শত্রুদের গুলি এড়িয়ে দুর্গের দেয়াল পাশ কাটিয়ে দ্রুত যেতে থাকে ডেট। অল্প সময়ের মধ্যেই ডেফট আওতার বাইরে চলে যায় এবং দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করে।
“খুব ভালভাবে কাজ সম্পন্ন করেছ মি. ট্রোম্প”, হাল ট্রোম্পকে উদ্দেশ্য করে বলল। জাঞ্জিবার দ্বীপটাকে পেছনে ফেলে এসেছে ওরা। এখন আমাদেরকে বাউ-এর কাছে পৌঁছে দাও।”
*
উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ঝড় এগিয়ে আসছে। ইন্ডিয়া এবং হিমালয়ের পাদদেশে এ ঝড়ের উৎপত্তি বলে মনে হচ্ছে। যেন ঈশ্বরের ক্রোধের কারণে সবকিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে দিচ্ছে। হাল জাহাজের পশ্চাৎ দিক থেকে আস্তে আস্তে কোয়ার্টার ডেক-এ নেমে এলো, কারণ সেদিকের আকাশের রঙ আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। সেই বদলে যাওয়া রঙ আস্তে আস্তে গাঢ় হতে থাকে। যেন একটা কাল চাদর কেউ আকাশের ওপর বিছিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে আসছে। হাল টেলিস্কোপ ধরার পরপরই সাগর যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে।
“বাউকে আর সামনে এগুতে দেয়া যাবে না, মি. টেইলর,” হাল চিৎকার দিয়ে বলে উঠল। “খুব দেরিতে পাল গোটানোর চেয়ে খুব তাড়াতাড়ি খুঁটিয়ে ফেলা ভাল, তাই না মি. ট্রাম্প?”
ওলন্দাজটা হাল-এর কথায় হেসে জবাব দেয়, “আপনি যদি দেরিতে পাল গোটানোর চেষ্টা করেন তবে দ্বিতীয়বার আর তা করার সুযোগ পাবেন না, ক্যাপ্টেন।”
‘জাহাজটাকে পাল নিয়ে আর বেশিদূর এগুতে দেয়া যাবে না, মি, টেইলর!” হাল বলে উঠে। “জাহাজের সামনের দিকটাকে ঘুরিয়ে ফেল। এই মুহূর্তে যদিও কাজটা করা অনেক কঠিন, কিন্তু আমাদের পারতেই হবে।”
মি. টেইলর এই আদেশ অন্য নাবিকদের মাঝে পৌঁছে দিল। সেই সাথে পালের কিছু অংশ গুটিয়ে ফেলতে বলল যেন জাহাজটার সম্মুখ অংশ সহজে ঘুরিয়ে ফেলা যায়।
হাল আবার জাহাজের পশ্চাৎ ভাগের রেলিং-এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশ ছেয়ে বিরাট আকারের মেঘটাকে এগিয়ে আসতে দেখে ও~একদম কাছ থেকে। দেখতে পায় জন লোভেল বাউ-এর সাথে তাল মিলিয়ে ডেট এর পালও নামানোর চেষ্টা করছে, যেন দুটো জাহাজ একই তালে টিকে থাকতে পারে।
এরপর হাল নিজের জাহাজের কাজ পরিদর্শনে ফিরে গেল। “মি, স্ট্যানলি জাহাজের পাটাতনের ফাঁকাগুলোতে যেন ঠিকমত ঢাকনা বসানো হয়। মাস্টার ডেনিয়েল, সব গান যেন রশি দিয়ে শক্তভাবে বাধা হয়।”
“ঝড়টা আমাদের দিকেই তীব্রভাবে এগিয়ে আসছে। তোমরা সবাই প্রস্তুত হও,” হাল আবারো সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠে।
হাল তার জাহাজের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। একজোড়া অনভিজ্ঞ দৃষ্টির কাছে এটা চরম বিশৃঙ্খল পরিবেশ। কিন্তু যারা সমুদ্র ভ্রমণে অভ্যস্ত তাদের কাছে এটা অত্যন্ত সুন্দর দৃশ্য। নাবিকেরা সবাই যার যার নিজস্ব জায়গা থেকে কাজে নেমে পড়েছে। প্রত্যেকটা মানুষ, হোক সে অ্যামাডোডা উপজাতির কিংবা দক্ষিণ হল্যান্ড থেকে আসা লিমবারগার অথবা ডেবোনশায়ার এর লোক, প্রত্যেকেই জাহাজের প্রয়োজনে নিজেকে কাজে লাগাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে গোল্ডেন বাউ-এর নাবিকেরা যে করেই হোক এই ঝড়ের মোকাবেলা করে ছাড়বে।
“ক্যাপ্টেন, আপনি কী মনে করেন যে আমরা আমাদের কর্মফলের কারণে এই ঝড়ের সম্মুখীন হচ্ছি?” রবটি মুন হালকে বলল। এরপর ডেক-এর দিকে ইশারা করল। “আমরা এখানে যা লুকিয়ে রেখেছি সেসবের কারণেই হয়তো বা আমাদেরকে উপরে ডেকে নেয়ার আয়োজন করা হচ্ছে।”
হাল বুঝতে পারে যে মুন ডেক-এর নিচে লুকিয়ে রাখা ট্রোম্পের সেই কার্গোর কথা বলছে, যেখানে নকল হাড়, ক্রস এর টুকরা, হলি গ্রেইল ইত্যাদি ছিল।
“মি. মুন, আমরা যদি বিচারের সম্মুখীন হই তবে লুকিয়ে রাখা সেসব জিনিসপত্রের জন্য হব না। আমাদের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা চিন্তা-ভাবনা এবং কাজকর্মের জন্য হব।”
মুন ভ্রু কুঁচকে বলল, “আপনি কী তাই মনে করেন ক্যাপ্টেন?”
“আমরা কী এর আগে একবার খ্রিস্টের সত্যিকার কাপকে অবিশ্বাসীদের হাত থেকে উদ্ধার করি নি?” হাল জিজ্ঞেস করে।
‘ ডেফট-এর অদ্ভুত কার্গোগুলো গোল্ডেন বাউ-এ নিয়ে আসার পর থেকেই বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল হাল। কারণ সে জানে নাবিকদের মধ্যে অনেকেরই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব আছে। তারা হয়ত অনেকেই মনে করতে পারে যে এসব মিথ্যে রেপ্লিকা বয়ে বেড়ানোর জন্য তাদেরকে চরম মূল্য দিতে হবে। কথাগুলো মন থেকে ঝেড়ে ফেলে হাল তার সম্পূর্ণ মনোযোগ ঝড়ের দিকে দেয়ার চেষ্টা করল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে মি. মুন, আপনার হাতে কী এখন কোনো কাজ নেই?” হাল জিজ্ঞেস করল। লোকটি ক্ষমা প্রার্থনা করে লংবোটগুলোর বাধন ঠিক আছে কি-না সেটা পরীক্ষা করতে চলে যায়।”
“তাড়াতাড়ি করুন মি, টেইলার।” হাল-এর মনে হতে থাকে তার পেটের নাড়ীগুলো শক্ত হয়ে আসছে। কোনো বাজে কাজে নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই।
হাল ঘুরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল, এরপর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, “আমি তোমার জন্য প্রস্তুত আছি।”
আর ঠিক তখনই তার চোখের দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে প্রধান মাস্তুলের দিকে গেল। সাথে-সাথে চিৎকার দিয়ে উঠল হাল। “নেমে আস অ্যাডি”
“ছেলেটা এখনো ওই জায়গায় উঠে বসে আছে! যুদ্ধের সময় প্রধান মাস্তুলের উপরের জায়গাটা হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা কিন্তু ঝড়ের সময় সেটা স্রেফ আত্মহত্যার সামিল।”
