সেখানে অনেক মুসলমান অন্ধ লোকটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। না তারা অন্ধ লোকটির দিকে ফিরে তাকাচ্ছে, না তারা নিজেদের জীবনের কথা চিন্তা করে ভীত হচ্ছে।
“তার অবস্থা হয়েছে দেদা পাখির মতো,” অ্যাবোলি বলল। “সে এত বেশি চিৎকার করছে যে লোকজন একদম অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তারা এখন আর লোকটির চিৎকার-এ পাত্তা দিচ্ছে না।”
“এই দ্বীপটা সত্যিই অসাধারণ,” হাল এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বলল। কারও গায়ের রং কালো, কারোটা আবার সাদা। এমনকি বাদামি আর হলদে ভাব যুক্ত গায়ের রঙের মানুষও দেখা যায়। কারো চোখ আলমন্ড-এর মতো, কারোটা আবার কাকৃতি। নাক দেখতে কারওটা চেপ্টা, কারওটা বাঁকানো। চুলের রঙে এবং গড়নেও রয়েছে ভিন্নতা। কারও চুল উলের মতো, কারও সিল্কী, কারও চুলের রং কালো অথবা সোনালি। ইউরোপীয়ান, বান্টু এবং আরব উপমহাদেশে লোকদের রঙের সংমিশ্রণ ঘটেছে ইন্ডিয়া মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপটিতে।
“আইয়াসুর বাবার রাজত্বকালে আমার বাবা যখন ভেনিস-এর অ্যাম্বাসিতে ছিল যখন আমার বিভিন্ন জাতের মানুষ দেখার সুযোগ হয়েছে। তখন এদিক সেদিক বিভিন্ন ক্যানেল-এ ঘুরতে চলে যেতাম। কিন্তু সেখানে উপকূল বা দ্বীপগুলো এরকম ছিল না।” জুডিথ-একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে বলল, “কিন্তু ভেনিস ছিল ইউরোপ-এ আর জাঞ্জিবার হচ্ছে আফ্রিকায়। এটা উষ্ণ এবং বন্য একটা উপমহাদেশ।”
সে হাল-এর বাহু ধরে কাছে টেনে এনে বলল, “আমার সম্ভবত অস্ত্র নিয়ে আসা উচিত ছিল।” হাল মনে করার চেষ্টা করল যখন সে জুডিথকে হউবার্ক পরা অবস্থায় দেখেছিল তখন কত সুন্দরই না লেগেছিল। সুসজ্জিত কালো অ্যারাবিয়ান স্ট্যালিয়ন-এর উপরে চড়ে যাচ্ছিল। যখন হাল জুডিথকে এরকম যোদ্ধার বেশে দেখেছিল সে তাকে একজন পুরুষ বলেই মনে করেছিল। সে তাকে জেনারেল নাজেত নামেই চিনত। কিন্তু কখনও ভাবেনি যে এরকম বিখ্যাত যোদ্ধা একজন নারীও হতে পারে। আর এখন জুডিথের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি সম্পর্কে ভালভাবে জানার পর তার বেশ অবাকই লাগে যে প্রথম দেখায় তাকে কিভাবে সে পুরুষ ভেবেছিল! “তোমাকে আমার খুব কাছাকাছি থাকতে হবে, ক্যাপ্টেন কার্টনি,” জুডিথ বলল। জুডিথের গরম নিঃশ্বাস হাল-এর কান ছুঁয়ে যাচ্ছে যেটা তাকে তাড়া দিতে লাগল জুডিথকে নরম বিছানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
“কোনো ভয় নেই। মাই লাভ,” সে বলল। “আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে আমি তোমাকে রক্ষা করব। আমার কাছে তুমি নিরাপদ।”
জুডিথ অল্প করে হেসে দিয়ে হাল-এর খুব কাছে এসে গালে ঠোঁট ছোঁয়াল, এরপর এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল কেউ তাদের দেখে ফেলেছে কি-না। হালও একটা হাসি দিল, এরপর সেও বিস্ময়াভিভূত হয়ে জাঞ্জিবার শহরটা দেখতে লাগল।
হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে তাদের ভাবনায় ছেদ পড়ল। তাদের একটু সামনেই একটা জায়গায় দাস বিক্রেতার আশেপাশে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। সেখানে পাতলা লম্বা অ্যামব্রয়ডারি করা গাউন এবং মাথায় স্কার্ফ পরা অ্যারাবিয়ানরা, দৃঢ়চেতা পর্তুগীজ ব্যবসায়ীরা, জাহাজের ক্যাপ্টেন, এজেন্ট এবং ক্রাফটম্যানরা সস্তায় শ্রমিক এবং কর্মচারী খুঁজতে এসেছে। সেখানে অনেক স্টলের দোকানীরাও তাদের দোকান ফেলে চলে এসেছে।
লোকটা একটা ছোট ছেলেকে লাথি মারছে যার চামড়ার নিচের বক্ষ পিঞ্জরের হাড়গুলো বের হয়ে আছে। কিন্তু ছেলেটা কাঁদতেও পারছে না। তার বদলে সে তার চিকন হাতগুলো দিয়ে খুব শক্তভাবে বিক্রেতার পা জড়িয়ে ধরে আছে। সে ছাড়াও আশেপাশে আরো তিনজন আফ্রিকান এবং একজন ইউরোপিয়ান দাস ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা অস্ত্র হাতে পাহারাদারেরা ওদেরকে বেঁধে রাখা দড়িগুলো হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
নারী ও পুরুষের সমবেত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা গণ্ডগোল সেখানে হয়েছে। দাস বিক্রেতাটা তার লম্বা পিস্তলের ব্যারেলটা দিয়ে দাস ছেলেটাকে আঘাত করছে। ছেলেটা বিক্রেতাটার পায়ের মাংসে কামড় বসিয়েছে, যে কারণে বিক্রেতটাও চিৎকার করছে এবং আরও জোরে প্রহার করছে।
“থাম। ছেড়ে দাও ওকে,” জুডিথ অ্যারাবিক ভাষায় চিৎকার করে উঠল। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গিয়ে দাস ছেলেটাকে ছাড়াতে চাইল সে। হাল এবং অ্যাবোলি তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।
“এতে তোমার সমম্যাটা কী হচ্ছে?” দাস বিক্রেতাটা জানতে চাইল।
“চলে আস,” হাল জুডিথকে টান দিয়ে রাগত স্বরে বলল। কিন্তু জুডিথ নড়ল না।
“আমার সম্যাটা হচ্ছে যে আমি চাই না কেনার আগে আমার দাসের কোনো ক্ষতি হোক।”
“তুমি এই ছোঁকড়াটাকে কিনতে চাও?” দাস বিক্রেতা অবাক হয়ে জানতে চায়।
জুডিথ মাখা ঝাঁকাল, “কিন্তু আমি তোমাকে এক সিলভার রুপির একটুও বেশি দিব না।”
দাস বালকটি অবাক হয়ে জুডিথকে দেখতে লাগল। হালও তাকিয়ে তাকিয়ে জুডিথকে দেখছে। ছেলেটার বয়স বার বছরের বেশি হবে না। নোংরা, ময়লার নিচে ছেলেটার গায়ের রঙ একেবারে জুডিথের মতো।
“ঠিক আছে”, দাস বিক্রেতাটা খুব দ্রুত বলে উঠল। “এই দাসটি সুন্দরী মহিলাটির কাছে বিক্রিত হল। সে নিলামের কাঠের টেবিলে আঘাত করে বিক্রি নিশ্চিত করল।
হাল আর না পেরে হাল ছেড়ে দিল এবং তার পকেট থেকে একটা কয়েন বের করে দাস বিক্রেতার দিকে নিক্ষেপ করল। এরপর বদমাসটা তার পা দিয়ে দাস ছেলেটাকে সজোরে একটা ধাক্কা মারল। ছেলেটা দ্ৰতু খরগোশের মতো লাফ দিয়ে জুডিথের বাড়ানো বাহুকে এড়িয়ে পালিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না।
