“হুম, চলবে,” সে দোকানীকে বলল। আবার খুব বেশি আগ্রহও দেখাল না। কারণ সে জানে, এতে ভাড়া আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। এরপর জিজ্ঞেস করল “ভাড়া কত পড়বে?”
দোকানীটা প্রথমে ভয়ানক এক দাম হাঁকাল। এরপর জুডিথও সেটা কমিয়ে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে ফেলল। কয়েক মিনিট দুই পক্ষের বাকৃবিতণ্ডের মাধ্যমে এমন একটা ভাড়া নির্দিষ্ট হল যেটাতে দুই পক্ষই খুশি।
হাল তার দুজন খালাসি দিয়ে এক সিন্দুক ভরা জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে জাহাজ থেকে যেখানে কাপড়-চোপড়সহ আরও অনেক জিনিসপত্র রয়েছে। হাল জানে যে জাঞ্জিবার এমন একটা জায়গা যেখানে অস্ত্রসস্ত্র ছাড়া থাকা সম্ভব না। সে একটা নেপচুন তলোয়ার এবং তার বাবার দেয়া একজোড়া পিস্তল সাথে করে নিয়ে এসেছে। সিন্দুকটা এনে রাখার পর জুডিথ সেটার জিনিসপত্র বের করতে লাগল। হাল প্রথমে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রদূত গ্রে-কে চিঠি লিখতে বসল। চিঠির প্রথমেই সে ভুল বোঝাবুঝির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিল। কিন্তু এখন ইথিওপিয়ার যুদ্ধ শেষ হয়েছে। সে আশা করছে যে তার কোনো ভুলের জন্য বা ভুল বোঝাবুঝির জন্য কনসালকে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় নি। সে রাষ্ট্রদূত-এর সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। রাষ্ট্রদূতকে ব্যাখ্যা করে বোঝায় যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মি, উইলিয়াম পেট বর্তমানে তার সাথেই আছে, যে তার দেশে ফিরতে চায়। লোকটা রাষ্ট্রদূত-এর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে যদি তিনি তাকে এখান থেকে ইংল্যান্ড পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করে দেন। হাল আর লিখল, “আমি নিশ্চিত যে আমরা প্রকৃত ইংলিশম্যান-এর মতই সাক্ষাৎ করব। আমাদের দেশ, আমাদের মাতৃভূমির প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অতীতের ছোট খাট ভুলগুলোকে আমরা ভুলে যাবার চেষ্টা করব।” এইটুকুতে লেখা শেষ করে হাল। লেখাতে জুডিথ-এর ব্যাপারে কোনো কথার উল্লেখ ছিল না। জাঞ্জিবার এমন একটা জায়গা যেখানে কোনো কথা গোপন থাকে না। তবে এমন কিছু করা যাবে না যাতে জুডিথ-এর উপস্থিতির কথা অন্যদের কানে পৌঁছে যায়।
সে তার লেখা চিঠিটা পুনরায় পড়তে লাগল। তার মনে হচ্ছে, এতেই হবে। সে তার একজন বিশ্বস্ত লোককে চিঠিটা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দিল। তারপর সে জুডিথ, অ্যাবোলি এবং আরো দুজন পাহারাদার নিয়ে শহরটা ঘুরে দেখতে বের হলো।
“তোমাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক”, এই কথা বলে কিচিরমিচির করতে করতে কয়েকটা ছোট ছেলে হাল এবং জুডিথকে জড়িয়ে ধরে ওদের পারিবারিক দোকানের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। অ্যাবোলি ধমক দিয়ে, ভয় দেখিয়ে ওদেরকে থামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু এতে খুব একটা লাভ হলো না।
তারা বিভিন্ন ধরনের রকমারি জিনিসপত্রের সামনে দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। আইভরি পাথর এবং অ্যারাবিক আঠা জাতীয় বিভিন্ন পদার্থ রাখা আছে এরকম একটা দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু জিনিসপত্র কিনল ওরা। ঝুড়িতে করে বিভিন্ন স্পাইসি জিনিসপত্র নিয়ে ছোট ব্যবসায়ীরা বসে আছে। এছাড়াও চকচক করা সিল্ক এবং কার্পেট-এর দোকানীরা কার্পেট-এর ভাঁজ খুলতে খুলতে জুডিথকে দক্ষ ব্যবসায়ীর মতো তাদের জিনিসপত্রের প্রলোভন দেখাতে লাগল। এরপর ওরা কিছু দাসও বিক্রি হতে দেখল। বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ, ছেলে, মেয়ে শেকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বিক্রেতার হাতে মোটা শেকল শোভা পাচ্ছে। দাস ব্যবসায়ীরা বা তাদের কোয়াটার মাস্টাররা ক্রেতাদের প্রলোভন দেখানোর জন্য পুরুষদের মাংসল বাহু এবং কাঁধ উঠিয়ে দেখাচ্ছে। মহিলাদের শক্ত হাত বা শরীরের আকর্ষণীয় অংশ এমনকি অল্প বয়সি মেয়েদের গোপনাঙ্গ দেখিয়েও ওরা ক্রেতাদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা হাল ও তার সঙ্গীদের কাছে এতটাই বিরক্তিকর মনে হলো যে ওরা বিক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করার জন্য ওদিকে ফিরেও তাকাল না।
যেতে যেতে রাস্তা একসময় এত সরু হয়ে গিয়েছে যে একজন আরেকজনকে ধাক্কাধাক্কি করে সামনে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন রক্তনালীর ভেতর রক্ত জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে আছে। কিন্তু তারপরও এখানকার আবহাওয়া ঠাণ্ডা মনে হচ্ছে ওদের কাছে। কারণ সূর্যের আলো বড় বড় বিল্ডিং ভেদ করে এই পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে না। বিল্ডিংগুলো এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন একটার মাথা আরেকটা ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে কাকের ঝক উড়ে যাচ্ছে শব্দ করতে-করতে।
রাস্তাটার একটা সংকীর্ণ জায়গায় যেখানে দোকানীরা গ্রিল করা অক্টোপাস, স্কোয়াড় ওয়েস্টার এবং বিভিন্ন লোভনীয় সামুদ্রিক খাবার বিক্রি করছে তার পাশেই এক অন্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে সেইসব লোকদেরকে অভিসম্পাত দিচ্ছে যারা সত্যিকার খোদা বাদ দিয়ে জেসাসকে মিথ্যে খোদা বানিয়েছে এবং নবি হযরত মোহাম্মদ (সা)-এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
“তোমাদেরকে দিনের শেষটা দেখার জন্য হলেও বেঁচে থাকতে হবে!” লোকটি বলছে। লোকটির অন্ধ হয়ে যাওয়া চোখটা দেখে হাল-এর খানিকক্ষণ আগের কথা মাথায় আসলো। একটা ছোট ছেলে লিচু বিক্রি করতে চাচ্ছিল ওদের কাছে। এই লোকটার চোখগুলো খোসা ছাড়ানো লিচুর মতোই সাদা। “স্রষ্টার সাথে বেইমানি করার দায়ে তোমাদের জন্য চরম শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে, নরকের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে তোমাদের।”
