হাল রাগে ফেটে পড়ছিল। কিন্তু সে জানে অ্যাবোলি ঠিক বলেছে। এভাবে তাদের গ্রে’র বাড়ির দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত নয়। গ্রে হচ্ছে জাঞ্জিবার-এর একজন শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি। হাল যদি স্থানীয় ওমানী লোকজনের সাথে যুদ্ধ করতে যায় তাহলে গোল্ডেন বাউকে দুর্গের দেয়ালে রাখা বন্দুকের গুলির সম্মুখীন হতে হবে।
“তাহলে তুমি কী প্রস্তাব করছ অ্যাবোলি?” সে তার কোমড়ের বেল্ট বেঁধে তার মধ্যে মসির দেয়া পিস্তল দুটি আটকাতে আটকাতে বলে।
অ্যাবোলি ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমরা কত লোকজন নিয়ে যেতে পারব সেটা এখানে কথা নয়, কথা হচ্ছে, আমরা কত কম লোজন নিয়ে যেতে পারব।”
“তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ সম্মুখ যুদ্ধের চেয়ে নীরবে কাজ করলে আমাদের বেশি সুবিধা হবে?”
“ঠিক তাই”! অ্যাবোলি ঠোঁটজোড়া শক্ত করে জবাব দিল।
তারা দুজন আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে। এরপর তারা মসিকে সাথে নিয়ে জাহাজের সেখানে আসে যেখানে লম্বা নৌকোগুলো লাগানো রয়েছে। সে মসিকে নৌকোর পেছনদিকে চুপচাপ অপেক্ষা করতে বলে। এরপর হাল এবং অ্যাবোলি বাউ-এর বাকি লোকদের বুঝিয়ে বলে যে তারা কী করতে যাচ্ছে। শহরের রাস্তা-ঘাট ফাঁকা হয়ে যাওয়া এবং মানুষজন ঘুমিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে। এরপর হাল আর অ্যাবোলি বাউ-এর আরও দুজন শক্তিশালী যোদ্ধা বিগ ডেনিয়েল ফিশার এবং উইল স্ট্যানলিকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে।
*
জুডিথকে যে বাহনে করে জাঞ্জিবার-এর রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেটার জানালাগুলো পর্যন্ত বন্ধ ছিল। তাই কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে জুডিথ-এর কোনো ধারণাই নেই। একসময় সে শুনতে পায় দরজা খোলার আদেশ দেয়া হচ্ছে। এরপর বড় একটা দরজা খুলে যায়। ঘোড়ার খুর এবং চাকার শব্দে বোঝা যায় বাহনটা একটা বাঁকানো আর্চওয়ের নিচ দিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় আরেকটা দরজা পার হয়ে থেমে গিয়েছে।
বাহনটার দরজা খোলার পর মধ্যবয়স্ক একজন লোক দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। তার সমস্ত দাড়ি এবং মাথার চুল পরিষ্কার করে ফেলে দেয়া। অনেকটা মেয়েলি কণ্ঠে সে বলে উঠে, “আমার সাথে আসুন। মহামান্য রাজা আপনার সাথে দেখা করতে সম্মতি জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি আপনাকে ঠিক এই অবস্থায় দেখতে চান না।”
লোকটা নিশ্চয়ই হিজড়া! ওর কণ্ঠ শুনে মনে মনে চিন্তা করল জুডিথ। এরপর লোকটি তাকে একটি সুসজ্জিত কামরায় নিয়ে যায়। কামরাটির মেঝেতে মার্বেল পাথরের মোজাইক করা ছিল যেগুলো নানান রকমভাবে নকশা করা ছিল। গোলাপ এবং অ্যাম্বার-এর সুগন্ধিতে ঘরটা পরিপূর্ণ হয়ে আছে। মোমবাতির সোনালি আলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। অর্ধনগ্ন নারীরা অলস ভঙ্গিতে ডিভান-এর ওপর হেলান দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। জুডিথ এক চমকেই বুঝতে পারে যে তাকে একটা হারেম-এ নিয়ে আসা হয়েছে।
লোকটি তাকে কামরার মাঝখানে নিয়ে আসে যেখানে নরম পানির ঝর্নাধারা সমৃদ্ধ একটি গোসলখানা রয়েছে, যেটাতে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। দুজন দাসী তাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। “মহামান্য রাজার জন্য একে প্রস্তুত কর,” হিজড়া লোকটি দাসীদের আদেশ করল।
“আপনার গোসলের সবকিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছে, মাই লেডি।” দাসী মেয়েদুটির একজন বলে উঠে। “আমি কী আপনার গাউনটি নিতে পারি?”
জুডিথ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে উত্তর দেয়, “না, তোমরা পার না।” কিন্তু যাদের কিছু করার ক্ষমতা নেই তাদেরকে বাধা দেয়া বা তাদের সাথে যুদ্ধ করাটা বৃথা। তাকে যুদ্ধ করতে হবে সেই লোকটির সাথে যে এদেরকে শাসন করছে। আর সেই লোকটির কাছাকাছি পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এদের কথা মেনে নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করা। তাই জুডিথ ওদের কথা মেনে নেয়। তাকে গোসল করিয়ে শুকিয়ে শরীরে সুগন্ধি তেল মাখানো হয়। দাসী মেয়েদের একজন তাকে বসতে বলে। তার চোখে স্মোকি কাজল লাগানো হয়। ঠোঁটে লাল রঙ্গা কিছু একটা লাগানো হয়। চুলগুলো সুন্দরভাবে বেঁধে ওখানে নানানরকম মুক্তার গহনা বসানো হয়। মিতসিওয়ায় হাল-এর সাথে দেখা হওয়ার দিন যেগুলো পরেছিল, মুক্তার গহনাগুলো দেখতে অনেকটা সেরকম। দাসীদের একজন তার কানে দুল পরিয়ে দেয়। এরপর তাকে কাপড় পরানোর জন্য উঠে দাঁড়াতে বলে।
“ওহ্, মাই লেডি আপনি দেখতে অনেক সুন্দর।” জুডিথ যখন উঠে দাঁড়ায় তখন দাসীদের একজন বলে উঠে। “মহামান্য প্রিন্স আপনাকে পেয়ে অনেক অনেক তৃপ্ত হবেন।”
“এলিনা হিংসায় মরে যাবে”, অন্য মেয়েটি টিপ্পনী কেটে বলে উঠে।
“আপনি তার নতুন প্রিয়তমা হতে যাচ্ছেন।”
তাকে কাপড় পরানো হয়। যদি এটাকে কাপড় পরানো বলে তবেই। তাকে ছোট হাতার একটা ব্লাউজ পরানো হয় যেটা জাঞ্জিবার-এর রাস্তায় ইন্ডিয়ান নারীদের শাড়ির নিচে পরতে দেখা যায়। ব্লাউজটা সুতা অথবা সিল্কের তৈরি এবং যেটার ওপর নানান রকম ছোট ছোট পাথর দিয়ে সোনালি রঙের সুতা দিয়ে নকশা করা রয়েছে। এটা কোনোরকমভাবে জুডিথ-এর বুকের অংশটা ঢেকে রেখেছে। এরপর তাকে কোনো শাড়ি পরানো হয় না। তার বদলে তাকে একজোড়া প্যানট্যালুন পরানো হয় যেটা তার কোমড় থেকে গোড়ালি পর্যন্ত নেমে এসেছে। এটাতেও নানাধরনের চকচকে নকশা করা রয়েছে। সবশেষে তাকে সোনালি সুতা দিয়ে কাজ করা একজোড়া তুর্কিস পাদুকা পরানো হয়।
