একের পর এক সব দাস নিলামে বিক্রি হয়ে গেলে সবশেষে জুডিথ-এর জন্য ডাক দেয়া হয়। দিনের সবচেয়ে সেরা পণ্য হিসেবে জুডিথ-এর নাম উল্লেখ করা হলো, সেই সাথে তার রসালো বর্ণনা দেয়া হলো। হাল যে তার সন্তানের পিতা এটাও উল্লেখ করতে ভুলল না তারা। জুডিথ-এর হাতদুটো পেছন দিকে বাঁধা আছে। তাই সামনের লোকগুলোর লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার কোনো রাস্তাই তার সামনে খোলা ছিল না।
হাল-এর ক্রোধ বাড়তে বাড়তে এমন উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে যেমনটা সে তার জীবনে কোনোদিন অনুভব করেনি। তার রক্ত চলাচল বেড়ে গিয়েছে। তার নিঃশ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তার দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হতে শুরু করেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে কোনো শত্রুকে বধ করার জন্য সে উন্মত্ত হয়ে আছে। তার ডান হাতের মুষ্টি কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে যেন সে যুদ্ধের ময়দানে তলোয়ার-এর বাট ধরে আছে।
“না,” ট্রোম্প হাল-এর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “মোটেও না! আমি আপনার অনুভূতি বুঝতে পারছি। আমি জানি আপনি তাদের সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাচ্ছেন। কিন্তু আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। রিভারসকে তার কাজ করতে দিন। আপনি যদি এখন আপনার নিজের দিকে সমস্ত আকর্ষণ টেনে আনেন তাহলে সব পরিকল্পনা বিনষ্ট হয়ে যাবে।”
ট্রোম্প কি বলছে তার একটি কথাও হাল ভালভাবে বুঝতে পারল না। কিন্তু তার শারীরিক বাধা এবং কণ্ঠের আওয়াজে হাল-এর রাগ কিছুটা শান্ত হলো।
হাল তার শরীর ও মনকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সে নিজেকে বোঝনোর চেষ্টা করতে লাগল যে নিলামদার দর হাঁকানোর পূর্ব পর্যন্ত হলেও তাকে শান্ত থাকতে হবে। দস্যু রিভারসকে তার কাজ করতে দিতে হবে। নয়ত সব কিছু বিনষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু তারপরও সে সরাসরি জুডিথ-এর দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে চিৎকার করে উঠে, চিন্তা করো না, প্রিয়তমা। আমি এখানে আছি। তোমার সাথেই আছি।
.
জাঞ্জিবার-এর রাস্তায় কিছু কিছু পুচকে ছোরা দেখা যায় যারা ক্ষুধার্ত পথচারীদের কাছে ফলমূল কিংবা অন্যান্য খাবার বিক্রি করে। পথচারীদের পকেট থেকে কিছু টাকা আদায় করাই এদের উদ্দেশ্য।
সেরকমই একটা ছেলে নিলামের বাজারে এখানে সেখানে ঘুরছে। কিন্তু, সে কারো কাছ থেকে কোনো টাকা আদায় করার চেষ্টা করছে না। সে চুরি করার চেষ্টা করছে। বিক্রয়ের দিকে যে তার মনোযোগ আছে সেটাও বলা যায় না। মাঝে মাঝে সে করুণ চোখে জুডিথ-এর দিকে তাকাচ্ছে। তবে তার সমস্ত মনোযোগ একজনের দিকেই নিবিষ্ট আছে। তাকে সেভাবেই পরিষ্কারভাবে আদেশ দেয়া আছে। সে যাই করুক যেখানেই যাক তাকে অনুসরণ করবে। তার ওপর থেকে তোমার চোখ সরাবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত না সে এবং তুমি উপকূল থেকে চলে আসবে অথবা তাকে এই দ্বীপের বাইরে কোথাও নিয়ে যাবে।”
.
গ্রে প্রিন্স জাহানকে প্ররোচনা দিয়েছে যে তার উচিত ভিড়ের মাঝে কার্টনিকে খুঁজে বের করা। এটা সত্য যে বুজার্ড ক্যাপ্টেন কার্টনিকে আমার চেয়ে ভাল চিনে। সে বলতে থাকে, কিন্তু তার আগমনই ভিড়ের মধ্যে সবাইকে এলোমেলো করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। “আমি বহুবছর যাবত মানুষের ব্যবসা করে আসছি। মানুষ চেনার উপায় আমি জানি। আমি ক্যাপ্টেন কার্টনিকে খুঁজে বের করার মতো যথেষ্ট চিনি, কিন্তু ভিড়ের দিকে না তাকিয়ে আমি ক্যাপ্টেন কার্টনিকে খুঁজে বের করার উপায় জানি।”
আর তাই সে পর্দা দিয়ে ঘেরা জায়গাটার প্রথম সারিতে বসল। তার দুই পাশে সুলতান-এর গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে জুডিথ, এর দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। গ্রে-র মনে ক্ষীণ ইচ্ছে জাগছিল একবার দর হাঁকানোর। এমন সুন্দরী রমণীর জন্য যে কোনো পুরুষের মনেই ইচ্ছে জাগতে পারে। কিন্তু জুডিথ-এর দিকে সে একজন ক্রেতার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না কিংবা একজন প্রেমিক পুরুষের দৃষ্টিতেও তাকাচ্ছে না। তার অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে একারণেই সে জুডিথ-এর সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
জুডিথ চায় না পশুর ন্যায় নিচু জাতের কোনো লোক তাকে কিনে নিয়ে যাক। সে জেনারেল পদমর্যাদার অধিকারী এবং তার শরীরে উচ্চবংশীয় রক্ত বইছে। যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক না কেন সে সেই সম্মান এবং স্পিরিট রক্ষা করার চেষ্ট করবে। সেই সাথে সে জানে যে যত বাধাই আসুক না কেন হাল তার জন্য এখানে আসবে। কিন্তু কোথায় সে?
জুডিথ বুঝতে পারছে যে হাল ছদ্মবেশে আসবে। তাই জুডিথ ভিড়ের ভেতর সেই সবুজ চোখের গভীরতা খুঁজে বেড়াতে থাকে যা তাকে হালের উপস্থিতির নিশ্চয়তা দেবে। একইসাথে সে খুঁজতে থাকে হাল-এর নাকের বাঁকানো অংশটাকে, কিংবা সেই ভঙ্গিমা বা চেহারার সেই চিহ্নটা, যার কারণে তাকে যুবক রাজার মতো মনে হয়।
এভাবেই খুঁজতে খুঁজতে একসময় সে তার প্রিয় মানুষটির দেখা পেয়ে গেল সে। ভিড়ের মাঝে দুটি চোখের দৃষ্টি তার অক্ষিপটে ধরা পড়ে। সে জানে এই সেই ব্যক্তি, কারণ এই চোখের দৃষ্টি সে অন্তরের অন্তস্তল থেকে চেনে। দেখা পাওয়া মাত্র মনের ভেতরের সেই খুশি সে ধরে রাখতে পারে না। তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে।
জুডিথ-এর মুখে হাসি ফুটতে দেখে গ্রে’র মুখেও হাসি ফুটে উঠল। সে জুডিথ এর দৃষ্টি অনুসরণ করে ভিড়ের দিকে তাকাল। অগোছালো কিছু সম্ভ্রান্ত কাপড় পরা শ্যামবর্ণের লম্বা একজন পুরুষ ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রে সেই পুরুষের দৃষ্টি অনুসরণ করে আবারও জুডিথ-এর দিকে তাকাল। এরপর সে গার্ডদের দিকে ফিরে অন্য কোনোরকম আলোচনায় না গিয়ে সরাসরি বলল, “ওই যে তোমাদের সেই লোক, ক্যাপ্টেন কাটনি। এখন তোমাদের লোকদের বল তাকে ধরে আনতে।”
