বিনা বাক্যব্যয়ে ওর হাতে কাঁচি তুলে দিল বেলা। মায়ের সামনে দাঁড়াল নিকি ”বেশি না কিন্তু।” বেলা’র সাবধান বাণী শুনে হেসে ফেলল নিকি।
“তোমার চুল বেশ নরম-আর সুন্দর। তোমাকে কি যেতে হবে মাম্মা?”
“হুম।”
“আবারো আসবে আমাকে দেখতে?”
“ইয়েস, আই উইল। প্রমিজ।”
“আমি আমার ফক বইতে এই চুলগুলো রেখে দেব। যখনি বইটা পড়ব। তোমার কথা ভাবব।”
কুঁড়েঘরের খোলা অংশ দিয়ে ঘরে ঢুকেছে চাঁদের রুপালি আলো। সময়ের সাথে সাথে সরেও যাচ্ছে মেঝের উপর দিয়ে।
“ও নিশ্চয়ই আসবে” শক্ত ম্যাট্রেসের উপর আশা নিয়ে শুয়ে রইল বেলা, “প্লিজ ওকে আসতে দাও।”
হঠাৎ করেই সিধে হয়ে গেল বেলা। কিছুই দেখেনি কিংবা শোনেইনি তারপরেও নিশ্চিতভাবে অনুভব করছে যে ও কাছেই কোথাও আছে। নাম ধরে ডেকে উঠার ইচ্ছে বহুকষ্টে সংবরণ করল। সবটুকু ইন্দ্রিয় সজাগ করে বসে রইল বেলা। আর তারপরেই বিনা কোনো শব্দে চলে এলো রামোন।
গলার কাছে উঠে আসা কান্না গিলে ফেলল বেলা। মশারি থেকে বের হয়ে দ্রুত তিন কদম হেঁটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রামোনের বুকে। নিঃশব্দে ও’কে নিয়ে বাইরে চলে এলো রামোন।
“আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।” নরম স্বরে ওকে সাবধান করে দিল। আরো জোরে আঁকড়ে ধরল বেলা।
“আমাদের সাথে এসব কী হচ্ছে ডালিং?” অনুনয় করে উঠল বেলা,
“আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। কেন তুমি আমাদের সাথে এমন করছ?”
“তুমি যেই কারণে আদেশ মানতে বাধ্য হচ্ছ! নিকোলাসের জন্য, তোমার জন্য!”
“আমি বুঝতে পারছি না; কিন্তু আর সহ্য হচ্ছে না। একেবারে শেষ হয়ে গেছি।”
আর বেশি দেরি নেই। ডার্লিং। আমি প্রমিজ করছি শীঘ্রিই আবার আমরা তিনজন একসাথে হবো।
“গতবারেও তুমি একথাই বলেছিলে ডার্লিং, যতটুকু পেরেছি আমি করেছি…।”
“আমি জানি বেলা, এটাই আমাদেরকে বাঁচিয়েছে। আমাকে আর নিকোলাসকে। তুমি না থাকলে আমরা কবেই খতম হয়ে যেতাম। তুমি আমাদেরকে বাড়তি সময় আর জীবন দিয়েছ।”
“ওরা আমাকে দিয়ে জঘন্য সব কাজ করাচ্ছে রামোন। আমি আমার পরিবার আর দেশের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।”
“ওরা তোমার উপরে সন্তুষ্ট হয়েছে বেলা। এই ভ্রমণই তার প্রমাণ। নিকোলাসের সাথে কাটানোর জন্যে দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছে। যদি পারো তাহলে আরেকটু-আর খানিকটা কাজ করে দাও।”
“ওরা আমাকে কখনোই ছাড়বে না, রামোন, আমি জানি আমার শেষ রক্তটুকুও শুষে নিবে।”
“বেলা, ডার্লিং” সিল্কের নাইট গাউনের উপর দিয়ে ওর পিঠে আলতো করে চাপড় দিল রামোন, “আমার প্ল্যান শোন, যদি তুমি ওদেরকে আরেকটু খুশি করতে পারো, তাহলে আগামীবার ওরা আরো নরম হবে। তোমাকে বিশ্বাস করবে। অসাবধান হলেই-প্রমিজ করছি নিকিকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব।”
“কারা ওরা?” ফিসফিস করে উঠল বেলা; কিন্তু ওকে আদর করতে শুরু করল রামোন। প্রশ্নের তাই উত্তরটা আর জানা হলো না।
“চুপ করো, মাই লাভ। তুমি না জানলেই ভাল হবে।”
“প্রথমে তো আমি ভেবেছিলাম এরা রাশানস; কিন্তু আমার স্কাইলাইট মেসেজ তো আমেরিকানদের কাজে লেগেছে আর অ্যাঙ্গোলা’তেও কাজে লেগেছে। এরা কী তবে সি আই-এ?”
“হয়ত তুমি সত্যি; কিন্তু নিকির খাতিরে এদেরকে ঘাটাতে যেও না।”
“ওহ গড, রামোন। আমার কিছু ভাল লাগছে না। বিশ্বাসই হচ্ছে না সভ্য কোনো লোক অন্যদের সাথে এমন করতে পারে।”
“আর বেশি দিন নয়।” ফিসফিসিয়ে জানাল রামোন। “ধৈর্য ধরো। ওদের আরেকটু কাজ করে দাও; তারপরেই আমি আর নিকি তোমার কাছে চলে আসব।”
“আমাকে অনেক আদর করো রামোন। না হলে আমি পাগল হয়ে যাবো।”
***
পরের দিন সকাল বেলা মা’কে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিল নিকোলাস। জিপের পেছনে বসে আছে জোসে আর রেগুলার ড্রাইভার। হঠাৎ করেই ওদের কথা কানে যেতে চমকে উঠল বেলা। “পেলে হচ্ছে সত্যিকার শিয়াল ছানা। এল জোরো।”
আইলুশিনের র্যাম্পে একে অন্যকে বিদায় জানাল নিকি আর বেলা।
“তুমি প্রমিজ করেছ যে আবার আমাকে দেখতে আসবে, মাম্মা।” মনে করিয়ে দিল নিকি।
“অফ কোর্স নিকি। এবারে কোন উপহার আনব?”
“আমার সকার বলটা মিইয়ে যাচ্ছে। ম্যাচের সময় বারে বারে পাম্প করতে হয়।”
“ঠিক আছে আরেকটা এনে দেব।”
“থ্যাঙ্ক ইউ মাম্মা।” হাত বাড়িয়ে দিল নিকি। কিন্তু নিজেকে সালমাতে পারল না বেলা, ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে জড়িয়ে ধরল।
প্রথমে মুহূর্তখানেক চুপ করে থাকলেও হঠাৎ করেই জোর করে হাত ছাড়িয়ে খানিক মায়ের দিকে তাকিয়েই দৌড় দিল নিকি। রাগে পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে। খালি হয়ে গেল বেলা’র ভেতরটা।
লিবিয়া’তে নেমে সুইস এয়ার ফ্লাইট ধরে জুরিখে চলে এলো বেলা। ন্যানি সহ বাসার সবাইকে পোস্টকার্ডও পাঠাল আর সুইজারল্যান্ডেই আছে। বোঝানোর জন্য নিজের ক্রেডিট কার্ডও ব্যবহার করল। এমনকি লুজানে’তে পরিচিত ব্যাংকার’কে ফোন করেও দশ হাজার ফ্র্যাংক তুলে নিল। যেন কারো কোন সন্দেহ না থাকে ওর অবকাশ যাপন নিয়ে।
নিকোলাসের ছবিগুলো অসম্ভব সুন্দর হয়েছে। এমনকি রাইফেল হাতে ধরা ভয়ংকর ছবিগুলো’ও প্রাণ ভরে দেখল বেলা। নিকোলাসের জন্য একটা জার্নাল বানিয়েছে বেলা। কাভারের ভেতর পকেট অলা মোটাসোটা একটা বই। বছরের পর বছর ধরে জড়ো করা বিভিন্ন জিনিস এখানে রেখেছে বেলা।
লন্ডনে একটা ফার্ম হায়ার উদ্ধার করা নিকোলাসের স্প্যানিশ বার্থ সার্টিফিকেট আর অ্যাডপশন পেপারস; মালাগার’র ফ্ল্যাট থেকে পাওয়া ছোট্ট মোজা; নার্সারী স্কুল আর ক্লিনিকের রিপোর্টসহ ওকে পাঠানো প্রতিটি ছবি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পাতায় লিখে রেখেছে ওর নিজস্ব মন্তব্য, আশা, হতাশা আর ভালোবাসার কথা।
