“আসুন…দেখুন, আপনাকে কতটা সুন্দর লাগছে, প্রথম দাস মেয়েটি জুডিথকে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো একটা লম্বা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে কথাটা বলল। জুডিথ নিজের প্রতিবিম্ব দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হাল-এর জন্য নিজেকে নানান সময় নানানরকমভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু তার আজকের রূপটা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার নিজেকে অনেকটা নর্তকী কিংবা হারেমের মেয়েদের মতো মনে হচ্ছে। তবে এই সাজেও সে মনে মনে রোমাঞ্চিত বোধ করত যদি এটা হাল-এর জন্য হতো। কিন্তু কোনো অচেনা অদ্ভুত মানুষের জন্য নিজেকে এইভাবে সাজানো অবস্থায় দেখে মনে মনে বিপদের গন্ধটা আঁচ করে ফেলল জুডিথ। ভয় এবং আতঙ্ক ইতিমধ্যে তাকে গ্রাস করা শুরু করে দিয়েছে।
তার চিন্তায় ছেদ পড়ল-হিজড়াটা আবারও তার ঘরে প্রবেশ করেছে। লোকটি তাকে ভালভাবে দেখে ঠোঁট ভাঁজ করে শুধু একটাই শব্দ করে : “হাহ।” যেন তার এই রূপ দেখে লোকটি খুব অবাক হয়েছে। এরপর বলল, “আসুন আমার সাথে।”
তাকে পুনরায় একটা সুবৃহৎ কক্ষের মাঝ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। কক্ষের ভেতর থাকা অন্যান্য রমণী অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাচ্ছে। হিজড়া লোকটি ওই মেয়েগুলোকে হাত দিয়ে সরিয়ে জুডিথকে জায়গা করে দেয়ার চেষ্টা করছে। এরপর তাকে নিয়ে একটা লম্বা করিডোর পার হয়ে একটা দরজার সামনে আসলো সে। তারা ভেতরে ঢোকার পর দরজাটা আবারও বন্ধ করে দেয়া হলো।
জুডিথ দেখতে পায় তাকে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু সুসজ্জিত কক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে অন্যান্য উপপত্নীদের তাদের মনিবকে আনন্দ দেয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কক্ষটির প্রতিটা জায়গা অমূল্য সোনা, মার্বেল পাথর, অনিক্স, গাঢ় কালো রঙের অবসিডিয়ান এবং চকচকে আয়নায় সাজানো রয়েছে। যখন সে একটা করে আয়নার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন সে দেখতে পাচ্ছিল যে চকচকে পাথরের আলোক রশ্মিগুচ্ছ আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে। আয়নার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে যে পোশাক পরানো হয়েছে। সেটার পাথরগুলোও চকচক করে উঠছিল।
হিজড়া লোকটি সোনালি রঙের ডিভান-এ বসে থাকা একটা লোকের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে বলল, “মহামান্য, প্রিন্স, এই সেই রমণী যাকে আজ সন্ধ্যায় নিয়ে আসা হয়েছে। আশা করি সে আপনার মনের আশা মিটিয়ে দেবে।”
এটা বলার পর লোকটি জুডিথকে তার মনিবের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে সরে দাঁড়ায়। তার সামনে বসা লোকটি যাকে দাসী মেয়েরা প্রিন্স বলে সম্বোধন করেছিল সে নানারকমের অলংকার খচিত ঝাকজমকপূর্ণ পোশাক পরে আছে। উজ্জ্বল গোলাপি রঙের কোট পরে আছে লোকটা, যেটার সাথে মিলিয়ে ট্রাউজার পরেছে সে। তার পাগড়ির সামনের দিকে বেশ বড় আকারের ডায়মন্ড বসানো আছে। ডায়মন্ডটার পাশ দিয়ে আবার ছোট ছোট পালক আটকানো আছে।
জুডিথ লক্ষ করে মধ্য ত্রিশে গিয়েও লোকটিকে বেশ হ্যান্ডসামই বলা যায়। পুরুষ হিসেবে তাকে বেশ আকর্ষণীয় বলতে হয়।
একজন রমণী ডিভানে হেলান দিয়ে লোকটির পাশে বসে ছিল। রমণীটি তার সমস্ত নির্লজ্জতা বিসর্জন দিয়ে লোকটির কানে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াছিল সে, সেই সাথে নিজের আঙুলগুলো লোকটির ঊরুর ওপর দিয়ে টেনে আনছিল ক্রমাগত। জুডিথ-এর মনে হলো যে মেয়েটি নিজের কাজকে বেশ উপভোগই করছে।
জুডিথ ধারণা করেছিল সেখানে হয়ত আরও বডিগার্ড আছে। ঘরের একপাশ থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। কিন্তু সেখানে শুধু একজন মানুষই ছিল-বুজার্ড। সে ডিভান-এর পাশে দাঁড়িয়েছিল। তার একমাত্র হাতটি শরীরের পাশে ঝুলানো। তার নড়াচড়ার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে তা হল : এদিক সেদিক পাখির মতো মাথা দুলানো।
‘মাই ডিয়ার জেনারেল নাজেত।” প্রিন্স লোকটি বলে উঠে। জুডিথ আন্দাজ করল যে এটিই সেই এলিনা নামের মেয়েটি যার নাম সেই প্রথম দাসী মেয়েটি উল্লেখ করেছিল। মেয়েটা এখন তার কাজ বাদ দিয়ে ভ্রু কুঁচকে জুডিথ-এর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিন্স লোকটি আবার বলতে শুরু করে। “গত দুই বছর ধরে যদিও আমাদের ভাগ্য একই সূত্রে বাঁধা ছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে, এটাই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। আমি মহারাজা সাদিক খান জাহান। আপনার পুরনো শত্রু, ওমানী আরব নেতা সুলতান আহমেদ এল গ্রাং আমাকে সেভাবেই শ্রদ্ধা করতো যেভাবে আপনি সেই বাচ্চাটিকে করতেন যে কি-না নিজেকে ইথিওপিয়ার রাজা হিসেবে দাবি করে।” প্রিন্স লোকটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “আপনি কী জানেন যে আপনার মতো সুন্দরী রমণী নিজেকে যুদ্ধক্ষেত্রে স্রেফ অপচয় করছে?”
“না।” জুডিথ বলল, “আমার মতো অভিজ্ঞ যোদ্ধা নিজেকে এই হারেমখানাতেই বরং অপচয় করছে।”
“প্রিয়তম, আমি কিছু বুঝতে পারছি না, এলিনা নামের মেয়েটি সোজা হয়ে বসে বলে উঠল। তুমি কেন এই নারীটিকে জেনারেল বলছ? আর কেনই বা বলছো যে সে একজন যোদ্ধা।”
“কারণ সে শুধু সৌন্দর্যে তোমার সমকক্ষই নয়, সে এল গ্রং-এর সমকক্ষ যযাদ্ধাও বটে। তুমি যেভাবে গার্ডদের আদেশ কর তারচেয়ে কঠিনভাবে সে নিজের সৈন্যদের আদেশ করে। তুমি এখন যাও। আমি এই জেনারেল-এর সাথে কথা বলব। আবার যখন প্রয়োজন হবে তখন আবার তোমাকে ডাকব।”
