ওয়েল্টেভ্রেদেনে গিয়ে এবারে যোগ করল নিকি’র চুল আর একসাথে কাটানো দিনগুলোর গল্প।
যখনই খুব মন খারাপ হয়ে যায়, নিজের রুমে চুপচাপ বসে বসে জার্নালের পাতা ওল্টায়।
এভাবেই পায় টিকে থাকার শক্তি।
***
সোজা ছুটে গিয়ে মোড় নিল বীচক্রাফট। পেছনের সিটে বসে মাধ্যাকর্ষণের চাপে কেমন যেন হালকা বোধ করল বেলা।
“ওই তো” পাইলটের বামপাশের সিট থেকে চিৎকার করে উঠল গ্যারি, “দেখেছ? পাহাড়ের নিচে, তিনটা।”
নিচে জঙ্গলের মাথার দিকে তাকাল বেলা। পাথরে দুর্গ, উপত্যকা দিয়ে ভরে আছে পুরো বনানী।
আকাশে উন্মত্ত চিৎকার করে ঘুরপাক খেতে লাগল একদল সবুজ রঙা কবুতর; এতটাই কাছে যে ওগুলোর লাল ঠোঁট আর পুঁতির মতো চকচকে চোখ জোড়াও দেখা যাচ্ছে। এরপর হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল অরণ্য। নিচে বিছিয়ে আছে শীতের ধূসর ঘাস। গর্জন করতে করতে সোজা দূরের পাহাড়চূড়ার দিকে ধেয়ে গেল বীচ ক্রাফট।
“ওই তো! বেলা দেখেছ?” আবারো বলে উঠল গ্যারি।
“ইয়েস! ইয়েস! কত্ত বড় না?” পাল্টা চিৎকার করে উঠল বেলা।
পরিষ্কার জায়গাটুকুর শেষ মাখা গিয়ে একসাথে দৌড়ে যাচ্ছে তিনটা মন্দা হাতি। আরবীয় নৌকার পালের মতো ছড়িয়ে আছে কান। বাকানো আইভরি উঠে গেছে উপরের দিকে।
একেবারে সামনের হাতিটার বিশ ফুট উপরে প্লেন যেতেই তেড়ে এলো স্থল দানব। লম্বা শৃড় উঁচিয়ে এমন ভাব করল যেন তাদেরকে আকাশ থেকে পেড়ে ফেলবে। কন্ট্রোল কলাম টেনে ধরল গ্যারী। মেঘ বিহীন আফ্রিকান আকাশে উঠে গেল বিমান।
“সবচেয়ে বড়টার ওজন সত্ত্বর পাউন্ডের কম হবে না।” সিটের উপর বসে ঝুঁকে দেখে হাতিটার ওজন আন্দাজ করল গ্যারি।
“এগুলোও কি আমাদের এলাকা। বাবা?” কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে বাবার কাছে জানতে চাইল।
“এর কিনারেই।” গ্যারির ডান পাশের আসনে বসে আছেন শাসা। গ্যারি’কে তিনিই বিমান চালানো শিখিয়েছেন; জানেন ওর দক্ষতা।
“ওদিকে ন্যাশনাল পার্ক দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে বাউন্ডারি লাইনও দেখতে পাবে।”
“ওই বুড়ো জাম্বোগুলো তো এদিকেই আসছে।” বাবা’র দিকে হেলে এলো বেলা; হাসলেন শাসা।
“হুম, এতে কোনো সন্দেহ নাই।”
“তার মানে ওরা জানে যে কোনটা শিকারির জায়গা আর কোনটা ওদের জন্য নিরাপদ?”
“যেভাবে তুমি তোমার নিজের বাথরুম চেনো; যে কোনো সমস্যার গন্ধ পেলেই ওরাও ঘরের দিকেই ছোটে।”
“ক্যাম্প দেখতে পাচ্ছো?” জানতে চাইল গ্যারি।
“ওই তো দক্ষিণে। ধোয়াও দেখতে পাবে।”
খুব নিচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে বিমান। ছোট্ট একটা জেবরা’র দল নিচে ঘাসের চাদরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু উড়োজাহাজের শব্দ পেয়েই দিল দৌড়।
নিচে পার্ক করে রাখা খোলা ট্রাক দেখতে পাচ্ছে বেলা। হুইলে বড় ভাইকে দেখার আশা নিয়ে তাকালেও দেখা গেল বসে আছে কৃষাঙ্গ ড্রাইভার। দু’বছরের উপর হয়ে গেল; শন’কে দেখে না।
জোড়া ইঞ্জিনের বীক্রাফট’কে শেষবারের মতো ঘোরাল গ্যারি। ড্যাসবোর্ভে জ্বলে উঠল তিনটা সবুজ বাতি। কন্ট্রোলের উপর ঘুরে বেড়ালো শক্তিশালী আর নিশ্চিত আগুলগুলো।
“ওতো বেশ ভালোই প্লেন চালায়।” ভাইয়ের কৌশলের প্রশংসা করল বেলা, “প্রায় বাবা’র মতই ভালো।”
কোনো রকম ঝাঁকুনি ছাড়াই বীচক্রাফট’কে মাটিতে নামিয়ে আনল গ্যারি। স্ট্রিপের শেষ মাথার গাছগুলো দ্রুত এগিয়ে আসতেই ম্যাক্সিমাম সেইফ ব্রেকিং’য়ে চাপ দিল। এরপর ট্যাক্সিং করে এগিয়ে গেল অপেক্ষারত ট্রাকের দিকে।
মোটরের গুঞ্জন শেষ হতেই চারপাশে ভিড় করে এলো ক্যাম্পের স্টাফ। হ্যাচ খুলে নিচে নেমে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করলেন শাসা। কোম্পানির শুরু থেকেই এখানে কাজ করছে বেশিরভাগ সাফারি স্টাফ।
কিন্তু ওদের খুশি দ্বিগুণ হয়ে গেল ইসাবেলা’কে দেখে। মেয়েটাকে সকলেই ভালবাসে কোয়েজি দ্য মর্নিং স্টার নামে ডাকে।
“তোমার জন্য তাজা টমেটো আর লেটুস রেখে দিয়েছি কোয়েজি।”
নিশ্চিত করল মালিদের প্রধান, লট। মহিষ আর হাতি’র গোবরের সার পাওয়াতে উর্বর হয়ে থাকে চিজোরা ক্যাম্পের বাগান। আর বেলা’র সালাদ প্রীতিও সকলের জানা আছে।
“তোমার তাবুটা ক্যাম্পের একেবারে শেষে পেতে দিয়েছি, কোয়েজি।” জানালো ক্যাম্পের বাটলার। আইজ্যাক। “যেন সকালবেলাতে পাখিদের গান শুনতে পাও আর শেফ তোমাকে স্পেশাল চা এনে দেবে।”
বীচক্রাফটকে নিয়ে জ্যাকেল-ওয়্যার হ্যাঙ্গারে রেখে দিল গ্যারি; যেন রাতের বেলা সিংহ কিংবা হায়েনা এর টায়ারে দাঁত বসাতে না পারে।
এরপর খোলা ট্রাকের উপর লাগেজ উঠিয়ে নিল স্টাফেরা আর হুইলে বসল গ্যারি।
শনের কঠোর নিয়ম হলো ক্যাম্পের দু’মাইলের মধ্যে কোনোরূপ গোলাগুলি চলবে না। বর্ষার পরে পানি শুকিয়ে গেলে খেলাও ফুরিয়ে যায়। পুরো ক্যাম্প গুটিয়ে দলবল নিয়ে তখন কারি লেকের তীরে ক্যাম্পে চলে যায় শন।
জঙ্গলের মাঝে পাতা হয়েছে সবুজ তাঁবুর সারি। প্রতিটার পিছনেই আছে। শাওয়ার রুম আর মাটির শৌচাগার। খড়ের দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে ডাইনিং টেন্ট। দিন-রাত জ্বলতে থাকা ক্যাম্প ফায়ারের চারপাশে রাখা হয়েছে। ক্যানভাসের চেয়ার।
বাতি জ্বালানো আর রেফ্রিজারেটর সচল রাখার দায়িত্ব পালন করে পোর্টেবল জেনারেটর। খড়ে ছাওয়া রান্নাঘরে বসে মুখরোচক সব খাবার তৈরি করে শেফ। বার টেবিলের উপর বরফ কুচি ছাড়াও আছে সারি সারি লিকার বোতল। পাওয়া যাবে পৃথক পৃথক পাঁচটা ব্রান্ডের প্রিমিয়াম হুইস্কি আর তিনটা সিংগল সল্ট। প্রতিটি গ্লাস স্টয়াট ক্রিস্টালের তৈরি।
