পাতার গায়ে বয়ে যাওয়া বাতাস; নদীর তীরে কোনো একটা পাখির ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ; বহুদূরে কোথাও একঘেয়ে স্বরে ডেকে চলেছে একটা মদ্দা বেবুন।
দু’জনের সাথেই বই থাকলেও কেউ খুলেও দেখেনি। শাসা এতটাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন যেন বহুদিনের পুরনো আর বিশ্বস্ত কোনো বন্ধুর সাথে বসে আছেন। হঠাৎ করে এলসা’র দিকে তাকাতেই দেখলেন হাসছেন পিগনাটেলি।
দুজন দুজনের চেয়ারের হাতল তুলে ফেললেন। এমনভাবে একে অন্যের হাত ধরে বসে রইলেন যেন টিনএজার। নিজেকে দেখে শাসা নিজেই অবাক হয়ে গেলেন; বহু বছর ধরেই এরকমভাবে আর কাউকে অনুভব করেননি।
অরণ্যের মাঝে রাত কাটালেও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন শাসা। চোখের সামনে দিয়ে সেলুলয়েডের মতো ভেসে গেল। একের পর এক স্মৃতির ছবি। এ জীবনে বহু নারীর সঙ্গ পেয়েছেন কিন্তু মাত্র কয়েকজনের কথাই এখনো মনে রেখেছেন।
প্রথম যেবার সেনটেইনের কাছে হাতে-নাতে ধরা পড়েছিলেন, লাইজল আর কার্বোলিক সাবান মেশানো পানিতে চুবিয়ে রেখেছিল মা। মনে পড়তেই হেসে ফেললেন শাসা।
আরেক জনের স্মৃতি এখনো বেশ জ্বলজ্বল করে মনের মাঝে; তারা; তার সন্তানদের মা। কিছু সময়ের জন্য হলেও একত্রে বেশ সুখের দিন কাটিয়েছেন। তারপরেই বনে গেছেন শত্রু।
তারা’র পরে আরো শ’খানেক নারীর সাথে অন্তরঙ্গতা হলেও কেউই তাঁর একাকীত্ব ঘোচাতে পারেনি।
আর একেবারে সম্প্রতি তরুণী নারী দেহের মাঝে অবিনশ্বরতা খুঁজতে গেলেও হার মেনেছেন শাসা। অর্থহীন সঙ্গীতের মাঝে হারিয়ে গিয়ে এরা হয়ত নিজেরাই জানে না যে কী খুঁজছে। তাই তিনি আবারো একা হয়ে গেলেন।
একজন সৎ ভাই থাকলেও তাকে সহোদর হিসেবে কখনো ভাবেননি শাসা আর সেনটেইনও তাকে একমাত্র সন্তান হিসেবেই মানুষ করে তুলেছেন।
পরিচারকদের দল, ব্যবসায়ের অংশীদার, নিজের ছেলে-মেয়ে পরিচিত অপরিচিত এমন অসংখ্য মানুষের ভিড়ে কেবল মাত্র একজনের সাথেই তিনি সবকিছু শেয়ার করতে পারেন। সর্বক্ষণ যিনি তাঁকে ভালোবাসা আর উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন।
মা; কিন্তু সেনটেইনেরও ছিয়াত্তর চলছে। আর নিজের একাকীত্বে আজকাল নিজেই চমকে উঠেন, সামনের দিনগুলোর কথা ভাবলেই কেমন যেন বিবশ হয়ে আসে সবকিছু।
ঠিক সেই মুহূর্তে পাশে বসে থাকা নারী এমনভাবে তার হাতে চাপ দিল যেন বুঝতে পেরেছে শাসা’র অন্তরের বেদনা। মাথা ঘুরিয়ে সেই মধুর মতো সোনালি রঙা চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই দেখা গেল কোনো রকম অস্বস্তি ছাড়াই তাকিয়ে আছেন এলসা। কেটে গেল সব বিষণ্ণতা; এতদিনে শান্তি খুঁজে পেয়েছেন শাসা।
ছোট্ট ট্রি-হাউজের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকান চাঁদের নরম আলো। এমন একটা মুহূর্ত যখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখে পুরো দুনিয়া আর রঙ ছড়ায় অরণ্য।
সামনের দিকে ঝুঁকে খুঁড়ের দেয়াল ভেদ করে ফায়ারিং অ্যাপারচারের ভেতর দিয়ে তাকালেন শাসা। খানিকটা শব্দ শুনেই বলে উঠলেন, “সাবধান! একটা কিলার ক্যাটকে দেখতে পাচ্ছি।”
শুনতে পেলেন এলসা। আফ্রিকান বন্য জগৎ সম্পর্কে তিনিও জানেন। তাই বুঝতে পারলেন শাসার কথা। আস্তে আস্তে করে কাঁধে তুলে নিলেন রাইফেল। সোনালি একটা ছায়ার মতই নিঃশব্দে গোপনে এগিয়ে আসছে চিতাবাঘ। কেউই শুধু চোখের পাতা ফেলা ছাড়া আর কোনো ধরনের নড়াচড়া করছে না। এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত মেপে মেপে ফেলছেন; কানের কাছে ড্রাম বাজাচ্ছে হৃদপিণ্ড।
দ্রুত আলো সরে যাওয়ায় ফাঁদ পাতা গাছটার চারপাশে চক্রাকারে ঘুরছে চিতাবাঘ। কল্পনার চোখে যেন জটাকে পরিষ্কার দেখতে পেলেন শাসা।
গুলি ছোঁড়ার মতো আলো প্রায় নেই বললেই চলে। হঠাৎ করেই গাছে উঠে গেল চিতা। কোনো রকম শব্দ হল না। এত দ্রুত ব্যাপারটা ঘটে গেছে যে মনে হলো দুজনেরই হৃদপিণ্ড অচল হয়ে গেছে। এরপরই শুরু হলো উন্মাদের মতো দুরু দুরু কাঁপুনি।
ডালের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে চিতা। অন্ধকারের মাঝে আরো গাঢ় অন্ধকার তৈরি করেছে এটার দেহের গড়ন। পলিশ করা ওয়ালনাট কাঠ দিয়ে তৈরি রাইফেলের বাটে গাল ঠেকিয়ে অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিলেন এলসা। এবারে চিতাটা’কে স্পষ্ট দেখা আর যাচ্ছে না।
রাইফেল নামিয়ে রাখলেন এলসা। মাথা ঘুরিয়ে এলসার কানে কানে ফিসফিস করে উঠলেন শাসা, “কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।” শাসা’র গাল স্পর্শ করে নিজের মত দিলেন এলসা।
বাইরে শোনা যাচ্ছে হরিণটাকে আটকে রাখা শিকল ধরে টানার শব্দ। কল্পনার চোখে চিতাটাকে দেখতে চাইলেন শাসা। ঠিক যেন ডালের উপর পেট দিয়ে শুয়ে আছে জটা; এক পা আগে বাড়িয়ে হুকের মতো হরিণটাকে আকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে এনে খেতে লাগল ক্ষুধার্তের মত।
