“ঝড় তো ওকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে,” অ্যাবোলি বলে উঠল। নেড টেইলর যখন জাহাজের সম্মুখভাগটাকে ঝড়ের দিকে এগিয়ে নিলো তখন ধমকা বাতাস এসে হাল-এর মুখে আঘাত করল।
“সবাই শক্তভাবে ধরে থাক”, হাল সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠে। যদিও ঝড়ের কারণে কথা খুব একটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। ঝড়ো বাতাস গোল্ডেন বাউ-এর চারপাশটাকে গ্রাস করে ফেলেছে। অসম্ভব তীব্র বাতাস-এর সাথে পাল্লা দিয়ে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছে। মনে হচ্ছে যেন সবাইকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। হাল কোমড় বাকা করে শক্ত কিছু একটা ধরে রেখেছে।
“অ্যাবোলি, নেডকে সাহায্য কর।” হাল নেডের দিকে তাকিয়ে বলল। অ্যাবোলি বাধ্যগতভাবে এগিয়ে গিয়ে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে জাহাজের হাল ধরে রাখতে সাহায্য করল। ঝড়ের বাতাসে জাহাজটা রক এন্ড রোলিং গতিতে এদিক সেদিক ঘুরছে। দুলতে দুলতে জাহাজের এক অংশ প্রায় পানির নিচে তলিয়ে গেল। ভয়াবহ কয়েক মুহূর্তের জন্য পানির নিচে ডুবতে থাকে হাল। এরপর আবারও জাহাজের তলদেশটা আস্তে আস্তে ভেসে উঠল। ঠিক তখনই হাল ওপর থেকে তীব্র চিৎকার শুনতে পেল। অ্যাডি নামের ছেলেটি মাস্তুলের ওপর থেকে এক ঝটকায় নিচে পড়ে সাগরের বুকে আঘাত করেছে। পরমুহূর্তেই সে অদৃশ্য হয়ে যায় যেন অ্যাডি নামে কারো অস্তিত্বই কখনো ছিল না। সাথে সাথে উন্মত্ত সাগর তাকে গ্রাস করে ফেলল।
এরপর আর ডেক-এর ওপর থেকে কোনো চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেল হাল। যার ফলে সে নিশ্চিন্ত হলো যে জাহাজটা এখনো নিরাপদ অবস্থানে আছে। কিন্তু তখনই সে নিচ থেকে ক্রমাগতা পাম্পের শব্দ শুনতে পেল জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করা পানি সরানোর চেষ্টা করছে সবাই।
এরপরই উত্তর দিক থেকে বিশাল বিশাল পানির ঢেউ এগিয়ে এলো। হাল জানে যে সে যতই প্রস্তুতি নিক না কেন, এই ঢেউ-এ যদি তার জাহাজের পাল না ছিঁড়ে যায়, তবে সেটাকে অবিশ্বাস্য রকমের ভাগ্য হিসেবে মেনে নিতে হবে।
“বাবা, আপনি আমাদের সাথে থাকুন!” সে চিৎকার করে বলে উঠল। ঈশ্বর আর তার পিতা, উভয়ের কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল সে। যে ঢেউটা এগিয়ে আসছে সেটা প্রায় প্রধান মাস্তুলের সমান। ওটা লবণাক্ত পানি আর ফেনায় সমস্ত জাহাজকে ভাসিয়ে দিয়ে যায়। অ্যামোড়োডা সৈন্যরা-যারা এর আগে কখনো এরূপ ঝড়ের সম্মুখীন হয়নি-ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তাদের বন্য ঈশ্বরকে ডাকতে থাকল।
“আমার জাহাজ এটা সামলে উঠতে পারবে। তোমরা ভয় পেয়োনা। সে এরচেয়েও বড় ঝড় দেখেছে জীবনে।” হাল তার নাবিকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু অন্ধকার আরও বাড়ছিল, সেই সাথে আরও বড় বড় ঢেউ এসে জাহাজটাকে ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছিল।
অন্ধকার এবং উত্তাল ঢেউয়ের মাঝ থেকে হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পায় হাল। তার সেই প্রিয় কণ্ঠটা বলছিল, “শক্তভাবে ধরে রাখ, যেন পানিতে হারিয়ে না যাও। তোমাকে আমাদের প্রয়োজন। আমার এবং আমাদের সন্তান, দুজনেরই তোমাকে প্রয়োজন। প্লিজ আমাদেরকে ছেড়ে যেও না। আমাদের জন্য হলেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ।”
হাল সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরের অনুরোধের উত্তর দেয়। “আমি বেঁচে থাকব। অবশ্যই বেঁচে থাকব জুডিথ। আমার জন্য অপেক্ষা কর, মাই লাভ। আর একটু অপেক্ষা কর।”
প্রায় বারঘণ্টার কাছাকাছি তাণ্ডব চালানোর পর থামল সেই উন্মাতাল ঝড়। যদিও গোল্ডেন বাউকে তছনছ করে দিয়েছে ওটা, কিন্তু তারপরও জাহাজটা টিকে আছে। স্যাম অ্যাডি বাদে অন্য কাউকে তাদের হারাতে হয়নি।
শুধু হাল হতাশ হয়ে পড়েছে। কারণ ঝড়ের কারণে তার জাহাজটা দক্ষিণ দিকে অনেকদূর ভেসে গিয়েছে। জাঞ্জিবার থেকে সে আরও দূরে সরে গিয়েছে। জুডিথ-এর কাছে পৌঁছতে তার অনেক সময় লেগে যাবে।
“বাতাস থেমে গেছে, গান্ডওয়েন, অ্যাবোলি তাকে উৎফুল্ল করার চেষ্টা করল।” “আমরা আবার উত্তর দিকে যাত্রা করতে পারব। জাঞ্জিবার-এ পৌঁছাতে পারব…” এইটুকু বলার পর অ্যাবোলি বলতে চেয়েছিল, “জুডিথ বিক্রি হওয়ার পূর্বেই পৌঁছতে পারব,” কিন্তু সময়মত সে নিজেকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল। “দাস নিলামের আগেই।”
“হয়ত জাঞ্জিবার-এর কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায় নোঙ্গর করতে পারব,” হাল জবাব দিল। “কিন্তু আমরা জাঞ্জিবার-এ পৌঁছাতে পারব কী? জাহান এবং তার লোকেরা আমাদের প্রত্যাশায় বসে আছে। নিশ্চয়ই প্রতিটি উপকূলে, প্রতিটি বন্দরে, এমনকি প্রতিটি বাজারের লোকজনকে বলে দেয়া আছে আমাদের ব্যাপারে কিংবা জুডিথকে উদ্ধারের ব্যাপারে সন্দেহভাজন যে কারও ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া আছে।”
“সেক্ষেত্রে, আপনার অবশ্যই জেনারেল জুডিথ নাজেতকে উদ্ধার না করতে চাওয়াই উচিত,” ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় হালকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“তুমি কী বোঝাতে চাইছ? আমি কেন জুডিথকে উদ্ধার করতে চাইব না? অবশ্যই আমি তাকে উদ্ধার করতে চাই”, হাল উত্তেজিত হয়ে জবাব দেয়।
“না স্যার, আপনার সেটা করা উচিত হবে না। আপনার তাকে কিনে নেয়ার চেষ্টা করা উচিত। একমাত্র সেটা করলেই নিজের জীবন না হারিয়েও আপনি জুডিথ নাজেকে পেয়ে যাবেন। সে আপনার সম্পত্তি হয়ে যাবে… যদিও…” সে তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিদ্রুপাত্মক হাসি দিয়ে বলল, “ঐ রমণী কোনদিনও কারও সম্পত্তি হবে না।”
