“তাকে কিনব…?” হাল বিড়বিড় করে বলল। “হ্যা…আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাইছ মি. ট্রোম্প।” প্রস্তাবটা বেশ ভাল। কিন্তু আসল সমস্যাটা থেকেই যাচ্ছে। আমাদেরকে বিশেষ করে আমাকে এবং অ্যাবোলিকে–ধরার জন্য নিশ্চয়ই লোক লাগিয়েছে ওরা? তাই আমরা যখনই জুডিথ-এর দর হাঁকানোর জন্য মুখ খুলব তখনই আমাদেরকে ধরে ফেলা হবে।”
“যদি আপনারা দর হাঁকানোর জন্য না যান? যদি এমন কাউকে পাওয়া যায় যার উপস্থিতি কোনো রকম প্রশ্ন উঠাবে না? এমন কেউ, যাকে জাঞ্জিবারে সবাই চেনে?”
হাল ট্রোম্প-এর দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে তুমি এমন কাউকে চেন যে এই কাজটা করতে পারবে?”
“হ্যাঁ, আমি এমন কাউকে চিনি। আমরা আর বেশি দূরে নই। তার কাছে পৌঁছতে দুই দিন লাগবে। কিন্তু ক্যাপ্টেন, আমি তার ব্যাপারে আপনাকে একটু সতর্ক করে দিতে চাই। আপনি যদি আমাকে শঠ, বদমাশ মনে করেন তবে জেনে রাখবেন সে আমার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ। সে একজন জলদস্যু। লাভের আশায় সে তার মাকেও বিক্রি করে দিতে রাজি আছে। যদি তার সাথে কোনোরকম চালাকি করার চেষ্টা করা হয় তবে বিন্দুমাত্র চিন্তাভাবনা ছাড়া সে আপনার গলা কেটে নেবে।”
ট্রোম্প-এর সতর্কবাণীতে চারদিকে নীরবতা দেখা দেয়। তাহলে আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। অবশেষে হাল কথা বলে উঠল, “আমি যদি তোমার এই লোকের সাথে চুক্তিতে আসি তবে সে কী তা রক্ষা করবে?”
“আপনি যদি এক কথার মানুষ হন তবে সেও তার কথা রাখবে। কিন্তু এটুকু বলে রাখি, ওর সাথে কোনোরকম চালাকি করার চেয়ে নিজের মাথাটা হাঙরের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া উত্তম।”
“তাহলে মি. ট্রাম্প আমি তার সাথে কথা বলতে রাজি আছি। তুমি তাকে খুঁজে বের করার ব্যবস্থা কর।”
*
সতেরোটা গানযুক্ত একিলিস নামের মাঝারি আকারের এক জাহাজের মালিক হচ্ছে ক্যাপ্টেন জেবেদিয়াহ রিভারস। বড় একটা তাল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও। তালগাছের বড় বড় পাতা ছায়া দিয়ে তার চারপাশ ঘিরে রেখেছে, সেই সাথে শুকিয়ে যাওয়া পাতার মড়মড় ও খসখসে আওয়াজ শুষ্ক বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আফ্রিকান আকাশে ক্রুদ্ধ সূর্যের নিচে মহাসাগর যেন চকচক ও জ্বলজ্বল করছে। সাগরের বড় বড় ঢেউগুলো ভেসে এসে উপকূলে বেড়াতে আসা মানুষগুলোর পা ডুবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এদিকে এত চিৎকার চেঁচামেচি জেব রিভারসকে বিরক্ত করে তুলেছে। চার্চ মিটিং-এ জন মেকলি বেশ্যাদের মতো চিৎকার চেঁচামেচি করছে। রিভারস অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে লোকটাকে দেখতে লাগল। এখনও লোকটার মধ্যে বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। সে ক্যাপ্টেন হতে চায়। রিভারস কিছুক্ষণ আগে তা জানতে পেরেছে।
“শেষ কবে আমরা ভাল দাম নিয়েছিলাম, বলতে পারবে?” মেকলি বেশ তর্জন গর্জন করে জেবকে বলল। “আমি শ্রমিকের মতো পাথর টানার জন্য এই নাবিকদলে যোগ দেইনি।” তার এই কথাটা বেশ কিছু লোকের সমর্থন পেল যা দেখে জন মেকলি আরো উৎসাহিত হলো। আমাদের এখন হিসাবটা মিলিয়ে দেখা দরকার। কারণ আমরা এখানে যোগ দেয়ার সময় স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব এই তিনটি জিনিস দেয়া হবে বলে ওয়াদা করা হয়েছিল। আমি এখন সবার কাছে জানতে চাই এই তিনটা ফালতু জিনিস কোথায় লুকায়িত আছে। কারণ আমি এখানে স্বাধীনতা, সাম্য বা ভ্রাতৃত্ব বলে কিছুই পাইনি।
সে সরাসরি রিভারস-এর দিকে তাকাল না। তাকানোর প্রয়োজনও নেই। কারণ সবাই বুঝতে পারল যে সে কোনদিকে চেলেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। “আমরা জানি আমাদের কাজগুলো কীভাবে হয়। শিকার নেই, তো টাকাও নেই। আর বিনা পরিশ্রমে কিন্তু কিছুই পাওয়া যায় না। সে তার পেছনে অসীম নীল সমুদ্রের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “আমাদের শিকারে যেতে হবে। নয়ত সাধারণ শ্রমিকদের মতো আমাদের কষ্ট ভোগ করে মরতে হবে।”
“নির্বোধের মতো পান করে বেশ্যার বাহুডোরে পড়ে থাকাকে কঠোর পরিশ্রম বলা যায় তাহলে, মি মেকলি?” কোয়াটারমাস্টার জর্জ ডাউলিং তার কথার সাথে যোগ করল। ডাউলিং হচ্ছে এখানকার একজন শক্তিশালী যোদ্ধা। সে বুল বাফেলোর মতোই শক্তিশালী।
“আমি অবাক হচ্ছি না, জর্জ ডাউলিং। আমি আমার কাছে থাকা পিতলের শেষ পয়সাটা পর্যন্ত বাজি ধরে বলতে পারি যে আপনি সবসময়ই তার পক্ষ নেবেন।” মেকলি কোয়ার্টারমাস্টার-এর দিকে তুড়ি বাজিয়ে বলে। তবে আপনার মনে রাখা উচিত, আপনি আমাদের প্রতিনিধিত্ব করেন মি. ডাউলিং, তার নয়।
ডাউলিং হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে আক্রমণ ভাগ পরিচালনা করে। এই মুহূর্তে মাথার হ্যাট খুলে টাক মাথায় বাতাস করছিল সে যেন যে করেই হোক এই পরিস্থিতিতে তাকে ঠাণ্ডা থাকতে হবে। এখানে যদি কোনো ভোট হয়, তার ফলাফল যার পক্ষেই আসুক না কেন, আমি সেটা মেনে নেব।”
মেকলি স্বস্তিতে মাথা নাড়ে। কারণ কোয়াটারমাস্টার ডাউলিং অবশেষে তার বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়েছে। জাহাজের ভেতর ডাউলিং অনেকটা সিভিল ম্যাজিস্ট্রেট-এর মতো কাজ করে। তাই তাকে পক্ষে পাওয়া কিংবা অন্তত বিপক্ষে যেতে না দেয়াটা মেকলির জন্য অনেক সুবিধার ব্যাপার।
ক্যাপ্টেন রিভারস-এর বাহিনীতে একশ পাঁচজন নাবিক রয়েছে। সাথে আরও ষাটজন যোগ হয়েছে। এর মধ্যে তার লুণ্ঠনকৃত তিনটা জাহাজের নাবিকও যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে একিলিস-এর বাহিনী শক্তিশালী একটা বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। যেসব জাহাজ ইলহা মেতাভো দ্বীপ-এর অন্তরীপ এ নোঙর করে সেসব জাহাজ খুব সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। সাগরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা জাহাজ থেকে সেগুলোকে দেখা যায় না। দ্বীপের দক্ষিণ দিকের অংশটা অনেকটা লেজের মতো হয়ে আছে যেটা শুধু ভাটার সময় দেখা যায়। এটা থেকে অল্প কিছু দূরে আরেকটা ছোট্ট দ্বীপ রয়েছে ইলহা কুইফুকুই নামে। এই দুটি দ্বীপ সংযুক্ত হয়ে টরকুইস সাগরের ওপর দিয়ে হ্যামক-এর আকারে সংযুক্ত আছে। ক্যাপ্টেন রিভারস মনে করে, তার লাইনের মানুষের জন্য এই জায়গাটার চেয়ে চমৎকার বেইস আর হতেই পারে না।
