এরপর যখন বুজার্ডের তলোয়ার এর মাথা তার গলায় ঠেকানো হয় তখন সে হাত জোড় করে মাফ চাইতে থাকে।
বুজার্ড বার-এর ওপর দাঁড়িয়ে তার পান করার পাত্রটা হাতে নিয়ে বলতে থাকে, “এটাতে মদ পূর্ণ করে দাও। আর যদি তোমাদের টাকার প্রয়োজন পড়ে তবে প্রিন্স জাহানের কাছে গিয়ে চাও।” যে দাসীটি সবাইকে পরিবেশন করছিল তার মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। জাঞ্জিবার-এর সবার মতো সেও জানে যে প্রিন্স জাহানের কাছে একটা জিন আছে যেটা দেখতে অর্ধেক মানব এবং অর্ধেক পাখির মতো। মেয়েটি সেই খুন হওয়া ছোট ছেলেটার কথাও শুনেছে যে কি-না দানবটার মুখে ময়লা ছুঁড়ে দিয়েছিল। এখন সেই দানব যদি মদ চায় তাহলে তর্ক করতে যাওয়ার কোনো অর্থই হয় না। সে জানে তার মালিকও এটা নিয়ে কোনো কথা বলবে না।
বুজার্ডের সাথে আসা দাসটা মদের পাত্র পূর্ণ করে তার মনিবের সাথে সাথে গিয়ে একটা ফাঁকা টেবিলে বসে। পূর্বের শেখানো পদ্ধতিতে সে বুজার্ডের মুখে নল এগিয়ে দেয়। বুজার্ডও মদের পাত্র খালি করতে থাকে।
ভেতরে কোনো এক খাবারের টেবিল থেকে চাপা হাসির আওয়াজ শোনা যায়। বুজার্ড অগ্নিমূর্তি ধারণ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকে। তার নাকটা জাহাজের পালদণ্ডের ন্যায় তার সামনে ঘুরতে থাকে। তার শকুনের ন্যায় দৃষ্টি একজনের পর একজনের ওপর পড়তে থাকে। সবরকম। হাসির আওয়াজ, শব্দ থেমে যায়। তখন বুজার্ড-এর মাথা ঘুরানোও থেমে যায়। সে একটা নির্দিষ্ট টেবিলের দিকে দৃষ্টিপাত করে। বুজার্ড তার শরীর ঘুরিয়ে সেইদিকে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। বুজার্ড আস্তে আস্তে সেই টেবিলের দিকে অগ্রসর হয়।
বুজার্ড যে টেবিলের ওপর দৃষ্টি ফেলেছিল সেটার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছল। একজন মানুষ বসে আছে সেই টেবিলে। লোকটির সামনে একটি মদের বোতল আর একটি পানির পাত্র রাখা আছে। বুজার্ডের আগমনেও লোকটিকে ভীত বলে মনে হচ্ছে না। সে চুপচাপ বসে থেকে বুজার্ডের মুখোশের ওপর আঁকা চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এরপর সে বুজার্ডকে বলে, “আমি তোমাকে দেখে পিছিয়ে পড়ব না। যদি তুমি কাউকে ভয় দেখাতে চাও তাহলে অন্য কাউকে খুঁজে বের কর।”
এরপর বুজার্ড যা করে সেটা উপস্থিত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় এবং একটা চেয়ার টেনে সেটাতে বসে পড়ে। এরপর লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, “ক্যাপ্টেন হামিশ বেনবুরি, আমি বেঁচে আছি! তোমার কেমন চলছে?”
কামরার ভেতরকার নীরবতা আস্তে আস্তে গম্ভীর হতে থাকে। সবার মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকলেও ক্যাপ্টেন বেনবুরি যেমন ছিল তেমনই চুপচাপ বসে থাকে। তারপর সে কয়েকমুহূর্ত মেঝের দিকে তাকিয়ে পা নড়াচড়া করতে থাকে। এরপর সোজা বুজার্ডের দিকে তাকিয়ে বলে, “গুড ডে টু ইউ কোকরান।” আমার মা বলে, “তুমি অনেক আগেই মারা গেছ। কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে মিথ্যে।” এরপর সে যথেষ্ট পরিমাণ মদ পান করে এবং বলতে থাকে, “আমি ভেবেছিলাম, তুমি আগে দেখতে যেমন ছিলে, তোমাকে তার চেয়ে বেশি কুৎসিৎ বানানো সম্ভব নয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, আমার ধারণা ভুল।”
বুজার্ড উচ্চস্বরে হাসতে থাকে। আর ঠিক তখনি, সে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়; তার হাসি সামাল দিতে ফুসফুস যথেষ্ট পরিমাণ বাতাস নিতে পারছে না। এর কয়েক সেকেন্ড পরেই তার তীব্র কাশি শুরু হয়। সেই কাশি সামাল দিতে সে তীব্র হতাশা আর যন্ত্রণায় টেবিলের ওপর হাতের মুঠি দিয়ে চাপড় মারতে থাকে। এরপর সে ঘুরে তার সাথে আসা চাকরদের দিকে তাকায় যারা এখনো টেবিলে বসে আছে। বুজার্ড-এর ভয়ার্ত দৃষ্টি দেখে ওরা বুঝতে পারে বুজার্ড রাম-এর বোতল টেবিলে ফেলে এসেছে। তারা দ্রুত সেটা নিয়ে দৌড়ে আসে এবং বুজার্ডের মুখে নল ঢুকিয়ে দেয়।
সমস্ত ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যায় যে সবার মধ্যে ভয়ের রেশ কাটতে একটু সময় লাগে। সবাই আগের কথাবার্তা, কাজকর্মে ফিরতে শুরু করলেও থমথমে ভাব বিরাজ করতে থাকে চারপাশে। আস্তে আস্তে সবাই স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যায়। মোরগ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বুজার্ড এবং ক্যাপ্টেন বেনবুরি শান্তিতে তাদের গল্প শুরু করে।
পরবর্তী কয়েক মিনিট ধরে বুজার্ড তার গত কয়েকমাসের গল্প বলে যায়। কীভাবে সে বেঁচে যায়, কীভাবে উদ্ধার পায়, কীভাবে জাহানের সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত হয়। কীভাবে সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে পূর্বের শক্তি, যুদ্ধ করার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে, এমনকি জাহানের হারেমের গল্পও বলে সে। জাহানের উপপত্নীরা কীভাবে আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল সেটাও বলে।
“তাই নাকি?” বেনবুরি বলে উঠল। আমি সবসময় জানতাম অন্য কোনো পুরুষের জাহানের হারেমে প্রবেশের অনুমতি নেই। শুধু সুলতান নিজে এবং কোনো নপুংসক হিজড়া ব্যতীত। আমি হয়ত ভুল জানতাম। তুমি নিশ্চয়ই নপুংসক নও, কোকরান?”
বুজার্ড ব্যাপারটাকে অস্বীকার করে এবং বলে যে এটা তাকে দেয়া এক বিশেষ সুযোগ। “হ্যাঁ, তা হতে পারে,” বেনবুরি বলে। যদিও সে বুজার্ডের মুখোশ এবং গলায় লাগানো রিং দেখতে থাকে। পেছনে দাঁড়ানো গার্ডরা কীরূপে বুজার্ডের দিকে তাকাচ্ছে সেটাও সে দেখতে পায়।
