“কত দূর?” জোসে’র কাছে জানতে চাইল নিকি।
“পঁচিশ সেকেন্ড পেলে।” শ্রদ্ধা ভরে হেসে উঠল ক্যাম্পের গার্ড।
“পঁচিশ সেকেন্ড মাম্মা” গর্বিত ভঙ্গিতে ইসাবেলাকে জানাল নিকি।
“জোসে, আমার লাগানো শেষ হলেই আবার সময় জানাবে ঠিক আছে? আর তুমি আমার ছবি তুলবে মাম্মা।” আদেশ দিল নিকি।
রাইফেল নিয়ে পোজ দিল নিকি, তারপর আরেকটা ছবি ভোলার বায়না করল। লেন্সের মধ্য দিয়ে ছেলের মুখ দেখে ভিয়েত-কঙ্গের শিশু যোদ্ধাদের কথা মনে পড়ে গেল। বেলা’র আরো মনে পড়ে গেল এই ছোট্ট মানুষগুলোই কী কী ঘটায়। নিকোলাসও কী এদের মতই হয়ে যাচ্ছে? মনে হলো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
“গুলি করব জোসে?” খানিক বাকবিতণ্ডার পর নিকোলাসকে অনুমতি দিয়ে দিল জোসে।
খালি একটা বোতল লেগুনে ছুঁড়ে মারতেই পানির কিনারে দাঁড়িয়ে গুলি করল নিকি। গান ফায়ারের শব্দে কম্পাউন্ড থেকে দৌড়ে এলো হাফ ডজন প্যারাট্রুপার আর নারী সিগন্যালার। সকলে মিলে সোল্লাসে উৎসাহ দিল নিকি’কে পঞ্চম বারের মাথায় বোতলটা বিস্ফোরিত হতেই” ভাইভা পেলে?” ‘সাহসী পেলে?” চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে উঠল।
“আর আরেকটা ছবি তোল মাম্মা।” দু’পাশে সমর্থকের দল আর বুকের কাছে রাইফেল নিয়ে পোজ দিল নিকি।
আদ্রা’র বেঁধে দেয়া ফল আর ঠাণ্ডা স্মোকড ফিশ দিয়ে সৈকতে পিকনিক লাঞ্চ করল বেলা আর নিকি। গালভর্তি খাবার নিয়ে হঠাৎ করেই নিকোলাস বলে ফেলল : “জোসে অনেক যুদ্ধ করেছে। রাইফেল দিয়ে পাঁচটা মানুষও মেরেছে। একদিন আমিও হব বিপ্লবের সত্যিকারের সন্তান-ওর মত।”
সে রাতে মশারির নিচে শুয়ে ছটফট করে উঠল বেলা। “আমার ছেলেটাকে ওরা দানব বানিয়ে ফেলছে। কিন্তু কী করব? কিভাবে ওদের হাত থেকে নিকি’কে বাঁচাবো?”
ওরা যে কে সেটাও তো জানে না বেলা।
“ওহ, রামোন তুমি কোথায়? শুধু ওর সাহায্য পেলেই কিছু করা সম্ভব। ও পাশে থাকলে আমি সবকিছু পারব।”।
আবারো আদ্রা’র সাথে কথা বলতে চাইল, কিন্তু ওর শীতলতা কিছুতেই কাটে না।
নিকোলাসও কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। এখনো বেশ নম্র আর বন্ধুভাবাপন্ন থাকলেও বেলা বুঝতে পারল ছেলেটা কেবল ওর সঙ্গ আর তেমন পছন্দ করছে না। বারে বারে শুধু স্কুল, ওর বন্ধু, সকার ম্যাচের কথা বলে। গল্পের বইয়ের মাঝে আর আটকে রাখা যাচ্ছে না ওকে।
বেলার মাঝেও মরিয়ামভাব চলে এসেছে। শুধু ভাবছে কেমন করে এইসব থেকে নিকি’কে নিয়ে যাওয়া যায় ওয়েল্টেভ্রেদেনের সভ্য আর নিরাপদ জগতে। ফার্স্ট ক্লাস পাবলিক স্কুলের ড্রেসে কেমন দেখাবে নিকি!
“আমার ছোট্ট বেবি’কে যদি ফিরিয়ে দেয়-ওরা যা বলবে করব।” আপন মনে স্বপ্ন দেখলেও বেলা জানে যে কোনো লাভ নেই।
রাত নেমে এলে ভয়ংকর নব চিন্তা এলো বেলা’র মাথায়। নাহ, কিছ একটা করতেই হবে।
জোসের রাইফেলটা নেয়া যায়। নিকোলাসকে বললেই ওকে দেখতে দেবে…কিন্তু না।
কর্নেল জেনারেল রামোন মাচাদো ভালোভাবেই ধরতে পারল বেলার এ পরিবর্তন। এই ভয়টাই পাচ্ছিল।
গত দশ দিন ধরে খুব কাছ থেকেই বেলা’র উপর নজর রেখেছে। কুড়ে ঘরে বেলা’র অজান্তে লাগানো আছে বহু ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন। সৈকতে কিংবা নৌকায় থাকলেও হাই পাওয়ার টেলিস্কোপিক লেন্স দিয়ে ওদের ছবি ভোলা হয়।
অনুমান করল মেয়েটা এমন একটা স্টেজে পৌঁছে গেছে যে উন্মাদের মতো কিছু করে বসতে চাইবে।
আদ্রাকে তাই নতুন নির্দেশ দেয়া হলো।
সন্ধ্যায় ডিনার সার্ভ করার সময় কয়েক মিনিটের জন্য নিকি’কে বাইরে পাঠিয়ে দিল আদ্রা। তারপর ইসাবেলার’র বাটিতে ফিশ স্যুপ দেয়ার সময় ইচ্ছে করে এমন ভাবে দাঁড়াল যে বেলা’র গালে এসে পড়ল আদ্রা’র চুল।
‘কথা বলবেন না কিংবা আমার দিকে তাকাবেন না।” ফিসফিস করে উঠল আদ্রা, “মার কুইসের মেসেজ আছে। উনি জানিয়েছেন যে আপনার কাছে আসতে চেষ্টা করবেন; কিন্তু ব্যাপারটা বেশ কঠিন আর বিপদজনক। এও জানিয়েছেন যে হি লাভ ইউ। সাহস রাখুন প্লিজ।”
আত্মঘাতী সমস্ত চিন্তা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। রামোন আশেপাশেই কোথাও আছে। রামোন ওকে ভালবাসে। অন্তরের অন্তঃস্থলে ঠিকই জানে যে রামোন সাহায্য করলে ও সবকিছু পারবে।
বাকি দুই দিন এ চিন্তাতেই বিভোর হয়ে রইল বেলা। নিকোলাসের সাথে নতুন উদ্যমে মিশতে তাই কোনো সমস্যাই হলো না।
রাত হলেই একা একা জেগে বসে থাকে; দ্বিধা কিংবা ভয়ে নয়, রামোনের অপেক্ষাতে।”
“ও আসবে, আমি জানি ও আসবে।”
কিন্তু রামোনোর পরিবর্তে মেসেজ নিয়ে এলো লাগেজ সার্চকারী নারী কেজিবি’র একজন।
“আগামীকাল সকাল নয়টায় আপনার ফ্লাইট।”
“দ্য চাইল্ড?” জানতে চাইল বেলা, “নিকোলাস-পেলে?”
মাথা নাড়ল কেজিবি। “ও থাকবে। আপনার সময় শেষ। ঠিক আটটায় আপনাকে নিতে লোক চলে আসবে তৈরি থাকবেন।”
ছেলের সাথে কাটানো স্মৃতি হিসেবে কিছু নিয়ে যেতে চাইল বেলা। শাওয়ার করে ডিনারের জন্য তৈরি হবার পর বারমুডার ভেতরে লুকিয়ে নিল এক জোড়া নেইল সিজার। ডিনার টেবিলে নিকি বসতেই কিছু না বলে ওর পিছনে গিয়ে ঘন কোকড়ানো চুল কেটে নিল বেলা।
“হেই, তুমি কী করছ?”
“চলে যাবার পর যেন তোমাকে স্মরণ করতে পারি।”
খানিকক্ষণ কী যেন ভেবে লাজুক স্বরে নিকি জানতে চাইল। “তাহলে আমিও কী ভোমার কয়েকটা চুল রাখতে পারি?
