“মি. টেইলার নোঙর ফেলার ব্যবস্থা কর। যতদূর আসা সম্ভব আমরা চলে এসেছি।” এখান থেকে দুই ক্যাবল সমান পরিষ্কার নীল পানি পার হলেই বী। সেই বী সমুদ্রতল থেকে সাত ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। হাল এই জায়গাটার প্রশংসা না করে পারছে না। কোনো জাহাজ যাওয়ার সময় হয়ত এই জাহাজটাকে দেখতে পারে,” হাল বলতে থাকে। কিন্তু সেটা যদি এখানে এসে নোঙর না ফেলে তবে ইলহা মাতন্ডকে অন্যান্য দ্বীপের মতই মরুভূমি মনে হবে।”
ডেফট-এর পালও নামিয়ে ফেলা হলো। গোল্ডেন বাউ-এর গতি থামিয়ে দেয়া হলো সেই সাথে। ওটা আস্তে আস্তে মৃদু তালে দুলতে শুরু করল। জাহাজের নোঙরটা যখন সাগরের গরম পানিতে ফেলে দেয়া হলো তখন এটা চতুর্দিকে পানি ছিটিয়ে দিল। শেকলে যখন টান পড়ল তখন শেকলটাও পানির ভেতর মৃদু কম্পনে দুলতে শুরু করল।
“ওই দেখ, ওদের ঘোট রণতরী দেখা যাচ্ছে। হাল হাত দিয়ে ইশারা করে একটা জাহাজ দেখায় যেটার পাশে তিনটা পানসি নৌকো রাখা আছে।
“এটা হচ্ছে একিলিস নামক জাহাজটা, ট্রোম্প বলতে শুরু করে। “এটাকে দেখে হয়ত মনে হচ্ছে না যে ক্যাপ্টেন একে নিয়ে নির্বিগ্নে সাগরে চলাচল করতে পারে। কিন্তু খালি চোখে দেখে ওর আসল সৌন্দর্য বোঝা সম্ভব না।”
“আমি তোমার কথা মেনে নিচ্ছি,” হাল বলে উঠল। “আমি বাজি ধরে বলতে পারি এটা অনেক দ্রুত চলে।”
একিলিস জাহাজের বন্দুকগুলো গোল্ডেন বাউ-এর বন্দুক-এর মতো আট ফুট লম্বা নয়। কিন্তু সেটার প্রয়োজনও নেই কারণ একিলিস-এর বন্দুকগুলোতে রাউন্ডশট-এর বদলে গ্রেপশট লোড করা আছে।
ট্রোম্প আবারও ক্যাপ্টেন রিভারস-এর ব্যাপারে বলতে শুরু করে। তার নাবিকগুলো হচ্ছে এক একটা শয়তান, ক্যাপ্টেন কার্টনি। অধিকাংশ নাবিক যুদ্ধ করার চেয়ে বরং সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি আছে।”
হাল মনে মনে এই দস্যু ক্যাপ্টেন-এর কথা ভাবতে থাকে যার সাথে সে আজকে দেখা করতে এসেছে। নামটা তার কাছে বেশ পরিচিত ঠেকছে। তার বাবার বন্ধু অন্য ক্যাপ্টেনদের মুখে সে এই নাম শুনেছে। লোকটা সামরিক যুদ্ধ থেকে পালিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যায়। এখন সে ইন্ডিয়ান সাগরের কেপ অফ গুড হোপ থেকে শুরু করে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে মাদাগাস্কার পর্যন্ত চষে বেড়ায়। সেই সাথে বণিক এবং দাস বিক্রেতাদের জাহাজ-তা সে যেই পতাকাই বহন করুন না কেন-লুণ্ঠন করে।
“সে একজন খুনি, স্যার হেনরী”, ট্রোম্প তাকে সতর্ক করে দেয়।
“সেটা আমি শুনেছি”, হাল বেশ চিন্তাপূর্ণভাবে মাথা নাড়ায়। কিন্তু এই লোকটার সাথে দেখা করার ব্যাপারে হাল-এর মনে কোনো দ্বিধা নেই। যে করেই হোক দেখা করতেই হবে।
“কিন্তু এই লোকটার সাথে আমার একটা বোঝাঁপড়া আছে, ট্রাম্প তাকে আশ্বস্ত করল।
“কারণ তুমি নিজেও একজন দস্যু,” হাল চোখ বাঁকা করে ট্রোম্প-এর দিকে তাকিয়ে বলল।
সমুদ্রের পানির ওপর জমে থাকা তেলের স্তর যেভাবে সরিয়ে দেয়া হয়, ঠিক সেভাবেই কাঁধ ঝাঁকি দিয়ে কথাটা সরিয়ে দিল ট্রোম্প। “ব্যবসায়িক স্বার্থে দুজন মানুষ একসাথে চলতে গেলে কিছুটা তাল মিলিয়ে চলতেই হয়।” নয়ত চাকা সমানতালে ঘুরে না। এরপর হাল-এর অস্বস্তি ভাব বুঝতে পেরে বলল, “তথাপি আমি বুঝতে পারছি যে আপনার মতো সম্ভ্রান্ত ইংরেজ-এর এরকম লোকের সাথে ডিল করতে যাওয়া কতটা অরুচিকর ব্যাপার।”
হাল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বীচ-এর ওপর দস্যুদের সমাগম দেখতে থাকে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে নেড টেইলরকে নোঙর তুলে ফেলার আদেশ দেয়, সেই সাথে পাল উঠাতে বলে। বাতাসে পাল ভাসিয়ে দিয়ে সে আবারও জাহাজ নিয়ে ফেরত যেতে চায়। কিন্তু বহু কষ্টে সেই ইচ্ছা দমন করল সে।
“আমি ভাবছি, আমার পিতা এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী করতেন।”
“এসব আমার ওপর ছেড়ে দিন,” স্মিত হাসি দিয়ে বলল ট্রোম্প। “ক্যাপ্টেন রিভারের সাথে সব ব্যাপার আমি মীমাংসা করব। এ ব্যাপারে আপনি আপনার হাত পরিষ্কার রাখবেন।”
হাল তার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। হাত উঠিয়ে আশ্বস্ত করল ট্রোম্প।
“সবকিছু কী আমি পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পেরেছি?” ওলন্দাজ লোকটা বলল।
হাল হ্যাঁ-সূচক দৃষ্টি দিয়ে আবার বীচ-এর দিকে ফিরে তাকায়। সে মনে মনে ভাবতে লাগল যে তারা যখন এখানে এসে পড়েছে তখন কি ঘটে দেখাই যাক।
সাথে-সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে-এই ব্যাপারটা তার নিজস্ব পন্থায় করবে সে।
“মি. লোভেল, পানসি তৈরি কর,” সে হাঁক ছাড়ল। ট্রোম্প হয়ত দস্যু রিভারসকে বিশ্বাস করতে পারে কিন্তু সে তার ওপর একবিন্দুও বিশ্বাস রাখতে পারছে না। সে লংবোট-এ করে তার লোকদের নিয়ে এভাবে দস্যুর কাছে যেতে পারে না। সে অন্তত পানসিতে করে যেতে পারে। পানসিতে নিজেদের বন্দুক এবং অস্ত্রসস্ত্র রাখা থাকবে। অস্ত্র হাতে লোকেরা প্রস্তুত থাকবে।
“এই কী সেই লোক, মি. ট্রোম্প?” হাল জিজ্ঞেস করল। যদিও সে জানে। যে তার এই কথা জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজনই নেই। ধূসর রঙের চুলগুলো পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধা লম্বা লোকটাই যে রিভারস এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যান্য সবার মতো সেও সুতি শার্ট এবং পেটিকোট জাতীয় একটা পোশাক পরে আছে।
“হ্যাঁ, এই সেই ব্যক্তি।”
“সে নিশ্চয়ই এরকম একটা পানসিতে করে আমাকে এখানে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসাটা পছন্দ করবে না। তুমি যে শুধু আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছ তাই না। আমি চাইলে এই দূরত্ব থেকে স্লিন্টার দিয়ে তার একিলিসও উড়িয়ে দিতে পারি।”
