গ্রে খাবারগুলো সব নামিয়ে রাখছিল। যদিও হাল খেয়াল করে দেখল যে পেট খুব একটা খাবার খাচ্ছে না। খাবার টেবিলে এরকম আচরণ তাদের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবই প্রকাশ পাচ্ছে। গ্রে-কে অবশ্য বেশ আত্মবিশ্বাসীই মনে হচ্ছিল। সে যখন হালকে আশ্বস্ত করে যে উত্তরে অনধিকার প্রবেশের ব্যাপারে তার কোনো বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব নেই, তখন হাল নিশ্চিন্ত মনেই সেই আশ্বস্ততা গ্রহণ করে।
হাল চলে যাওয়ার পর গ্রে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে যে সে উপকূলের কাছেই একটা ওষুধের দোকানে থাকার জায়গা বেছে নিয়েছে। কিন্তু জায়গাটা কোথায় সে ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু জানতে পারেনি। গ্রে আরও বুঝতে পারে যে গোল্ডেন বাউ নিয়ে হাল পোতাশ্রয়ে প্রবেশ করেনি। এবং আগামীকাল জোয়ারের সময় সেটা ছাড়বে। কার্টনি চলে যাওয়ার আগে গ্রে এবং তার নিজের ব্যাপারে ভাল কিছুর আশাবাদ ব্যক্ত করে। সেই সাথে পেটকে বিদায় জানায়। সে পেটকে গ্রে-এর সাথে রেখে যায়, সেই সাথে রেখে যায় লন্ডনের উদ্দেশ্যে লেখা কিছু চিঠিও।
ক্যাপ্টেন চলে যাওয়ার পর যখন বাড়ির গেট বন্ধ হয়ে যায় তখন গ্রে চিঠিগুলো একজন চাকরের হাতে দিয়ে তার টেবিলে রাখতে বলে। কার্টনির ঔদ্ধত্য ও সাহস দেখে সে মনে মনে বেশ ক্ষুদ্ধ হচ্ছিল। কোনো রকম অনুমতি পত্র ছাড়া সে জাঞ্জিবার-এর রাস্তায় পা দেয়ার সাহস পায় কী করে।
এরপর গ্রে পেট-এর দিকে মনোযোগ দেয়। এই রসকষহীন বিরক্তিকর লোকটাকে নিয়ে সে কি করে। গ্রের মনে হচ্ছে হাল অপমানের মাত্রাটা আরও একটু বাড়িয়ে দেয়ার জন্যই পেটকে তার কাছে দিয়ে গিয়েছে।
এখনো তাকে আরও একটু খেলা খেলতে হবে। স্টেজ-এর পর্দা এখনো নামিয়ে ফেলা হয়নি। তাই সে তার মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে সম্মানিত অতিথির দিকে তাকাল। হাতে তালি বাজিয়ে একজন চাকরকে ডেকে কফি দিতে বলল। এরপর সে পেটকে বলল, “জাঞ্জিবার-এর প্রতিদিনকার দুশ্চিন্তা থেকে সরে গিয়ে পুনরায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ শুরু করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। এখন বলুন স্যার আমি আপনার কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি? ক্যাপ্টেন কার্টনি বলেছে আমি যেন আপনার গল্প মনযোগ দিয়ে শুনি।
পেট কফি না নিয়ে গ্রে-র প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করল। “এটা সত্য যে বোম্বে (মুম্বাই) থেকে আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড-এর যাত্রী হিসেবে যখন আমি যাত্রা করেছিলাম, তখনো আমি ভাবতে পারিনি যে আমি এখানে এসে পৌঁছাবো।”
“ও, হা, আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড। ওটাতে বেশ কয়েকবার জাঞ্জিবার-এ নোঙর ফেলেছে, গ্রে বলল। এরপর টেবিলের দিকে তাকিয়ে কফির পাশে রাখা প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল। সেটাতে মিষ্টি জাতীয় এক ধরনের গোলাপি রঙের বল রাখা আছে। সে একটা বল চামচ দিয়ে মুখে তুলে নিল।
“আচ্ছা, আমি, জাহাজটার ক্যাপ্টেন-এর নাম মনে করার চেষ্টা করি।” মুখভর্তি গোলাপি রঙের বলটা নিয়েই সে বলল, “গিডিংস…গ্যাডিংস,..আমার যতদূর মনে আছে এরকমই কিছু একটা।”
“গোডিংস।”
“ওহ, হ্যাঁ। অত্যন্ত আমুদে লোক। নিজের আনন্দ ফুর্তি নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকে। অনেকটা ইয়ং কার্টনির মতো। সে এখন কেমন আছে?”
“মারা গিয়েছে। তার জাহাজসহ আগুনে পুড়ে গিয়েছে। আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড বোম্বে (মুম্বাই) থেকে ছেড়ে আসার এক সপ্তাহ পর আগুনে পুড়ে যায়। সে জাহাজ ভর্তি সল্টপিটার নিয়ে রওনা হয়েছিল। এ কারণে আগুন লাগার পর কেউ রক্ষা পায়নি, শুধু আমি কোনোভাবে পালিয়ে বেঁচেছি।”
“আহারে বেচারা লোকগুলো কেউ বাঁচল না?” “আপনার বেশ সৌভাগ্যই বলতে হয়।”
“আমি জলন্ত জাহাজ থেকে এই বিশ্বাসে লাফ দেই যে আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে রক্ষা করবেন।”
“আল্লাহ তাআলা সর্বশক্তিমান এবং পরম করুণাময়,” গ্রে বিড়বিড় করে বলল।
“আমি এই সৃষ্টিকর্তার কথা বলিনি।” পেট খুব ঠাণ্ডা এবং ধীরস্থিরভাবে বলল। গ্রে তার অতিথির আসল প্রকৃতি সম্পর্কে একটু সচেতন হয়ে উঠল।
“যেভাবেই হোক আমি বেঁচে যাই,” পেট বলা শুরু করল। “ডাচদের একটা জাহাজ আমাকে উদ্ধার করে, যদিও এই মহানুভবতার পেছনে একটা নিষ্ঠুরতম উদ্দেশ্য ছিল। আমাকে একটা নোংরা বন্দিখানায় আটকে রাখা হয়।”
“কী কারণে তারা এমনটা করেছিল?”
“জাহাজের ক্যাপ্টেন বলেছিল যে আমার নিজের নিরাপত্তার জন্যই তাকে এটা করতে হয়েছিল। জাহাজে তখন চরম খাদ্য সংকট ছিল এবং সবাই ক্ষুধার্ত ছিল। তার ভয় ছিল যে আগন্তুক হিসেবে যেহেতু জাহাজের লোকদের সাথে আমার কোনো বন্ধন নেই, তাই তারা হয়তো খিদের জ্বালায় আমাকে মেরে আমার মাংস রান্না করে খেয়ে ফেলতে পারে।”
এখন দেখা যাচ্ছে যেভাবেই হোক আপনি এরকম কিছুর শিকার হন নি।” গ্রে কিছুটা হাস্যরসাত্মকভাবে কথাটা বলল। কিন্তু পেট সেটা বুঝতে পারল না।
“আমি ক্যাপ্টেন কার্টনির কারণে এই কারাবাস থেকে মুক্তি পাই। সে-ই আমাকে আমার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেয়।”
“দেখা যাচ্ছে আপনি অক্ষত অবস্থায়ই কারাবাস থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আপনার মুক্তিটা আপনার জন্য একটা পুরস্কারই বলা যায় মি. পেট, গ্রে আরো একটু যোগ করল।
“আমি বেশ নিরাপদেই আছি। এখন যেভাবেই হোক আমার ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ টাকা-পয়সা দরকার তা আমার হাতে নেই। এমনকি আমি যে জামাকাপড় পরে আছি এগুলো ছাড়া আমার হাতে কোনো জামাকাপড়ও নেই। কিন্তু একটা কাজ করে দেয়ার সুবাধে ইংল্যান্ডে পৌঁছেই এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে পাঁচ’শ গিনী পাব।”
