“আমার স্যুটকেস” দেখিয়ে দিতেই একজন লেফটেন্যান্ট অপেক্ষারত ট্রাকে নিয়ে এলো বেলার লাগেজ।
চুপচাপ নিঃশব্দে বিশ মিনিট ধরে গাড়ি চালিয়ে নদীর মুখে ইসাবেলাকে নিয়ে এলো মেজর। পথিমধ্যে আকাশ থেকে দেখা কুঁড়েঘরগুলো দেখতে পেল বেলা। সশস্ত্র গার্ডেরা গেইট পাহারা দিচ্ছে। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে আকাশ।
অপেক্ষাকৃত ছোট্ট একটা কম্পাউন্ডে এসে ঢুকলো গাড়ি। পাশ দেখাতেই ভেতরে ঢুকতে দিল গার্ড। এখানকার ঘরগুলো ছোট হলেও অন্যগুলোর চেয়ে পরিষ্কার। সবমিলিয়ে সৈকতের ধারে নয়টা ঘর আছে।
ট্রাক থেকে নেমে চারপাশে তাকালো বেলা। মন্দ নয়-সমুদ্র বালি, তাল গাছ আর কুঁড়ে ঘর হলিডে কাটানোর জন্য মোটামুটি আদর্শ বলা চলে।
অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সবচেয়ে বড় কুঁড়েঘরটার কাছে নিয়ে গেল সাথে আসা মেজর। কিন্তু ইউনিফর্ম পরিহিত দুই নারীকে দেখেই বুকের মধ্যে হাতুড়ির বাড়ি পড়ল। আবারো সেই ভয়ংকর শারীরিক লাঞ্চনার মাঝে দিয়ে যেতে হবে এখন।
কিন্তু এবারে ভয় অমূলক। প্রায় অপরাধীর ভঙ্গিতে বেলার স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগ চেক করে দেখল দু’জনে; এমনকি পোশাক খোলার কথাও বলল না। শুধু কোডাকের সুইংগার টাইপ ক্যামেরা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল দুই নারী। ক্যামেরাটা বোধহয় হারাতেই হবে। তাড়াতাড়ি তাই বেলা বলে উঠল,
“এটা তেমন দামি কিছু না। যদি চান তো নিয়ে যান।”
অবশেষে বাড়তি দু’টো ফিল্মসহ ক্যামেরা নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল নারীদ্বয়।
দেয়ালের পিপ হোল দিয়ে এতক্ষণ সবকিছুই দেখতে পেয়েছে রামোন। সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলেও অনর্থক খোঁচাখুঁচি বারণ করে দিয়েছিল। হাতে ক্যামেরা নিয়ে এবারে তাই মাথা নাড়ল নারী সৈন্যদের উদ্দেশ্যে। খুব দ্রুত একবার চেক করে আবার ফিরিয়ে দিল।
ক্যামেরাটা ফিরে পেয়ে অসম্ভব খুশি হলো বিস্মিত ইসাবেলা। অন্যদিকে মনোযাগ দিয়ে মেয়েটাকে দেখছে রামোন। চুলগুলো লম্বা হয়েছে আর চেহারাতেও এসেছে পরিণত ভাব। হাবে ভাবে কর্তৃত্বপরায়ণ মেয়েটা ভালো ভাবেই জানে কতটা সফল হতে পেরেছে।
শারীরিকভাবে স্লিম হলেও ফিট। প্রটেশনাল অ্যাথলেটদের মতো পেশিবহুল দেহত্বক। বেশ ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে রামোনের দেখা শত শত নারীর মাঝে বিশেষ ভাবে আকষর্ণীয় তিন থেকে চার জনের মাঝে বেলাও থাকবে। যাই হোক বেশ সন্তুষ্ট হলো রামোন। এই মেয়েটার জন্যই ওর নিজের ক্যারিয়ারেও বেশ কিছু সফলতা এসেছে।
এতক্ষণে সার্চ শেষ করে আবারো ইসাবেলার স্যুটকেসের ডালা আটকাল দুই নারী। এদের একজন এবারে সুটকেস তুলে বেলাকে নিয়ে গেল কম্পাউন্ডের শেষের গেইটের কাছে। দেয়াল ঘেরা জায়গাটার মাঝে মাত্র দুটো কুঁড়ে ঘর।
একপাশে মশারি টানানো বিছানা অলা বড়সড় একটা লিভিং রুমে বেলা’কে রেখে চলে গেল উর্দিধারী নারী।
খুব দ্রুত আশপাশ দেখে নিল বেলা। পেছন দিকে একটা শাওয়ার রুম আর মাটির টয়লেট আছে। সব দেশে শুনে চিজোরা কনসেশনে শ’নের হান্টিং ক্যাম্পের কথা মনে পড়ে গেল।
পর্দা ঘেরা শেলফ দেখা যেতেই স্যুটকেস খুলতে শুরু করল বেলা। কিন্তু কাজ শেষ হবার আগেই চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি খোলা জানালা দিয়ে সৈকতের দিকে তাকাল।
যেখানে কিংবা যখনই শুনুক না কেন এই আনন্দ মাখা কণ্ঠস্বর চিনতে কখনো ভুল হবে না।
নিকোলাস!
বাদিং ট্রাঙ্ক পরা নিকোলাস আগের চেয়েও ইঞ্চি খানেক বেড়ে গেছে।
সাদা-কালো ডোরাকাটা একটা মনগ্রেল পাপি’র সাথে খেলছে নিকি। হাসতে হাসতে কান ফাটানো চিৎকার করছে নিকি, অন্যদিকে কুকুরের বাচ্চাটাও হিস্টিরিয়ার মতো তীক্ষ্ণ স্বরে ঘেউঘেউ করছে।
হাতে থাকা লাঠিটা সজোরে সমুদ্রে ছুঁড়ে মারল নিকি। আর চিৎকার করে কুকুর ছানাকে আদেশ দিল, “নিয়ে আয়।” খুব দ্রুত সাঁতার কেটে ঠিকই চোয়ালে করে লাঠিটাকে নিয়ে ফিরে এলো কুকুরটা।
“গুড বয়। কাম অন” উৎসাহ দিল নিকোলাস। কিন্তু কুকুরছানাটা তীরে এসে গা ঝাঁপটা দিতেই নিকি’র শরীরে এসে পড়ল পানির ছিটে। লাঠির এক মাথা ধরে ঘোৎ ঘোৎ করে উঠল নিকি। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল কুকুর আর মনিব।
ঝাপসা হয়ে এলো ইসাবেলা’র চোখ। ঘর থেকে বেরিয়ে আস্তে আস্নেত চলে এলো পানির কিনারে। কিন্তু খেলায় ব্যস্ত নিকোলাস খেয়ালই করল না যে দশ মিনিট ধরে চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে বেলা।
যখন দেখতে পেল সাথে সাথে বদলে গেল ওর আচরণ। কুকুর ছানাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে আদেশ দিল “সিট।” জলের ধার রেখে এগিয়ে এলো বেলার কাছে।
“গুড ডে, মাম্মা।” শ্রদ্ধাভরে হাত বাড়িয়ে দিল নিকি, “কেমন কাটছে দিন?”
“তুমি জানতে যে আমি আসব?”
“হ্যাঁ, আর তোমার সাথে লক্ষ্মী হয়েই থাকতে হবে।” সহজভাবে উত্তর দিল নিকি।
“কিন্তু এ কয়দিন স্কুলে যেতে পারব না।”
“তুমি স্কুল পছন্দ করো নিকোলাস?”
“হা, মাম্মা, অনেক। আমি তো এখন পড়তেও পারি। ইংরেজিও শিখছি।” এই ভাষাতেই উত্তর দিল নিকি।
“তোমার ইংরেজি তো বেশ ভালো মজার ব্যাপার হচ্ছে আমিও তোমার জন্য কয়েকটা ইংরেজি বই এনেছি।” নিকি’র দুঃখ কমাতে চাইল বেলা, “মনে হয় তোমার ভাল লাগবে।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
কেন যেন মন খারাপ হয়ে গেল। কোথায় যেন একটা তাল কেটে গেছে বলে ভাবল বেলা।
