বুজার্ড প্রিন্স জাহানের ঘেরাও করা জায়গার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে তার সব সময়কার সঙ্গী দাসটিও দাঁড়িয়ে আছে। বুজার্ডকে পেছনে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এই কারণে যে তার কারণে যেন জনগণের মাঝে কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়। কিন্তু গতকাল সন্ধের ঢেউয়ে যখন একিলিস জাহাজ জাঞ্জিবার এসে পৌঁছায় এর কিছু সময় পরই বুজার্ড এবং বেনবুরি কার্টনির অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে এবং মনে মনে পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলে।
রিভারস যখন ট্রেস ম্যাকোকোস-এ পৌঁছে এক বোতল রাম-এর অর্ডার দিয়েছিল তখন বুজার্ড বেনবুরিকে সাথে নিয়ে ট্রেস ম্যাকোকোস-এর মালিক এর সাথে আলোচনায় মগ্ন।
তিনজন ক্যাপ্টেন-াদের কার্যকলাপ ও কুকীর্তি একই সূত্রে গাথা-কিছুক্ষণের মধ্যেই আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়ল। তারা তিনজন একে অপরকে বহু আগে থেকেই চিনে। রিভারস জানায় যে সে জাঞ্জিবার-এ একটি দাস কিনতে এসেছে। তিন নাম্বার রামের বোতল শেষ করতে করতে সে আরো জানায় এই দাস সাধারণ কোনো দাস নয়, সুলতান-এর প্রিয় দাস।
কিন্তু রিভার একজন দস্যু। কোনো দাস ব্যবসায়ী নয়। একজন মানুষ হঠাৎ করে ছুতার মিস্ত্রী থেকে মুদ্রণকারী হয়ে যেতে পারে না। কেউ যদি এভাবে হঠাৎ করে পেশা বদলে ফেলে তবে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ আছে। বেনবুরি তার দুজন বিশ্বস্ত লোককে একিলিস-এর ওপর নজর রাখতে পাঠায়। তারা যা দেখতে পায় এতে করে বেনবুরির কাছে কারণটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
এরপর নিলাম যখন ক্লাইমেক্সের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল তখন অবশেষে রিভারস বিডিং করা শুরু করে। এটা দেখে বুজার্ড কয়েক কদম সামনে এগিয়ে যায়। প্রিন্স-এর ঘেরাও করা জায়গার পেছন থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল সে। বুজার্ড তার মাথাটা এদিক সেদিক নাড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল সবার কাছে। এরপর সে আবারও পিছিয়ে গেল। এরপর আর একটিও কথা না বলে প্রিন্স জাহান-এর ব্যক্তিগত বক্স-এর পেছন দিকের সিঁড়ি দিয়ে মাটিতে নামতে শুরু করল বুজার্ড। ওর জন্য ঠিক করা দাসটা ওর পেছনে-পেছনে আসছিল। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিল, কারণ তারা জানে যে বুজার্ড প্রিন্স জাহানের সৃষ্টি। এবং সে তাদের মনিবের কথা অনুযায়ীই সব কাজ করে। তাই বুজার্ড যখন জনগণের সামনের দিয়ে হেঁটে ঘেরা দেয়া জায়গাটার পেছনে চলে গেল, তখনো তাদের মনে কোনো সতর্কতা সংকেত বেজে উঠল না।
রিভারস নিলামের দর নিজের দিকে টেনে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী শুধু একজনই আছে এখন। মূল্য প্রায় তিন লাখ সিলভার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এত বেশি দামে এ পর্যন্ত কোনো দাসই বিক্রি হয়নি। এই পরিমাণ দর পরিশোধ করতে হলে হয়ত কার্টনিকে তার জাহাজ, পারিবারিক সম্পত্তি সব বিক্রি করতে হবে। কিন্তু তাতে রিভারস-এর কিছু যায় আসে না।
সে যখন নিলামে জয় প্রায় নিশ্চিত করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই সে অনুভব করল যে কেউ একজন পেছন থেকে এসে তার গলায় ছুরি বসিয়েছে। মাফ করবেন ক্যাপ্টেন, লোকটি তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে থাকে। ক্যাপ্টেন বেনবুরি আপনাকে তার অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন, এবং বলেছেন যে আপনি যদি এখান থেকে বেরিয়ে শান্তিপূর্ণভাব আপনার জাহাজে ফেরত যান তবে আমরা আপনাকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকব।
“তোমাদের ক্যাপ্টেনকে গিয়ে বলবে …” রিভারস বলতে শুরু করল। এরপর সে মাঝপথে থেমে গেল এবং চিন্তা করে দেখল যে ডেট জাহাজটা এরমধ্যে তার দখলে চলে এসেছে। এখন সে যদি বেঁচে থাকে তবে সে তার সম্পদ উপভোগ করতে পারবে। তাই সে তার কথার সুর বদলিয়ে ফেলল। “তাকে বলবেন যে আমি তাকে শুভকামনা জানিয়েছি। আমি তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব যদি তোমরা এখন আমাকে জাহাজে যেতে সাহায্য কর।”
গ্রে তার একচোখ নিলামের দিকে এবং অন্যচোখ দিয়ে কার্টনির ওপর নজর রাখার চেষ্টা করছে। গার্ডদের একটা দল সাধারণ পোশাকে জনগণের মাঝে মিশে আছে। এরা কার্টনির কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে কি-না এটা বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাল-এর সমস্ত মনোযোগ নিলাম-এর দিকে। নিলাম-এর দর নিয়ে তার দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছে। পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য এমনকি সারাজীবনের জন্য হয়ত তাকে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু জুডিথ এবং তার সন্ত নি যদি তার কাছে থাকে তবে এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সাহস পাওয়ার জন্য সে ট্রোম্প-এর দিকে ফিরে তাকাল। কিন্তু ওলন্দাজটা তার পাশে নেই। সে এটা নিয়ে বেশি কিছু ভাবল না। লোকজনের ভিড়ের মাঝে হয়ত কোথাও দূরে সরে গিয়েছে লোকটা।
এরপর সে আবার নিলাম-এর দিকে ফিরে তাকাল। কিন্তু নিলাম ডাকা যে শেষ হয়ে গিয়েছে এটা বুঝতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। নিলামদার জনৈক ইংরেজ ভদ্রলোকের কাছে জিজ্ঞেস করছে যে সে দর আরও বাড়াবে কি-না। সে নিশ্চয়ই রিভারসকে জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু রিভারস করছেটা কী?
ঠিক তখনই হাল-এর পেটে কেউ একজন আঘাত করল। ব্যথায় উঠল সে। এরপর সে মাথায় আরও একটা আঘাত অনুভব করল।
দাস নিলাম-এর সামনের ঘটনাগুলো তার আর জানা হলো না।
*
গেট খুলে দেয়ার পরপরই সর্বপ্রথম যারা নিলামের মাঠে প্রবেশ করে নিলাম-এর মঞ্চের পাশে জায়গা করে নিয়েছিল তারা এ জানতো যে তাদেরকে এখানে অনেকটা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হবে। নিলাম শেষ হওয়ার পূর্বে তারা এখান থেকে বেরুতে পারবে না। অনেকে পানির বোতল, শুকনো খাবার এবং রাম-এর বোতল নিয়ে এসেছে। কয়েকজন মিলে মঞ্চের সামনের অংশের একদিকে একটা ছোটখাট ক্যাম্প তৈরি করেছে। সেখানে রয়েছে নানারকম খাদ্য সম্ভার, কাঠের পিপা ভর্তি বিয়ার। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা পিপা শেষ হয়ে গেল। আরেকটা পিপা সামনের সারিতে লোকজনের বসার জায়গার নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঐ পিপাটার ছিপি খোলা ছিল। ওটার ভেতর গান পাউডার ভর্তি করে গড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সকলের অজান্তে।
