“তুমি আশা করো না যে, আমি তোমার দেয়া ডিনার উপভোগ করব, প্রিন্স জাহান। কিন্তু হ্যাঁ আমি আলোচনায় অংশ নিব।”
“আপনি কত মহানুভব, ম্যাডাম। আলোচনা শেষে আপনাকে আপনার কোয়ার্টার-এ নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আপনি আগামী তিন সপ্তাহ বন্দি থাকবেন। কিন্তু আপনি আপনার পদমর্যাদার জন্য আলাদা কোনো সুবিধা পাবেন না। দুঃখের বিষয় যে আমি আপনাকে দাসদের বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য। তবে ভয় নেই। আপনাকে অন্য কারো কাছে বিক্রি করার কোনোরকম ইচ্ছে আমার নেই।”
“তাহলে কেন আমাকে বিক্রি করতে নিয়ে যাবেন? শুধু আমাকে অপমান আর হেয় করার উদ্দেশ্যে?”
“ব্যাপারটা ভেবে দেখুন। জেনারেল নাজেতকে অপমান করা অনেক বড় একটা ব্যাপার”, প্রিন্স বলতে শুরু করে। “এই খবরটা জাঞ্জিবার-এর সব ব্যবসায়ীরা লুফে নিবে। শুধু তা-ই নয়, এই খবরটা যখন আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে, যখন আপনার জনগণের কাছে পৌঁছবে তখন তাদের মনে কী পরিমাণ আঘাত হানবে এটা, বুঝতে পারছেন? কিন্তু আমার কাছে এটার সত্যিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যরকম। আপনাকে উক্ত স্থানে বিক্রয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া মানে হচ্ছে একটা টোপ ফেলা…”
“স্যার হেনরী কার্টনিকে নিয়ে আসার জন্য। যদি সে এখনো জীবিত থাকে।”
প্রিন্স-এর চেহারা চকচক করে উঠে, “একদম ঠিক। আহ! আপনার মতো বুদ্ধিমান রমণীর সাথে কথা বলা কতই না আনন্দের যে কি-না সবকিছু না বলতেই বুঝতে পারে। এরপর আমি দুজনকেই ক্রীতদাস বানিয়ে ছাড়ব। এবং তারপর কী করব সেটা অবশ্য এখনো ঠিক করিনি। কিন্তু যদি আমি হেনরি কার্টনিকে পাই তাহলে আপনার জন্য হিসেবটা সহজ হয়ে যাবে। আপনি নিজেকে আমার কাছে সপে দেবেন নতুবা আমি তাকে হত্যা করব।”
“না…, আমি কখনোই…।”
“নিজেকে খুন করবেন? কিন্তু আপনি যদি নিজেকে হত্যা করেন তাহলে আমিও তাকে হত্যা করব। কিন্তু আপনি যদি নিজেকে একরাতের জন্য আমার কাছে সঁপে দেন তাহলে সে শুধু বেঁচেই থাকবে না আপনাদের পুনরায় একত্র হওয়ার একটা সুযোগও মিলবে।”
“কী ধরনের সুযোগ দেয়া হবে?”
“সহজ হিসেব। স্যার হেনরি কার্টনিকে আমার সৃষ্ট এই দানবের সাথে লড়তে হবে। প্রিন্স অলস ভঙ্গিতে একটা হাত বুজার্ডের দিকে দেখিয়ে বলে। এরা দুই চিরশত্রু একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তলোয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। আপনি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবেন কে বিজয়ী হয়। আর যে বিজয়ী হবে, সে-ই পুরস্কার হিসেবে আপনাকে গ্রহণ করবে।”
চামড়ার মুখোশের ভেতরে গলা পরিষ্কার করার আওয়াজ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রিন্স লোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠে, “বুজার্ড, কোনো কথা বলবে না। তুমি জান তোমাকে কী শর্তে এখানে আনা হয়েছে। যদি তুমি কোনো কথা বল তবে তুমি নিজেই তোমার জীবন বিপন্ন করবে। তুমি শুধু তাকিয়ে দেখ তোমার জন্য কী পুরস্কার অপেক্ষা করছে। যাকে তুমি সবচেয়ে ঘৃণা করো তার মৃত্যু এবং সে যে নারীকে ভালবাসে তার শরীর, দুটোই পাবে তুমি।”
“এই দানবটা কোনোদিনই আমার শরীর পাবে না।”
“হাঁ হাঁ, তার আগেই আপনি মৃত্যু বেছে নিবেন। সেটা আপনি অনেকবার বলেছেন।” প্রিন্স অত্যন্ত বিরক্তির স্বরে বলে উঠে। “কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না। একজন মা কী তার নিজেকে এবং সন্তানকে হত্যা করতে পারে? একজন মা তার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য যে কোনো কিছু করতে পারে…যে কোনো কিছু।” “আপনি কী সেটার ব্যতিক্রম?” “আর বুজার্ড তুমি আজকে অনেক ভাল কাজ করেছে। জেনারেল নাজেতকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে। সেটার বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু দিতে চাই। আজ রাতের জন্য তুমি শহরে বের হয়ে ফুর্তি করার মতো জায়গা খুঁজে বের কর। পান কর, পছন্দের নারী বেছে নাও। আজ রাতের জন্য প্রমাণ করে দাও যে তুমি এখনো একজন পুরুষই আছে।”
৫. জাঞ্জিবার দ্বীপ
জাঞ্জিবার যদি একটি দ্বীপ হয় এবং এটার উপকূলে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ বসবাস করে তবে ট্রেস ম্যাকাকোস অথবা থ্রি মাংকিস হচ্ছে– সেই জায়গা যেখানে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের বাসস্থান। এটা হচ্ছে শহরের সবচেয়ে পুরনো, নোংরা অংশের মধ্যে থাকা একটা জায়গা যেটা একটা সরু গলির মধ্য দিয়ে শহরের এক পাশ থেকে অপর পাশে বয়ে গিয়েছে। এখানে আগে দেদারসে মদ বিক্রি করা হতো। ওমানি কর্তৃপক্ষ মদ হারাম বলে তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও এখনো কিছু অবিশ্বাসী অধার্মিক ব্যক্তিরা হরহামেশাই মদ বিক্রি করে এখানে অনেক ব্যক্তিই টেভার্ন এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে। তারা অনেক বড় অংকের টাকাও প্রদান করে। অনেক জাঞ্জিবারবাসির মতো তারা এখানে কাঁচা স্পিরিটকে রাম হিসেবে কিংবা বিশ্রী গন্ধ যুক্ত ভিনেগারকে ওয়াইন হিসেবে খাওয়ার জন্য নয়, বরং মোরগযুদ্ধ কিংবা ডগফাইট উপভোগ করার জন্য।
টেভার্নস-এর প্রধান অভ্যর্থনা কক্ষে বিভিন্ন ধরনের লোকের সমাগম হয়। জলদস্যু, চোরাকারবারী, দাস-ব্যবসায়ী বণিক, বিভিন্ন পদমর্যাদার জাহাজের লোক। যাদের স্বাগত জানানোর জন্য রয়েছে বিভিন্ন রকমের পোশাকে সুসজ্জিত নারী। খরিদদারদের আকর্ষণ করার জন্য রমণীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন রঙ-এর পাউডারের গন্ধে জায়গাটার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এরকম পরিবেশে বুজার্ড যখন তার একজন ব্যক্তিগত দাস এবং দুজন পাহারাদার নিয়ে হাজির হয়, তখন সেখানে হৈ চৈ পড়ে যায়। পাহারাদার দুজনের কাজ বুজার্ডকে শুধু রক্ষা করাই নয়, জাহানের হাত থেকে বুজার্ড যেন পালিয়ে যেতে না পারে সেদিক লক্ষ রাখা। একজন মাতাল লোক বুজার্ডকে দেখে চিৎকার করে উঠে, “সরি, বার্ডম্যান। তোমার খাওয়ার জন্য এখানে কোনো পোকামাকড় নেই।”
