গ্রে হেসে বলল, “ওহ আমি একটা জিনিস জানি যেটা আমাদের দুই বিশ্বাসঘাতক লাভবার্ডকে আলাদা করতে পারে। এটা এমন একটা জিনিস যেটার প্রতি ওরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, এবং সেটার জন্যই ওরা যুদ্ধ করেছে।”
“আপনি কী সত্যিই আমার সঙ্গে ভাঙ খাবেন না? এটা স্রেফ ঠাণ্ডা শরবত যেটা ইন্ডিয়ানরা হরহামেশাই খেয়ে থাকে। খেতে অনেকটা মিষ্টি এবং সাথে একটু ঝাঁঝালো স্বাদও রয়েছে। এক ধরনের পাতার মিশ্রণে এটা তৈরি করা হয়। মনকে হালকা ও ফুরফুরে রাখতে সহায়তা করে। আমাদের এখন ঠাণ্ডা মেজাজে কাজ করাটা খুব জরুরি।”
পেট গ্রে-র আমন্ত্রণ অস্বীকার করল। কিন্তু কনসাল এক জগ ঠাণ্ডা আনতে আদেশ করে। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রতিক্রিয়াও তেমনি হয় যেমনটা সে অনুমান করেছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা তাদের কাজের একটা পরিকল্পনা করতে সমর্থ হয়। এরজন্য কী কী জিনিসপত্র লাগবে সেটারও একটা তালিকা তৈরি করে ফেলে। জাঞ্জিবার-এর অবস্থান মেরুর খুব কাছাকাছি হওয়ায় সূর্য সবসময় সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে অস্ত যায়। পেট যখন আলোচনা শেষ করে বিল্ডিং থেকে বের হয় তখন সূর্যের কড়া রোদ-এ ভাটা পড়ে কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
গ্রে-ও আলোচনা শেষ করে সতেজ মনে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে প্রিন্স জাহান-এর প্রাসাদের দিকে যাত্রা শুরু করে। যখন সে গার্ডদের কাছে ব্যাখ্যা করে যে সে ক্যাপ্টেন কার্টনি এবং জেনারেল নাজেত-এর খবর নিয়ে এসেছে তখন তাকে বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েই ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অন্যদিনের চেয়ে বেশ দ্রুতই তার জন্য দ্বার উন্মোক্ত হয়ে যায়। প্রথমে জাহান তাকে একা স্বাগত জানায়। এরপর তার সামনে যে মূর্তিটি এসে দাঁড়ায় গ্রে প্রথমে তাকে মানুষ বলে মনে করেনি। সে মূতির্টি হচ্ছে অ্যাঙ্গাস কোকরান-এর পুড়ে যাওয়া শরীর। এরপর একজন বার্তাবাহককে এক থলে সোনার কয়েনসহ একটা নির্দিষ্ট কফিশপ-এ পাঠানো হয় প্রিন্স-এর পক্ষ থেকে। দোকানীকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তাকে দিয়ে যদি কোনো কাজ করানো হয় তবে তাকে কী এর চেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে কি-না? দোকানী তাকে এতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে দেখে বিস্মিত হয়! সে জানায় যে যেকোনো কাজ করে দিতে সে প্রস্তুত আছে। এর পরের প্রস্তুতিটুকু প্রাসাদের ভেতরেই নেয়া হয়।
যখন জাহান এবং বুজার্ড তাদের পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে এলো তখন গ্রে উঠে দাঁড়িয়ে বাকি দুজনকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। যাবার আগে সে মাননীয় প্রিন্সকে একটা অনুরোধ করতে ভুলল না। “মহামান্য প্রিন্স, আমি নিশ্চিত যে আজকে সন্ধ্যার মধ্যেই আপনার পরিকল্পনামাফিক সব কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু কার্টনির লোকেরা যখন জানতে পারবে যে তাদের ক্যাপ্টেন-এর কিছু ঘটেছে তখন তারা উত্তর খোঁজার জন্য আমার কাছে আসবে। তখন তারা আমাকে এত সহজে ছেড়ে দিবে না। তাই আমি আপনার কাছে অনুরোধ করব যাতে আপনি অন্তত আপনার এক ডজন লোককে গার্ড হিসেবে আমার নিরাপত্তার জন্য নিয়োগ করেন।”
জাহান হেসে বলল, “তো, কনসাল, আপনি এখন আপনার নিজের দেশের লোকের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমার কাছে নিরাপত্তা চাইছেন।”
“মহারাজা, আমি ব্যাপারটা নিয়ে ওভাবে চিন্তা করছি না। তবে আমার মনে হয় এতে আপনার একটু গুরুত্ব দেয়া উচিত।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি গার্ড পাবেন। কিন্তু আমার মনে হয় ছয় জনই যথেষ্ট।”।
“আপনি কী ছয়কে কোনোভাবে দশ-এ উন্নীত করতে পারেন না মহারাজা?” গ্রে দরকষাকষি করতে লাগল।
“আট”, জাহান ইতি টেনে বলল। “এর বেশি একজনও নয়। তবে আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আমার মনে হয় না কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে। কোনো গার্ডেরই হয়ত আপনার প্রয়োজন পড়বে না।”
“মহারাজা। আপনার অশেষ দয়ার কারণে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।”
এখন থেকে গ্রে জাহান-এর অফিসিয়াল সুরক্ষার আওতাভুক্ত হলো। সমাজে তার মর্যাদা এবং সম্মান অনেক উপরে উন্নীত হলো। গরমে একা একা বেশ খুশি মনে রাস্তা দিয়ে যেতে লাগল কনসাল গ্রে। অবশেষে সে হয়ত সুদিনের দেখা পেতে যাচ্ছে। তার অর্থনৈতিক অবস্থা দিনের শুরুতে যেমনটা ছিল সেটাও হয়ত বদলে যেতে শুরু করেছে।
সে বাড়ির ভেতর ঢুকতে না ঢুকতেই খাবার এবং পানীয় আনতে আদেশ করে। তাকে একটা লম্বা, ব্যস্ত রাত পার করতে হবে। এজন্য তাকে খেতে হবে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তির যোগান পাওয়ার জন্য। গ্রে একজন সচেতন মানুষ। রাতে হয়ত সবকিছু তার পরিকল্পনামত নাও ঘটতে পারে। তাই যেসব চাকর দিনের বেলায় তার বাড়িতে কাজ করে তাদেরকে সে রাতেও থাকতে বলে দিল। এরা সবাই তার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত লোক। রাতের বেলায় গোল্ডেন বাউ-এর লোক যেন কোনো গণ্ডগোল বাধাতে না পারে সে কারণেই এই বাড়তি চেষ্টা।
*
হাল দোকানীর বাড়ির ছাদের ওপর খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে অ্যাবোলির সাথে কথা বলছিল। দুজনেই তাকিয়ে তাকিয়ে উপকূলবর্তী শহর দেখছিল। টর্চ আর লণ্ঠনের আলোতে জাহাজগুলো আলোকিত মনে হচ্ছিল। সেই আলোকরশ্মি পানির ঢেউয়ের ওপরও নাচানাচি করছিল। ডেট উপকূল থেকে যদিও বেশ দূরে নোঙর করা আছে কিন্তু এরপরেও একটা লম্বা নৌকো ঘাটে বাঁধা আছে। নৌকোয় সবসময় একজন লোক তৈরিই থাকে যেন যেকোনো জরুরি মুহূর্তে হালকে জাহাজে পৌঁছে দিতে পারে। হাল জুডিথকে সন্ধ্যায় জাহাজে পাঠানোর অনেক চেষ্টা করেছে। জুডিথ যখন জানতে চেয়েছে রাতের অন্ধকারেই তারা জাঞ্জিবার ত্যাগ করবে কি-না তখন হাল জানায় ভোর হওয়ার আগে তারা জাঞ্জিবার ত্যাগ করবে না।
