“লুজানে’তে থাকেন মহিলা।”
“তাহলে টারজানের মতো জঙ্গলে আস্তানা গাড়ার কী দরকার? রহস্যটা কী? লোক পাঠালেই তো হত?”।
ট্রাকের গতি ধীর করে নদীর দিকে মনোযোগ দিলেন শাসা। ফোরহুইল ড্রাইভ নিয়ে সোজা বিপরীত দিকে না উঠা পর্যন্ত কোনো কথা বললেন না।
“ঠিক আছে, সবকিছুই বলছি তোমাকে। এসব কীটনশাক নয়, আসলে আমাদের আগ্রহ পিগটেলি ইন্ডাস্টিজ আর আর্মসকোর নিয়ে।”
“আহ, তার মানে অস্ত্র-শস্ত্র?”
“মেয়ের দিকে তাকালেন শাসা। পাগড়ির মতো করে রঙিন স্কার্ফ পেচানো বেলা’কে দেখে অপরাধবোধে দগ্ধ হলেন শাসা। মেয়েটা তো তার নিজেরই অংশ। কেমন করে তিনি ওকে অবিশ্বাস করতে পারলেন!
“নিউক্লিয়ার বোমা নিশ্চয় নয়?” বলে উঠল বেলা, “তোমার কাছে তো এটা এখনি আছে।”
“না, নিউক্লিয়ার নয়।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শাসা। “তুমি তো জানই যে তোমার মতো আমিও এসব মারণাস্ত্র পছন্দ করি না যাই হোক। এদের অস্তি তুই যথেষ্ট।”
“কিন্তু যদি হাতের নাগালে থাকে। তাহলে কোনো না কোনো পাগল ঠিকই ব্যবহার করে ফেলবে।” মাথা নাড়লেন শাসা। কিন্তু ডার্লিং আমার দায়িত্ব হলো দেশকে নিরাপত্তা দেবার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা।”
“এরকম আর কিছুর কি সত্যি দরকার আছে?” জোর দিল বেলা।
“ছোট্ট একটা শত্রুর দল, আমাদের দেশটাকে নিয়ে সবার ভেতরে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। তরুণদের মাঝে আমাদেরকে দানব বানিয়ে ব্রেইনওয়াশ করছে। শীঘ্রিই হয়ত এরাই ক্ষমতায় বসে যাবে। এরাই হবে আগামীকালের সিদ্ধান্ত প্রণেতা। কোনো একদিন হয়ত দেখা যাবে আমেরিকান নেভাল টাস্কফোর্স এসে আটকে দেবে আমাদের উপকূল। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা আর কমনয়েলথ এর সমর্থন নিয়ে ভারতীয় বাহিনীও এসে চড়াও হতে পারে।
“ওই পাপা, এসব তো বহুদূরের ব্যাপার, তাই না?”
“হুম। কিন্তু লন্ডনে থাকার সময়ে তুমিও তো ব্রিটিশ লেবার পার্টি নেতাদের সাথে দেখা করেছ; আমেরিকান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির টেডি কেনেডি’র সাথে কথা বলেছ। মনে আছে উনি কী বলেছিলেন?”
“হ্যাঁ। মনে আছে।”
“আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কেউ যেন নাক গলাতে না পারে সর্বদা সেই চেষ্টা করতে হবে।”
“আমাদের কাছে তো ইতিমধ্যেই তা আছে।” মনে করিয়ে দিল বেলা।
“নিউক্লিয়ার অস্ত্র বেশ মূল্যবান। আর এর প্রভাব ঠেকানোটাও দুঃসাধ্য। তাই বিকল্প কিছু ভাবতে হবে।”
“এলসাই কি এর জোগানদার হবেন? কেন?”
“সিগনোরা পিগনাটোলি বেশ সহানুভূতিশীল। তিনি ইটালিয়ান সাউথ আফ্রিকা সোসাইটির’ও সদস্য। উনার পিতা ১৯৩৫ সালে জেনারেল ডি বোনোর স্টাফ ছিলেন। পশ্চিম মরুভূমিতে রোমেনের নেতৃত্বে যুদ্ধ করে বেনগাজীতে বন্দি হয়েছিলেন উনার স্বামী। আফ্রিকার প্রতি তার ভালোবাসা ভদ্রলোক নিজের স্ত্রীর মাঝেও বপন করে গেছেন। আমাদের সমস্যাও তাই তিনি ভালই বোঝেন। এই মিটিং এর পরামর্শও তিনিই দিয়েছেন।”
আরো কিছু প্রশ্ন করতে চেয়েছিল বেলা; কিন্তু মনে হলো থাক। বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
চুপচাপ বসে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল বেলা।
“এই মিটিং সম্পর্কে মাত্র চারজন লোক জানেন। সিগনোরা পিগনাটেলি’তো নিজের স্টাফদেরকেও বিশ্বাস করেন না। গ্যারি আর আমি ছাড়া এই মিটিং এর কথা আর একজনেই মাত্র জানেন-প্রধানমন্ত্রী।”
নিজের বিশ্বাসঘাতকতায় অসুস্থ বোধ করল বেলা। মন চাইল বাবাকে নিষেধ করে যেন তাকেও না বলেন। কিন্তু নিকি’র কথা মনে পড়তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল বেলা।
“পাঁচ বছর আগে, নার্ভ গ্যাস তৈরির জন্য পশ্চিম ইউরোপের দু’টি কেমিকেল কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছিল ন্যাটো। কিন্তু স্ক্যান্ডিনেভিয়া আর হল্যান্ডের সোশ্যালিস্ট সরকারের চাপে গত শরতে এ চুক্তি ক্যানসেল হয়ে যায়। তবে কাজ অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ায় একটা কোম্পানি গ্যাস উৎপাদন ও পরীক্ষা করে দেখেছে।”
“কারা? পিগনাটোলি কেমিকেলস্?” ইসাবেলার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লেন শাসা, বেলা আবার জানতে চাইল,
“ন্যাটোর মাপকাঠিগুলো কী কী?”
‘ট্রান্সপোর্ট আর স্টোর করার জন্যে সেইফ হবে। পিগনাটোলির উদ্ভাবিত পৃথক দুটি পদার্থ যদি একসাথে মেশানো হয় তাহলে তা আমেরিকান এক্সিকিউশন চেম্বারে ব্যবহৃত সায়ানাইড গ্যাসের চেয়েও বিষাক্ত হবে।”
ফুলে ফুলে ভরা কিগেলিয়া গাছের নিচে ট্রাক পার্ক করলেন শাসা।
হাতে তুলে নিলেন, শনের ডাবল ব্যারেলড পয়েন্ট পাঁচ সাত সাত গিবস রাইফেল।
“চলো জলহস্তীদের দেখে আসি।” বাবা’র পিছু নিল বেলা। রাইফেলের ইনস্যুরান্স করা আছে; কেননা আফ্রিকাতে মাপ, সিংহ আর ষাঁড়ের চেয়েও বেশি মারাত্মক জলহস্তী।
মরা গাছের গুঁড়ির উপরে পাশাপাশি বসে পড়ল পিতা-কন্যা। হাতের কাছেই রাইফেলটাকে রেখে দিলেন শাসা। খানিক পরেই নদী তীর থেকে নেমে গেল মদ্দা জলহস্তী। পানির উপরে শুধু চোখ জোড়া ভেসে রইল।
“সায়ানাইড গ্যাসের চেয়েও এগারো গুণ বেশি বিষাক্ত।” মন্তব্য করলেন শাসা’ “বেশ ভয়ংকর, না?”
“তাহলে কেন এটা দরকার বাবা?” কাঁধ ঝাঁকালেন শাসা।
“ঘৃণা থেকে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য।” পায়ের কাছ থেকে নুড়ি পাথর নিয়ে জলহস্তীটার দিকে ছুঁড়ে মারলেন শাসা। বিশ ফুট দূরে পড়লেও পানির ভেতরে পুরোপুরি ডুবে গেল জলহস্তী। শাসা আবারো বলে উঠলেন, “গ্যাসের কোড নেইম হল সিনডেক্স-২৫। দ্রুত আর নিঃশব্দে হত্যা করা ছাড়াও এটার আরো অনেক গুণ আছে।”
