আর তারপর এখন পেট হালকে অন্ধকার জায়গায় নিয়ে এসেছে। কোনো ভাল লোকই আলোকিত স্থান ছেড়ে অন্ধকারকে বেছে নেয় না।
হঠাৎ হাল-এর খেয়াল হলো যে তার ডান হাত এবং তলোয়ার-এর মাঝে অ্যাবালির দেহ আছে। সে বুঝতে পারল যে পেট কতটা সতর্কতার সাথে তার অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, সেই সাথে হাত মুক্ত রেখেছে। কিন্তু পেট-এর হাতে কোনো তলোয়ার নেই। নিশ্চয়ই তার কাছে কোনো লুকানো অস্ত্র আছে।
যতই তারা গলির ভেতর দিয়ে এগুতে লাগল অন্ধকার ততই বাড়ছিল। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা, হাল মনে মনে ভাবল। আর যদি আমি দেখতে না পাই…
হঠাৎ তাদের উপরের দিকে কোথাও একটা শাটার খোলার শব্দ হলো। লাইটের আলোতে দেখা গেল, জানালা দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা ফেলা হচ্ছে। হাল সাথে-সাথে পেট-এর দিকে তাকাল। তীব্র আলোর ঝলকানিতে পেট-এর চোখ দেখতে পেল সে।
আর এরপরেই…সে দেখল।
সাথে-সাথেই প্রতিক্রিয়া দেখাল হাল-একজন প্রকৃত বুদ্ধিমান যোদ্ধার মতই। সে অ্যাবোলিকে ধাক্কা দিয়ে পেটের দিকে ঠেলে দিল। ধাক্কা খেয়ে পেট ডানে সরে গেল, ফলে ওর আঘাতটাও হাল-এর শরীর স্পর্শ করতে পারেনি। এরপর হাল অ্যাবোলির গোড়ালিতে এমনভাবে আঘাত করল যেন অ্যাবোলি হোঁচট খেয়ে পেটকে নিয়ে নিচে পড়ে যায়।
ভয় পেয়ে গেল হাল। সে হয়ত তার প্রিয় বন্ধুকে শত্রুর তলোয়ার-এর ওপরেই নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু তখনই সে অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে পায় যে পেট-এর হাত অ্যাবোলির শরীরের নিচে চাপা পড়ে আছে। ওর তলোয়ার এখন তার আওতার বাইরে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এরপর সে পেট-এর হাতে আঘাত করে ওকে একেবারে পঙ্গু করে দিল। তখনই হাল পরিষ্কার উচ্চারণে সেই বন্য ভাষা শুনতে পায়, “ওকে হত্যা কর গান্ডওয়েন।”
পেট একেবারেই প্রতিরোধহীন হয়ে পড়েছে। এরকম মুহূর্তে প্রতিপক্ষকে সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে অথবা ক্ষমা করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু উইলিয়াম পেট এ দুটোর কোনোটাই পাওয়ার যোগ্য না। আর তাই, হাল একটানে তার নেপচুন তলোয়ারটা খাপ থেকে বের করে আনলো।
না দেখেও পেট-এর অভিব্যক্তিহীন চোখগুলো অনুভব করতে পারছিল হাল। সেই চোখে ভয়ের কোনো ছিটে ফোঁটাও ছিল না। শুধু ছিল অনুভূতিহীন ঘৃণ্য দৃষ্টি। “তুমি নরকে যাবে, হেনরি কার্টনি! সেই সাথে তোমার বংশধররাও!”
হাল দুইহাতে তলোয়ারটা উঁচিয়ে ধরে সোজা নিচের দিকে তাক করে। এরপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিচের দিকে আঘাত করে পেট-এর গলায় ঢুকিয়ে দেয়। গলার পেছনদিকে দুই ভার্টিব্রার মধ্যবর্তী জয়েন্ট তলোয়ার-এর অগ্রভাগ দিয়ে আলাদা করে দিল সে।
হাল চারদিকে তাকায়। গলিটা মরুভূমির মতোই নীরব অন্ধকার। সকালের সূর্য উঠার আগে কেউ এখান থেকে কিছু দেখতেও পাবে না বা শুনতেও পাবে না। তাদের উপরের দিক থেকে যে জানালা খোলার শব্দ হয়েছিল সেটাও ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অ্যাবোলি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সাহায্য ছাড়া সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কিন্তু নষ্ট করার মতো সময় হাল-এর হাতে নেই। সে অ্যাবোলির দিকে তাকিয়ে বলে উঠে, “জুডিথ।” তারপর অন্ধকার গলি ধরে দ্রুত দৌড়াতে শুরু করে।
*
“উঠে পড়ন, মাই লেডী, আপনাকে উঠতেই হবে,” জুডিথ জেগে উঠে দেখতে পায় মসি তাকে অনুনয়-এর সুরে আস্তে আস্তে S ডাকছে। তার গলার স্বরে ভয় উপচে পড়ছে। আমি ভয় পাচ্ছি। জিনটা আসছে। এখন আমরা কী করব?”
জুডিথ ঘুমের ঘোরে চোখ মিট মিট করতে থাকে। একমুহূর্তের জন্য তার মনে হয় ছেলেটি হয়ত দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছে। পৃথিবীতে জিন বা প্রেতাত্মা বলে কিছু নেই। এ কারণে তার বুঝতে একটু ভুল হয়েছিল। তাই দরজাটা যখন লাথি মেরে ধাক্কা দিয়ে খোলা হয় তখনও সে বিছানায় শুয়ে ছিল। এখনও সে চাইলে ঘুরে বালিশের নিচ থেকে কাসকারা তলোয়ারটা হাতে নিতে পারে। কিন্তু কম্বলটা এখনো তার গায়ের ওপরেই আছে। একটানে কাসকারা হাতে নিয়ে যখনই সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল তখনই পাঁচজন লোক ঘরের ভেতর প্রবেশ করে জুডিথ-এর দিকে তলোয়ার তাক করল।
এরপর আরও একজন প্রবেশ করে। তার দিকে তাকিয়ে জুডিথ মসির ভায়ের কারণ বুঝতে পারে। লোকটির মুখে অদ্ভুত রকমের চামড়ার মুখোশ পরানো আছে, চাঁদের আলোতে যেটাকে ভয়াবহই মনে হচ্ছে। মসি এটা দেখেই শয়তান ভেবে ভুল করেছে। : আরও একটা চিন্তা তার মাথায় উদয় হলো। মসি কোথায়? সে কোথায় গেছে? তবে এটা ভেবেই জুডিথ একটু নিশ্চিন্ত হলো যে এই আগমনকারীরা কেউই মসির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে না।
কোনো মরিচা ধরা তলোয়ার তার খাপ থেকে বের করার সময় যেমনটা বিশ্রী, খসখসে শব্দ হয়, অনেকটা সেরকম কণ্ঠে মুখোশ পরা লোকটা কথা বলে উঠল, “যুদ্ধ করার কোনোরকম চেষ্টা করবেন না। তাহলে আপনি এবং আপনার পেটের ভেতর বেড়ে ওঠা সন্তান দুজনেই মারা যাবেন।”
জুডিথ জানে লোকটি ঠিকই বলেছে। সে একজন পুরুষের মতো করে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার মনের গভীরে লুকোনো কোনো সত্তা তাকে মনে করিয়ে দিল যে একজন নারী যেভাবে প্রতিরোধ করে তাকেও এখন সেভাবেই প্রতিরোধ করতে হবে। আর সেটা যুদ্ধ করে নয়, সহ্য করে। একজন পুরুষকে শুধু তার নিজেকে নিয়ে ভাবলেই হয়। কিন্তু একজন মাকে তার নিজের চেয়ে তার সন্তানের কথা বেশি ভাবতে হয়।
