“সম্ভবত না”, হাল বলল।
“আমি তোমার কথা বিবেচনা করব শুধু এই কারণে যে একসময় আমিও কাউকে হারিয়েছিলাম।” রিভারস তার গ্লাসের শেষ ওয়াইনটুকুও পান করে নিলো। এরপর কিছুক্ষণ নিজের পেছনের গল্পের মধ্যে হারিয়ে গেল। “কী নাম তার?” অবশেষে সে জিজ্ঞেস করল।
“জুডিথ,” নামটা উচ্চারণ করার সাথে সাথে হাল-এর মনে অন্যরকম একধরনের অনুভূতি হচ্ছিল।
“খুব ভাল মেয়ে, তাই না?”
“আমার দেখা সবচেয়ে ভাল মেয়ে।”
“একজন পুরুষের জন্য সবচেয়ে ভাল উপহার হচ্ছে এমন একজন নারী, যে তাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালবাসবে।”
বুড়ো শয়তানটার তাহলে হৃদয়ও আছে। মনে মনে চিন্তা করল হাল।
অবশেষে রিভারস রাজি হলো। “আমি তোমার সঙ্গে জাঞ্জিবার-এ যেতে রাজি আছি। সেখানে গিয়ে আমি তোমার স্ত্রীকে কিনে আনার ব্যবস্থা করব।”।
৬. মানুষ কেনা-বেচার বাজারে
জাঞ্জিবার-এ মানুষ কেনা-বেচার বাজারে এযাবত কালের সবচেয়ে দামি পণ্য আজকে বিক্রয়ের জন্য আনা হয়েছে। জাঞ্জিবারের লোকেরা গর্ব সহকারে বলাবলি করছে, পৃথিবীর কোথাও এত উচ্চদামের মানুষ পাওয়া যায় না। বিক্রয়ের পূর্বে জুডিথকে একটা আবদ্ধ ঘরে নিয়ে রাখা হলো যেখানে সব দাসকেই বিক্রয়ের পূর্বে রাখা হয়। এতদিনে জুডিথ প্রিন্স জাহানের হারেমের জামাকাপড় পরতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ সেসব জামাকাপড় খুলে তাকে একটা এপ্রনের মতো কাপড় পরতে দেয়া হয়েছে। কাপড়টা শুধু তার গলা থেকে সামনের দিকে ঝুলে আছে। তার হাতদুটো পেছন দিকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মাথায় একটা রশি বাঁধা যেটা ধরে তাকে টেনে একদল বিক্রেতার মাঝখান দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যারা বিক্রয়ের পূর্বে তাদের পণ্যগুলোকে ভালভাবে দেখে নিচ্ছিল।
জুডিথকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য করা হলো। সে তার বুকের ওপর একটা শক্তহাত অনুভব করল। মহিলারা সবজি কেনার পূর্বে যেভাবে পরীক্ষা করে দেখে অনেকটা সেরকমভাবেই হাতদুটো তাকে পরখ করে দেখছিল। পা দুটোর মাঝে যথেষ্ট ব্যবধান রেখে তাকে বাঁকা হয়ে দাঁড়াতে বলা হলো। তার পেছন দিকটা বিক্রেতাদের দিকে ফেরানো আছে যেন তারা তার গোপন অঙ্গগুলো ভালভাবে দেখতে পারে। এরপর লোকগুলো তার ঠোঁটদুটো সরিয়ে দাঁতগুলো পরীক্ষা করে দেখল। ঘোড়া কেনার সময় যেভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয় অনেকটা সেরকমভাবে।
হাল এবং অ্যাবোলির সাথে কিছুদিন আগের এক আলাচনার কথা মনে পড়ল ওর। ওলন্দাজদের কেপ কলোনীর দাসদের ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করছিল ওরা।
“তোমার সমস্যা কী জান, গান্ডওয়েন? তুমি সবসময় লড়াই করতে চাইতে। কিন্তু দাসদের প্রথম যে জিনিসটা শিখতে হয় তা হলো লড়াই করে কিছু পাওয়া যায় না। মনিব তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তোমাকে চাবুক মারবে। এরচাইতেও খারাপ যা করবে তা হাল তোমাকে কোনো খাঁচায় বা মাটির নিচে কোনো গর্তে বন্দি করে রাখা হবে। সূর্যের খরতাপে তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলবে। বৃষ্টিতে ভিজতে বলবে। তাই তাদেরকে সেই আনন্দটা পেতে দিও না। তাদের নিষ্ঠুরতা, আর তাদের অপমানকে সহ্য করতে হবে, কিছুই বলা যাবে না। সহ্য করতে হবে এই কারণে যে কেবল এইভাবেই তুমি বেঁচে থাকতে পারবে, তোমার সন্তান বেঁচে থাকতে পারবে। সেই সাথে প্রার্থনা করতে হবে, মনে মনে আশা করতে হবে যে একদিন তুমি মুক্ত হবে।”
সে কারণেই জুডিথ চুপচাপ সবকিছু সহ্য করে রইলো। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে সে হালকে খুঁজতে থাকল। অবশ্য সে বুঝতে পারছে না যে সে কী সত্যিই হালকে এখানে প্রত্যাশা করছে কি-না। সে শুধু জানতে চায় হাল তার জন্য এখানে এসেছে, নাকি আসেনি। জুডিথকে এই অবস্থায় দেখতে পাওয়াটা তাদের দুজনের জন্যই অনেক অসম্মানের ব্যাপার। কিন্তু তার চাইতেও বেশি অসম্মানের ঘটনা ঘটছে এখানে। লোকগুলো খুঁটিয়ে দেখার পর আবার তা নিয়ে জনসম্মুখে আলোচনা করছে যেন সে কানে শুনতে না পাওয়া কোনো পশু।
কুটনৈতিক মিশনে তার বাবার সফরসঙ্গী হিসেবে জুডিথ শুধু ভেনিসেই যায়নি, বরং ইউরোপের অন্যান্য অনেক শহরেও ঘুরে বেড়িয়েছে। তরুণ বয়সের কারণে এবং ভাষার দক্ষতার কারণে সে সেসব শহরের মানুষের সাথে মিশে যেতে পেরেছে খুব সহজে। বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ভাষা, অ্যামহারিক এবং অ্যারাবিক ভাষা ছিল তার নখদর্পণে। কিন্তু সেই ভাষার দক্ষতাটাকেই এখন তার কাছে অভিশাপ মনে হচ্ছে। কারণ আশেপাশের লোকগুলোর কথা তার গায়ে কাঁটার মতো বিঁধছে।
একটা ওলন্দাজ তার বন্ধুকে বলছে, “তুমি কী জান এই গাভীটা তার পেটে একটা বাছুর বহন করছে? তাও আবার একটা সাদা চামড়ার লোকের!”
এক পর্তুগীজ ব্যবসায়ী আরেক ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞেস করছে। “সুলতান কেন এই কালো রত্নটাকে বিক্রি করছে? এই রত্ন যদি আমার কাছে থাকত তবে আমি তাকে বিছানার সাথে বেঁধে রাখতাম।”
“আমি জানতে পেরেছি যে এটা নাকি একধরনের প্রতিশোধ,” উত্তরে আরেকজন বলল। “তার জন্ম নিশ্চয়ই কোনো উচ্চ সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ওর হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে দেখ। অন্যান্য দাসদের মতো নয়। তাকে যখন ব্লক-এ উঠানো হবে তখন নিশ্চয়ই তার পরিচয় উন্মোচিত হবে। তারা বলছে শুধু এর নাম উচ্চারিত হলেই দাম দশ হাজার সিলভার রুপি বেড়ে যাবে।”
