অ্যাবোলি তার লম্বা কালো বাহু দিয়ে ছেলেটাকে ধরে ফেলল। অ্যাবোলি যখন ছেলেটাকে উপরে উঠাল তখন বাতাসে হাত-পা ছুড়ছিল সে।
“তুমি পালিয়ে কোথায় যাবে ভেবেছ?” সে দয়ামায়াহীনভাবে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল। “তুমি এখন এই ভদ্রমহিলার সম্পত্তি, মসি।”
“মসি?” হাল জিজ্ঞেস করল।
“মসি মানে হচ্ছে চড়ুই পাখি। আমার মনে হয় এটাই ওর জন্য উপযুক্ত নাম।” জুডিথ হেসে ফেলল। “যাই হোক, আমার মনে হয় না তুমি খুব বেশিদূর যেতে পারবে, মসি।” ছেলেটা হাত-পা ছোঁড়া ছেড়ে দিয়ে অ্যাবোলির মুষ্ঠির মধ্যে শরীরের ভার ছেড়ে দিল।
“আমি দাস হিসেবে খুব একটা ভাল না। তুমি দেখে নিও।” মসি জুডিথ এর দিকে তাকিয়ে বলল।
হাল-এর মনে হচ্ছিল, এবার কিছু একটা বলা উচিত। সে হাঁটুগেড়ে বসে ছেলেটার চোখের উচ্চতায় নিজেকে নামিয়ে আনল, এরপর বলতে শুরু করল, “আমার জাহাজে কোনো দাস নেই, ঠিক আছে? আর তুমি সেখানেই যাচ্ছ। এরপরেও তুমি যদি নিজেকে দাস ভাবো তাহলে আমি তোমাকে সাগরে নিক্ষেপ করব। ওখানকার হাঙ্গরগুলো সারাবছর ধরে তোমার মতো খাবারের জন্যই অপেক্ষা করে। তুমি কী তাই চাও, মসি?”
মসি বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল কিন্তু তার ছোট চোখ দুটো জলে ভরে উঠল-পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তার মনে এরকম কিছুই কাজ করছে না। হাল এবার জুডিথ-এর দিকে তাকিয়ে ইশারা করল-ব্যাপারটাতে এবার জুডিথ-এর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
“মসি, আমি তোমাকে প্রতিমাসে এক পেনী করে দেব যদি তুমি আমার বডিগার্ড হিসেবে কাজ কর। এবং আমি কথা দিচ্ছি যে তোমাকে কখনোই হাঙ্গরের মুখে নিক্ষেপ করা হবে না।” এবার ছেলেটি খুব আগ্রহ নিয়ে জুডিথ এর দিকে তাকাল।
হাল এবার একটু মজা করার লোভ সামলাতে পারল না। সে বলল, “আমি তোমাকে দুই পেনী করে দিব যদি তুমি আমার বডিগার্ড হিসেবে কাজ
মসি মাথা নিচু করে হাল-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “না।”
“কেন না?” হাল জানতে চাইল।
“কারণ সে আমার ভাষা তোমার চেয়েও ভাল জানে। এছাড়াও…” সে। থেমে গিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
“এছাড়াও কী?” হাল আবারও জানতে চাইল।
মসি মাথা নিচু করে তার খালি পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, “তার গন্ধ অনেক ভাল। আর…সে দেখতে তোমার চেয়েও অনেক সুন্দর।”
সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জুডিথ ছেলেটার গল্প শুনতে চাইল। তার বাবা ছিল একজন জেলে। সোমালিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বারাবা গ্রামে তার জন্ম। অ্যারাবিয়ান দাস বিক্রেতারা একবার তাদের গ্রামে আক্রমণ করে তাকে নিয়ে যায় এবং এরপর জাঞ্জিবার-এ পর্তুগীজ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়।
“আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারব যাতে তোমরা হারিয়ে না যাও,” ছেলেটা খুব গর্বের সাথে বলল।
“সেটা তো খুবই ভাল কথা,” হাল উত্তর দিল।
“তুমি না। আমি মেমকে বলেছি,” মসি বলল। মেম হচ্ছে মেমসাহেব-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা হচ্ছে অনেক সম্মানের একটা সম্বোধন যেটা সে জুডিথকে উপহার স্বরূপ দিয়েছে। তারা সেই বৃদ্ধ দোকানীটার ঘরে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত ছেলেটা এটা সেটা কথা বলেই যেতে লাগল।
যে নাবিকটাকে রাষ্ট্রদূত গ্রে-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য পাঠানো হয়েছিল সে ওখানে অপেক্ষা করছিল, উইলিয়াম পেটও তার সঙ্গে রয়েছে।
“আমাদের ভাগ্য বেশ ভাল বলতে হবে ক্যাপ্টেন,” পেট হালকে দেখে বলল। “রাষ্ট্রদূত আমাদের দুজনের সাথে সাক্ষাতের সম্মতি দিয়েছেন। তিনি আজ মধ্যাহ্ন ভোজনে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।”
“আজকেই?” এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া পেয়ে হাল খুব অবাক হলো। “তাহলে আমাদের আর বাইরে না যাওয়াই ভাল। অ্যাবোলি তুমি যদি জেনারেল জুডিথ এবং তার নতুন ছেলেটার দেখাশোনা করতে পার তবে আমি পেট-এর সাথে কনসাল গ্রে-এর সাথে দেখা করতে যেতে পারি। তাহলে আমাদের হয়ত আর থাকার জায়গার প্রয়োজনই পড়বে না। আজ সন্ধ্যার মধ্যেই হয়তো আমরা ডেফটে ফিরে যেতে পারব যাতে খুব ভোরে বাট নিয়ে আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারি।”
*
যখন থেকে গ্রে জানতে পেরেছে যে কার্টনি এই জাঞ্জিবার শহরেই আছে তখন থেকেই অস্বাভাবিক দ্রুত গতির সাথে সে নিজের কি কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে। যে মাস থেকে তার দুর্ভাগ্য ও দারিদ্রতা শুরু হয়েছিল সে মাস থেকেই তার গৃহস্থালীর লোকজন কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখনো তার একটা রাঁধুনী আছে। তার দেয়ালে টাঙানো বেশ কিছু পেন্টিং আর কিছু পারসিয়ান কম্বল বন্ধক রাখার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য সে তার পরিচিত একজন দালালের কাছে গেল, যাকে অনুরোধের পাশাপাশি এই কথাটাও বলে দিতে ভুলল না : “আমার ভাগ্য খুব শীঘ্রই বদলে যাবে স্যার, এই কথাটা মনে রাখবেন।”
তার হাতে যে ক্যাশ আছে তা দিয়ে অন্তত কয়েকজন স্টাফকে-যাদেরকে সে বাদ দিয়েছিল-ধার করে নিয়ে আসতে পারবে। তখন অন্তত বাড়িটাতে ধনী-ধনী ভাব ফুটিয়ে ভোলা যাবে। তার রাধুনীটাকে সে বাজারে পাঠিয়েছে যেন সে ভাল ভাল সব জিনিসপত্র কিনে আনে এবং শহরের ভাল দোকান আর রাধুনীদের মতো খাবার রান্না করতে পারে। হাল কার্টনি এবং তার সঙ্গী মি. পেট যখন পৌঁছাল তখন সেরা খাবারটাই পরিবেশন করল গ্রে-গরুর মাংস ও পটেটো দিয়ে রান্না করা এক ধরনের পিলাফ, পেয়াস, নারিকেলের দুধ, খোলা আগুনে পোড়ানো শার্ক-এর গ্রিল। পিজা ওয়া নাজি নামে একধরনের খাবার আছে যেটা বানানো হয় অক্টোপাস-এর মাংস সেদ্ধ করে। সেই সাথে দেয়া হয় নারিকেলের দুধ, কারি, সিন্নামন, কার্ডামম, গার্লিক, লেবুর রস।
