গ্রে ভয়ে দ্রুত মাথা নাড়ায় এবং বোঝায় যে সে কথা বলবে। অ্যাবোলি কাটা আঙুলটা মেঝের ওপর রাখল। কনসাল-এর মুখে দেয়া কাপড়টা উঠিয়ে নেয়ার পর কনসাল মুখ হা করে শ্বাস নিতে থাকে। হাল এক জগ ওয়াইন গ্রে-র মুখের সামনে ধরে। গ্রে সেটা দ্রুত পান করতে গিয়ে অর্ধেকটা তার পেটের ওপর ফেলে দেয়।
“বুজার্ড জুডিথকে কোথায় নিয়ে গেছে?” হাল আবারো জিজ্ঞেস করে। গ্রে এবার দ্রুত মাথা নাড়ায় যদিও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে বেশিকিছু হালকে বলতে চাচ্ছে না।
“ক্যাপ্টেন কার্টনি, সত্যটা হল…” গ্রে ওয়াইন-এর জগ-এর দিকে ইঙ্গিত করল। তাই হাল আবারো সেটা গ্রে-এর মুখের সামনে ধরে ওটা পান করার সুযোগ করে দেয়। “সত্যটা হলো…” গ্রে আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, “আপনি আর কখনোই সেই বেয়াদব মেয়েটাকে দেখতে পাবেন না। কারণ সে এখন প্রিন্স জাহান-এর কাছে আছে।” “তাকে জাঞ্জিবার-এর দাস বাজারে বিক্রি করে দেয়া হবে।” সে এবার হাল-এর দিকে তাকাল। তার চেহারায় এক ধরনের চাতুর্য খেলা করছে। আর একবার বিক্রি করে দেয়া হলে তুমি আর কখনোই তাকে খুঁজে পাবে না। কারণ ক্রেতারা ভূমধ্যসাগরের পূর্বদিকের যেকোনো অংশ থেকে আসে-সেটা উত্তর আফ্রিকা এমনকি ইন্ডিয়াও হতে পারে। অর্থাৎ কলকাতা থেকে কনস্ট্যান্টিনোপল-এর যে কোনো অংশ থেকে আসতে পারে তারা। পরবর্তী কার্টনি একজন দাস হয়ে জন্ম নেবে এবং দাস হয়েই মৃত্যুবরণ করবে।
হঠাৎ করেই নড়ে উঠে গ্রে। চেয়ারসহ উঠে দাঁড়িয়ে হাল এবং অ্যাবোলিকে প্রতিহত করার চেষ্টা করল সে। এরপর গলা ফাটিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকে।
ঠিক তখনই হাল একজনের চিৎকার শুনতে পায়।
“ওই!”
কাঠের মেঝেতে একজন মানুষের ধপাস করে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল সে। তাকিয়ে দেখে, স্ট্যানলি মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে এবং আফ্রিকান বালকটি তার হাত থেকে ছুটে চলে যাচ্ছে।
“আমি বদমাসটাকে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে এতটাই পিচ্ছিল যে কোনোভাবেই ধরে রাখা যাচ্ছিল না,” স্ট্যানলি বলল।
আশপাশ থেকে আরও আওয়াজ ভেসে আসছিল।
“আরও অনেকেই এদিকে আসছে,” অ্যাবোলি বলল। তার কান দরজার বাইরের দিকে তাক করা ছিল।
“আমাদের এখন চলে যাওয়া উচিত,” হাল বলে উঠল।
দরজার কাছে গিয়ে থামল সে। অ্যাবোলি আর স্ট্যানলি ওকে পাস কাটিয়ে স্তম্ভশ্রেণির দিকে এগিয়ে গেল।
গ্রে এখনো তার চেয়ারে বাঁধা আছে এবং ছাড়া পাওয়ার জন্য হাঁসফাস করছে।
“জুডিথকে বলে বিশ্বাস রাখতে,” হাল তার দিকে তাকিয়ে বলল। যেভাবেই হোক আমি তাকে খুঁজে বের করব এবং মুক্ত করেই ছাড়ব।
হল ঘর থেকে বের হয়ে গিয়ে বাকি দুজনের পথ অনুসরণ করতে থাকে। প্রথমে তারা কিছু কণ্ঠের চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পায়। ওদের পেছনে কে যেন চিৎকার করে উঠল, এরপর গুলির শব্দ আর কিছু লোকের পদধ্বনি শুনতে পেল ওরা। যেই ঘর দিয়ে তারা এখানে এসেছিল, তার ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল ওরা।
“তাড়াতাড়ি! আমাকে দরজাটা আটকাতে সাহায্য কর,” হাল চিৎকার করে উঠল।
তিনজন মানুষ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রুমে থাকা বড়-সড় ডেস্কটাকে দরজার সামনে নিয়ে এসে দরজাটা আটকে ফেলল। এরপর তারা জানালার দিকে এগিয়ে গেল। জানালা দিয়ে বের হয়ে বেলকনিতে আসার পর জানালা বন্ধ করে দিল ওরা। হাল এখন বিল্ডিং-এর মাঝ দিয়ে ডেনিয়েলকে দেখার চেষ্টা করছে। এতক্ষণের হৈ চৈ ও গণ্ডগোল-এ ডেনিয়েলও সতর্ক হয়ে গিয়েছে। ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে শক্তভাবে রশি ধরে আছে ও, সেই সাথে পা টান টান করে ওজনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। “তুমি প্রথমে, স্ট্যানলি,” হাল আদেশ করল।
কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে স্ট্যানলি রশির অর্ধেকটা পর্যন্ত উঠে গেল।
ঘরের দরজার ওপাশ থেকে ধুমধাম আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, কারণ গ্রের লোকেরা দরজা খোলার চেষ্টা করছে। হঠাৎ জানালার দিকে কাঠের ছোট্ট একটা টুকরা ছিটকে আসলো; “কেউ একজন হয়ত আঘাত করে দরজাটায় ছোট্ট একটা গর্ত বানিয়ে ফেলেছে।”
“এরপর তুমি, অ্যাবোলি”, হাল বলল।
“কিন্তু, গান্ডওয়েন…”
“যাও। এটা আমার আদেশ। আমার হাতে এখনো এটা আছে…”
হাল-একটু ঝুঁকে তার কোমড়ে গুঁজে রাখা পিস্তলটার দিকে ইঙ্গিত করল। বাধ্য হয়ে অ্যাবোলিও মাথা নাড়ায় এবং রশিটা শক্তভাবে ধরে উপরে উঠতে শুরু করে। হাল জানালার দিকে পেছন ফিরে অ্যাবোলির রশি বেয়ে উঠা দেখতে থাকে, একই সাথে তাদের পেছন থেকে আগত লোকগুলোর শব্দ শুনতে থাকে। পিস্তলটা এখনো তার হাতেই ধরা আছে।
অ্যাবোলি যখন প্রায় পৌঁছে গিয়েছে ঠিক তখনই কাঠের কিছু একটা ছিটকে পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল হাল। সেই সাথে পেছন থেকে কয়েকজনের চিৎকার শোনা গেল। হাল এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনে জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জানালাটায় শক্তভাবে একটা ধাক্কা মারল। তার পিস্তল তাক করাই। ছিল। তার লক্ষ্য বস্তু হচ্ছে ডেস্কের ওপর দিয়ে উঠতে চেষ্টা করা লোকটা যে কি-না তার থেকে মাত্র দশ-বার ফিট দূরত্বে আছে এখন। হাল প্রাণপণে চেষ্টা করছে নিজেকে শান্ত রাখার। পিস্তল তাক করে গুলি করে হাল। লোকটা তীব্র চিৎকার দিয়ে ডেস্ক-এর ওপর পড়ে গেল। হাল তার ফাঁকা পিস্তলটা আগের জায়গায় খুঁজে রেখে আরেকটা বের করে আনে। এবার সে দরজার ফাঁকা গর্তটুকু দিয়ে একাধারে গুলি ছুঁড়তে থাকে যেখানে দিয়ে মানুষের শরীরের অংশ দেখা যাচ্ছিল।
