“অবশ্যই, আমি বুঝতে পেরেছি”, হাল মাথা নাড়ায়। এখন শুধু তুমি আমাকে সেগুলোর নাম বল। আমি যেখান থেকে পারি সেগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।”
“না হেনরী, মাই লাভ, তুমি পারবে না।” জুডিথ যদিও অনেক নমনীয় স্বরে বলে কিন্তু হাল বুঝতে পারছে জুডিথ তাকে বাধা দিচ্ছে। “তোমার আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। তুমি একজন পুরুষমানুষ। আমি যদি তোমাকে বলি তুমি সবকিছু বুঝতে পারবে না। এছাড়া তুমি একজন ইংরেজ। জাঞ্জিবার এর সবাই অ্যারাবিক কিংবা সওহিলি ভাষায় কথা বলে। তুমি তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে পারবে না।”
“কিন্তু তুমি জাঞ্জিবার-এর লোকদের কাছে নিষ্ঠুর জেনারেল নাজেত হিসেবে পরিচিত যে কি-না দুটো মুসলমান সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত করেছে। জাঞ্জিবার-এর প্রত্যেকে তোমাকে ঘৃণা করে।”
“তারা জেনারেলকে ঘৃণা করে এটা সত্য, জুডিথ উত্তর দেয়। তারা মনে করে জেনারেল নাজেত হচ্ছে একটা দানব। শয়তানের বউ, যে কি-না মানুষরূপে পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু আমি যদি একজন সম্ভ্রান্ত ভদ্র রমণী রূপে রাস্তায় বের হই, কবিরাজ-এর কাছে যাই তাহলে তারা কী আমাকে চিনতে পারবে? আমার মুখ ঢাকা থাকবে কাপড়ের নিচে। তারা হয়ত ভাববে আমি প্রতিদিনকার কাজকর্ম সারতে যাচ্ছি।” তখন কেউ কী আমার দিকে তাকিয়ে বলবে, “ওই দেখ জেনারেল নাজেত যাচ্ছে?”
হাল-একটা হাসি দিয়ে বলল, “খুব ভাল।” “আচ্ছা ঠিক আছে আমি তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। জেনারেল নাজেত-এর যুক্তির কাছে আমি হেরে গেছি।” “আমরা একসাথেই যাব। কিন্তু এটুকুই প্রার্থনা আমরা যেন একত্রে ফিরতে পারি।”
৪. ডেফট নামে জাহাজটি
ডেফট নামে জাহাজটি-যেটি এখন ক্রিস্টিনা’ নামে পরিচিত-খুব ভোরে জাঞ্জিবার শহরের উপকূলে প্রবেশ করে। একটা লম্বা নৌকোয় করে হাল, জুডিথ আর অ্যাবোলি সাগর উপকূলে বের হয়। পেট বলেছে যে রাষ্ট্রদূত গ্রে-এর সাথে মিটিং না হওয়া পর্যন্ত জাহাজের ভেতরেই থাকতে চায় সে। যেতে যেতে উপকূলের পাশে সাদা রঙের বিল্ডিং-এ ওষুধের একটা দোকান দেখতে পেয়ে জুডিথ আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। হাল বলল, “দোকানীটা নিশ্চয়ই এখানে জমজমাট ব্যবসা করছে। অসহায় অসুস্থ ভ্রমণকারীদের যার কাছ থেকে যেভাবে পারছে কায়দা করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে।”
হাল ভেতরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন অনুভব করল না। জুডিথ-এর জন্য বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল সে। জুডিথ ভেতরে গিয়ে দেখল বৃদ্ধ দোকানদারটি ছোট ছোট বস্তায় ভরা গুল্ম, বিভিন্ন মিশ্রণের বোতল বিভিন্ন রকমের ছোট ছোট ও নানান রকমের পাউডার আলমারির তাকে সাজিয়ে রাখছে। আলমারিটা দেয়ালের একপাশ থেকে অপরপাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিভিন্ন বোতল এবং বয়ামের গায়ে পরিষ্কারভাবে ওষুধের নাম এবং রোগের নাম লেখা রয়েছে। রক্ত পরিষ্কার করার জন্য সাছাফ্রাস রুট-এর চা, বাতের ব্যথার জন্য জিমসনউইড, হাপানির জন্য চেস্টনাট লিফ-এর চা, এরকম আরও নানান রকমের ওষুধ।
জুডিথ ব্যাখ্যা করে বোঝাল যে সে একজন মিসরীয়। কপটিক চার্চের একজন সদস্য। সে এখানে তার ইংরেজ বণিক স্বামীর সাথে নতুন জীবন শুরু করতে এসেছে। জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কয়েকদিন থাকার জন্য তারা একটা জায়গা খুঁজছে। দোকানীটি থাকার জায়গা খুঁজে দেয়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখাল। সে কারণে জুডিথও জানাল যে তার স্বামী থাকার জায়গার জন্য খুব ভাল দামই দিবে।
তাদের কাছে যে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা আছে, জিনিসপত্র কেনার মাধ্যমে সে ওটা এরইমধ্যে প্রমাণ করেছে। বেশ কয়েক ধরনের ওষুধ কিনেছে সে। বিভিন্ন স্বাদের চা কিনেছে এবং প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু মিশ্রণ কিনেছে-বেশ ভাল দামেই। জুডিথকে দেখে মনে হচ্ছে সে যদি সমুদ্রযাত্রার মাঝপথে এরকম দুই-একটা দোকান পায় তবে বেশ আনন্দেই সমুদ্রযাত্রা করতে পারবে।
“আমার খোঁজে কিছু ঘর আছে যেগুলোতে আমি আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। সেগুলো হয়ত খুব বেশি বড় নয়। আপনারা যেরকমটাতে থেকে অভ্যস্ত তার চেয়ে হয়ত একটু নিম্নমানের। তবে খুব একটা খারাপ নয়। নয়ত আমি আপনাদেরকে থাকার প্রস্তাব দিতাম না।”
“আমি কী ঘরগুলো দেখতে পারি?” জুডিথ জিজ্ঞেস করল।
“অবশ্যই, অবশ্যই…আমাকে একটু সময় দিন। আমি এখুনি সেটার ব্যবস্থা করছি।”
ওষুধের দোকানীটা খুব দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। কিছু সময় পরে জুডিথ বৈবাহিক কলহের শব্দ শুনতে পেল। দোকানীটা তার বউকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা চাইলেই তাদের বাড়িটা কয়েকদিনের জন্য ভাড়া দিতে পারে। এই কয়েকদিন তারা বাড়ির রাস্তা থেকে একটু দূরে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে থেকে আসলেই পারে।
জুডিথ বুঝতে পারল এই কলহের সমাধানে পৌঁছাতে একটু সময় লাগবে। তাই সে তার কেনা জিনিসপত্রগুলো বাইরে নিয়ে এল। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে লাগতে পারে এরকম দুই-একটা জিনিস রেখে দিল। হাল-কে মিষ্টি করে বাকি জিনিসগুলোর ব্যবস্থা করতে বলল। এই মিষ্টি করে বলার মানে হাল এতদিনে বুঝে ফেলেছে-”দিজ ইজ অ্যান অর্ডার।” হাল তার লোকদের বলল জিনিপত্রগুলো ডেট-এ নিয়ে যেতে।
জুডিথ ভেতরে ঢুকে আবার নানান রঙের বীজ, গুলু এবং সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা নানান রকমের পাতা দেখতে লাগল। এরইমধ্যে দোকানীটা ফিরে এসে বলল, “আসুন আমার সাথে।” এরপর গোমড়ামুখো বয়স্ক এক মহিলা তাকে মাঝারি ধরনের একটা ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। তিনটি রুম পরিপাটি করে সাজানো এবং পুরনো পাল দিয়ে ছাদের নিচে সিলিং দেয়া। ঘরের সামনের দিকে শহরের কিছু অংশ দেখা যায় এবং পেছন দিকে সাগর। সে জানে হাল যদি ঘরে বসেই তার জাহাজের ওপর দৃষ্টি রাখতে পারে তাহলে বেশ খুশিই হবে। আর সে নিজেও দোকানীর বউয়ের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দেখে বেশ খুশি হয়েছে। সবকিছু নিপুণ পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছে। একদিক থেকে সাগরের পরিচ্ছন্ন বাতাস এবং অন্যদিক থেকে বিভিন্ন গাছ গাছালি, লতাগুলুর সুবাস ঘরগুলোতে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করেছে।
