*
তিনজন মানুষ প্রেতাত্মার মতো শহরের একছাদ থেকে অন্যছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাল, বিগ ডেনিয়েল আর উইল স্ট্যানলি নীরবে এবং খালিপায়ে অনেকটা ছায়ার মতো করে কনসাল গ্রে’র ছাদের পেছনের একটা সমতল টেরেসে আস্তে করে লাফ দিয়ে চলে আসে। কাজটা যদিও সহজ নয়। কিছুকিছু ছাদের টাইলস এমনভাবে লাগানো যে তাদের পায়ের নিচে কটকট আওয়াজ করছে। আবার কিছু কিছু এমন হালকাভাবে লাগানো যে তাদের মনে হচ্ছিল এখনই পা পিছলে পড়ে যাবে। জাহাজের ঘূর্ণনের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত চলাফেরার অভিজ্ঞতার ফলে আজকের মতো তারা রক্ষা পেয়ে যায়। যদিও এখনো তাদের আরও একটু সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছতে হবে। জায়গাটা গ্রে’র বাড়ির ছাদ থেকে পাঁচ ফিট উচ্চতায় আছে।
গ্রে’র বাড়ির সামনের দিকটা মেহগনি কাঠ দিয়ে অনেকটা শৈল্পিকভাবে সাজানো ইসলামিক স্তম্ভের ন্যায় বসানো আছে। দেয়ালে জানালা আছে। কিন্তু জানালার নিচে বেলকনি আছে যেগুলোতে আবার রেলিং দেয়া। এগুলো তাদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করবে।
“তুমি কী তাকে দেখতে পাচ্ছ?” ডেনিয়েল ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।
হাল-এর চোখ বাজপাখির মতো অন্ধকারে এদিক সেদিক অ্যাবোলিকে খুঁজছে। রাস্তার অদূরেও কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। রাতের আকাশ মেঘে ঢাকা পড়ে আছে। সেই মেঘ ভেদ করে চাঁদের আলোও খুব একটা প্রবেশ করছেনা।
“এখনো নয়,” হাল বলল, যদিও সে পাহারাদারদের দেখতে পাচ্ছে। দুজন আফ্রিকান লোক সাদা আলখাল্লা পড়ে দরজার দুপাশে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত করছে যে শুধু ব্যবসায়ী আর চাকর-বাকর ছাড়া কেউই যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। পাহরাদারদের হাতে একটা করে ব্লান্ডারবাস দেয়া আছে-এই মুহূর্তের জন্য একদম সঠিক অস্ত্র। কারণ এটা থেকে গুলি চালনা করলে তা এমন বিকট আওয়াজ করে যে সবাইকে জানিয়ে দেয় এখানে কোনো বিপদ হয়েছে।
ছাদের পাশ দিয়ে দুজনলোক একপাশ থেকে অন্যপাশে হাঁটাহাঁটি করছে। হাল এবং পেট যখন লাঞ্চ করতে আসে তখন এখানে কোনো লোক ছিল না। গ্রে সবসময় তার নিজের চামড়া বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করে। সে নিশ্চিত করতে চেয়েছে রাতে যদি কোনো অঘটন ঘটে তবে সে যেন নিরাপদে থাকে।
“ওখানে,” হাল ফিসফিস করে বলল। বিগ ডেনিয়েল এবং স্ট্যানলি হামাগুড়ি দিয়ে তার কাছে চলে আসে।
বিগ ডেনিয়েল হিসস জাতীয় আওয়াজ করে উঠে। কারণ ছাদের বিপরীতে অ্যাবোলিকে দেখা যায়। হাতে ছুরি নিয়ে বাঁকা হয়ে পেছন দিক থেকে পাখির মতো দ্রুত এগিয়ে আসছে একটা গার্ডের দিকে।
হাল তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলেছে। কারণ গার্ড যেকোনো মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং তার ব্লান্ডারবাস থেকে গুলি চালাতে পারে। কিন্তু অ্যাবোলি ততক্ষণে চিতাবাঘের ন্যায় আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে।
সে তার বাম হাত দিয়ে গার্ডটার নাক মুখ চেপে ধরে ডান হাত দিয়ে ছুরিটা কানের নিচে দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে। হাল ছুরিটার অগ্রভাগ গলার অন্যপাশ দিয়ে বের হতে দেখে। অ্যাবোলি ছুরিটা গলা কেটে বের করে ফেলে এবং লোকটি হাঁটু ভেঙে সামনের দিকে পড়ে যায়। অ্যাবোলি আবার দ্রুত চলতে শুরু করেছে। কিন্তু আরেকটা পাহারাদার ছাদের পূর্বদিক থেকে দৌড়ে আসছে। স্ট্যানলি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছে।
“সে এবার ধরা খেয়ে যাবে…” বিগ ডেনিয়েল বিড় বিড় করে বলে।
লোকটি ব্লান্ডারবাস চালাতে উদ্যত হয় কিন্তু তার আগেই অ্যাবোলি দৌড়ে গিয়ে লোকটির বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়-পাজরের হাড়ের নিচ দিয়ে একেবারে হার্ট পর্যন্ত। ছুরিটা বের করে লোকটি চিৎকার করার আগেই তার গলায় বসিয়ে দেয় এক কোপ। অ্যাবোলি ব্লান্ডারবাসটা ধরে লোকটিকে কোনোভাবে নিচে ফেলে দেয়। এরপর সে পাহারাদারটার দেহ পাশ কাটিয়ে ছাদের এক কোণে চলে আসে যেখানে রশি টানানো আছে।
ডেনিয়েল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। “আমি তাকে ভাইয়ের মতো ভালবাসি। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, সে চিকেন পক্স-এর চেয়েও সাংঘাতিক।”
তারা দাঁড়িয়ে রশিটার এক পাশ ধরে রাখে এবং অন্য পাশটা অ্যাবোলি তার কোমড়ে বেঁধে ফেলে। এরপর আস্তে আস্তে রশিটা ধরে উপরে উঠতে থাকে। যদি জানালা দিয়ে কেউ অ্যাবোলির ছায়া দেখে ফেলে তবে সমস্ত পরিকল্পনা বিফলে যাবে এবং তারা কোনোদিন জানতেও পারবে না জুডিথ কোথায় আছে।
“ঈশ্বর তাকে রক্ষা করুন, বিগ ডেনিয়েল বলল।
“কোনো কিছুর সাথে রশিটা বাঁধতে পারলে বেশি সুবিধা হত,” স্ট্যানলি বলে। হাল বুঝল যে তার বন্ধু ঠিকই বলেছে। সেখানে শুধু একটা জানালা এবং জানালার নিচে একটা ছোট্ট জায়গা রয়েছে। জানালা দিয়ে হলুদ রঙের আলোক রশ্মি বের হয়ে রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু যখনই কথাটা বলা শেষ হয় তখনই অ্যাবোলি প্রায় দশ ফিট নিচে ব্যালকনির এক কোণায় লাফ দেয়। রশিটা সে তার কোমড় থেকে খুলে ফেলে এবং কাঠের রেলিং-এ বেঁধে নেয়। তার পেছনের জানালা দিয়ে কোনো আলো আসছে না।
এখন আমাদের পালা। বিগ ডেনিয়েল নিজের রশির অংশটা কোমড়ে বাধতে বাঁধতে বলে। রশিটা টান টান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সে পেছাতে থাকে। ছাদের ওপর শক্ত কোনো কিছু নেই যেটার সাথে রশিটা আটকে রাখা যায়। তাই বিগ ডেনিয়েল তার সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেই সেই দায়িত্ব নিয়ে নিলো।
