কিন্তু রিভারস তার জায়গা থেকে নড়ছে না। কেউ কাউকে পালানোর ব্যাপারে কোনো আদেশও দিচ্ছে না। রিভারস শুধু এক যুবক ছেলেকে বলল দৌড়ে গিয়ে তার টেলিস্কোপটা নিয়ে আসতে। যদিও বালকটা সেটা নিয়ে আসতে আসতে তার আর সেটার প্রয়োজনই পড়ল না। জাহাজটার মধ্যে একটা ব্যতিক্রম কিছু লক্ষ করা যাচ্ছে। জাহাজ এবং বালির পাড়-এর মাঝে যেটুকু ব্যবধান আছে তাতে জাহাজটার থেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারপরও জাহাজটা এগিয়ে আসছে। অর্থাৎ এই দ্বীপের পথ সম্পর্কে ক্যাপ্টেন-এর ভালই ধারণা আছে।
অথবা, সে জাহাজের ক্যাপ্টেন নয়। অন্যকেউ জাহাজটার সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে আছে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জাহাজের লোকগুলোকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে।
এরপর রিভারস সেই চিহ্ন দেখতে পায়-জাহাজটার মাস্তুলের চূড়ায় দুটি পতাকা উড়ছে। একটি হচ্ছে কমলা, সাদা এবং নীল-এর মিশ্রণে ডাচ রিপাবলিক-এর পতাকা। অন্যটা হচ্ছে ইউনিয়ন-এর পতাকা। কিন্তু ক্যাপ্টেন কেন দুটি পতাকাই উড়িয়েছে। ইংরেজরা হয়ত ডাচদের সাথে শান্তিচুক্তিতে আছে। কিন্তু রিভারস কখনো একসাথে দুই দেশের পতাকা উড়াতে দেখেনি, আর দেখবে বলেও মনে হয় না।
তারপর শোনা যায় সেই শব্দ। পর পর তিনটা কামানের গর্জন। কামানের ধোয়া বাতাসে মিশে যেতে থাকে।
ডাউলিং বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে, তারপর হেসে উঠে আপনমনে। এটা কোনো আক্রমণের ইঙ্গিত নয়। এটা হচ্ছে স্যালুট। যারা একিলিসের দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল তাদের উদ্দেশ্যে সে চিৎকার করে উঠল। তাদেরকে সে জানাল যে আজকে আর কোনো যুদ্ধ হবে না।
“গুড ডে, মিজনহিয়ার,” রণতরীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল রিভারস। এই তিন কামানের স্যালুট ক্যাপ্টেন মাইকেল ট্রোম্প-এর নিজস্ব অভ্যর্থনা স্টাইল। ক্যাপ্টেন ট্রোম্প অতীতে বিভিন্ন দরকারে যতবারই এসেছিল, এইভাবেই স্যালুট জানিয়ে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিল।
“এই চিজ-হেড লোকটা এখানে কী করছে?” ডাউলিং নিজের মনে বলতে থাকে। সেই সাথে মনোযোগ দিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতে থাকে।
রিভারস মাথা নাড়িয়ে বলল, “এটা তার জাহাজ নয়। সে হচ্ছে অত্যন্ত লোভী মানুষ। কিন্তু সে এতটা বোকা নয় যে মহামান্য রাজার এই চিহ্ন সে বহন করবে। সে ভ্রু কুঁচকায় যেন সে নিজের যুক্তি নিজেই মেনে নিতে পারছে না। “কিন্তু কেন সে এটা করেছে”, সে রণতরীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রণতরীর অগ্রভাগটা তাদের দিকেই তাক করা।
“তাহলে সম্ভবত…” জন ব্লাইটন ভ্রু কুঁচকে বলল, “সম্ভবত ট্রাম্প বেইমানি করে ইংরেজদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে আমাদের সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তছনছ করে দেয়ার জন্য।
“শান্ত হও, বালক”, রিভারস তার মাথা নাড়ায়। ট্রোম্প তা করবে না। যদিও সেরকম বেইমানির কথা মনে করে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। “সে জানে যে সে যদি এই কাজ করে তবে আমি তাকে ফাঁসিতে ঝুলাব। এরপর সে তার কোয়ার্টারমাস্টার-এর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, “মি, ডাউলিং তুমি জান এখন কী করতে হবে?”
লোকটি মাথা নাড়িয়ে মার্চ করতে করতে বিচ-এর দিকে এগিয়ে গেল।
*
ব্যাপারটা এমন নয় যে এই প্রথমবারের মতো হাল এমন কারও ওপর তার আস্থা ও বিশ্বাস সমর্পণ করেছে যে কি-না কিছুক্ষণ আগেও তার শত্রু ছিল। পূর্বের মতো এবারও ট্রোম্প তার নৌবিদ্যা এবং জাহাজ পরিচালনার দক্ষতা দিয়ে হালকে মুগ্ধ করল। জায়গাটা বেশ বিপদজনক। ট্রোম্প তার পূর্বের স্মৃতি মনে করে সেইভাবে জাহাজকে চালিয়ে নিয়ে গেল। বর্তমানে টেইলারকে জাহাজের হাল ধরার ব্যাপারে নির্দেশনা দিচ্ছে সে। হাল এবং জন লোভেল জাহাজের পালের দিকে নজর রাখছে। অ্যামাড়োডাদেরকে মাস্তুলের ওপর উঠিয়ে রাখা হয়েছে যেন তারা বাতাসের গতি পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত যে-কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে।
বাকি সব নাবিক যেন তাদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছে, একইসাথে জিহ্বাও শক্ত করে রেখেছে। শুধু কান দুটোই সজাগ রেখেছে এখনো। কারণ বাউ যদি প্রবাল পাথরের সাথে বিন্দুমাত্র ধাক্কা খায় সেই শব্দটাও তাদের শুনতে হবে। এছাড়াও তারা তাদের পা দুটো ডেক-এর ওপর এমনভাবে স্থির করে রেখেছে যেভাবে কোনো মাকড়সা তার জালের ওপর পা দিয়ে আটকে থাকে। জাহাজে যদি বিন্দুমাত্র কম্পনও হয় সেটাও তারা অনুভব করতে পারবে এখন।
কিন্তু জাহাজের ভেতরে তারা কোনো কম্পন অনুভব করল না। কোনো কম্পন না থাকায় হাল এবং অফিসারগণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাঁ-সূচক মাথা নাড়ায়। এই জায়গাটা বেশ বিপজ্জনক। জাহাজের বেসটা যে-কোনো সময় পানির নিচের কোনো বড় পাথর খরে সাথে ধাক্কা লাগতে পারে।
“দশ ফ্যাদম, ক্যাপ্টেন,” একজন নাবিক পানির গভীরতা মেপে হালকে জানাল।
“আমাদের জাহাজের গন্তব্য এই পর্যন্তই।” ক্যাপ্টেন ট্রাম্প হাল-এর দিকে আসতে আসতে বলল। তার কপাল চুঁইয়ে ঘামের ফোঁটা নিচে পড়ছে। “আমাদের এখান থেকে সংবোট-এ করে যেতে হবে।”
“ধন্যবাদ, মি, ট্রাম্প”, হাল ট্রোম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে এরপর অন্যদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “উপরের পাল গুটিয়ে রাখার ব্যবস্থা কর।” বলার সাথে সাথে অ্যামোডোডারা নিচে নামতে থাকে। দেখে মনে হচ্ছিল যেন একদল কাঠবিড়ালী ওক গাছ বেয়ে নিচে নামছে।
