“ধন্যবাদ ম্যাডাম,” ট্রোম্প জুডিথকে উদ্দেশ্য করে বলল। জুডিথ নীরবে মাথা নেড়ে তার কৃতজ্ঞতার জবাব দেয়।
“কিন্তু আমি কিভাবে নিশ্চিত হব যে তুমি প্রথম সুযোগেই আবার জাহাজটা দখল করতে চাইবে না।” হাল জিজ্ঞেস করে। “তোমাকে দেখে মনে হয়েছে কর্তৃপক্ষের প্রতি তোমার শ্রদ্ধাবোধ কম। তাহলে তুমি কীভাবে আমার নাবিক হিসেবে কাজ করবে?”
ট্রোম্প হেসে ফেলে, যে হাসি তার চোখে প্রতিফলিত হয়। “আমি আমার জীবনের জন্য আপনার কাছে ঋণী। আপনি চাইলে আমাদের প্রথম সাক্ষাতের সময়েই আমাকে হাঙরের মুখে নিক্ষেপ করতে পারতেন।” এরপর সে হাল এর চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে। “সত্যি বলতে কী আপনার সাথে জাহাজ চালাতে পারলে নিজেকে বেশ সৌভাগ্যবান মনে করব।”
ট্রোম্প-এর কথাগুলো হাল অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনল। বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রোম্প যদি তার দেয়া কথা নাও রাখে তবুও বাউ-এর নাবিকদের কাছ থেকে জাহাজ কেড়ে নেয়া এই ওলন্দাজ লোকটার পক্ষে অসম্ভব। এছাড়াও তার জাহাজে এখন নাবিকের সংকট রয়েছে। তাই এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক নিলে খুব একটা মন্দ হয় না।
“আপনি কী মনে করেন মি. পেট? মি. ট্রাম্প এবং তার নাবিকদের কী আমার জাহাজে নাবিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া উচিত?”
পেট শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “এটা আমার মতামত দেয়ার বিষয় নয়। ক্যাপ্টেন।” এরপর সে চোখের জোড়া উপরের দিকে তুলে বলে। “কিন্তু আপনাদের নাবিকদের মধ্যে অনেক কুসংস্কারও রয়েছে। আপনি যদি এরকম ভাগ্যবান ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন তাহলে সেটা হয়ত জাহাজের জন্য ভাল বয়ে আনতে পারে।”
“ভাগ্যবান? কিন্তু কীভাবে মি. পেট?” হাল জিজ্ঞেস করে।
“অবশ্যই, ভাগ্যবান”, পেট তার কথায় জোর দিয়ে বলে। প্রথমত, সে আমাকে বিশ গজ দূর থেকে আঘাত করেছিল। আমরা দুজনেই চলন্ত ডেক এর ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। দ্বিতীয়ত, আমার গুলিটা এভাবে ব্যর্থ হওয়ার কথা। ছিল না। আমি সাধারণত এ ধরনের ব্যর্থতায় অভ্যস্ত নই।”
“একজন ব্যবসায়ীর তুলনায় কথাগুলো বেশ অদ্ভুত, মি. পেট, হাল পেটকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“আমি তো আপনাদেরকে বলেছিলামই যে, আমার বাবা আমাকে বন্দুক চালনা শিখয়েছিলেন। তিনি খুব ভাল প্রশিক্ষক ছিলেন এবং আমাকে বেশ ভালভাবেই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আমাকে ব্যর্থ হতে দেখলে তিনি নিশ্চয়ই খুশি হতেন না।”
“ও আচ্ছা, হাল পেট-এর দিকে তাকিয়ে বলল। এই লোকটার মাঝে এমন কিছু আছে যেটার কারণে হাল খুব বিরক্ত হচ্ছিল। শুধু যে সে-ই খুব বিরক্ত হচ্ছে তাই না। সে তার নাবিকদেরও পেট-এর ব্যাপারে আলোচনা। করতে শুনেছে। গুলি করার সময়ও সে ইচ্ছেকৃতভাবে সময় নিয়েছিল প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। যুদ্ধবিদ্যা সম্পর্কে ধারণা না থাকা একজন ব্যবসায়ীর বন্দুকের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় এইরকম স্থিরচিত্ত মনোভাব একদমই মানায় না। স্বাভাবিকভাবেই হাল চায় না যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক মিনিটও লোকটা এই জাহাজে থাকুক।
“আচ্ছা ঠিক আছে মি. ট্রোম্প, আমি প্রস্তাবে রাজি,” হাল বলতে থাকে। “আমি তোমাকে আমার সেকেন্ড মেট হিসেবে নিয়োগ দিতে রাজি আছি। আমি খুব খুশি হব যদি তুমি তোমার লোকদের একটা তালিকা তৈরি করে তাদের বিশেষ দক্ষতা সম্পর্কে লিখে আমাকে দাও।”
ট্রোম্প-এর চেহারায় হাসি ফুটে ওঠে। “আপনি আপনার সিদ্বান্তের জন্য অনুতাপ করবেন না। ক্যাপ্টেন কার্টনি।”
হালও হেসে ফেলে, “তবে তার কথায় কোনো কৌতুক ছিল না। তুমি আশা করতে পার, আমি সেটা করব না। আমি তোমার ওপর বিশ্বাস রেখেছি। তবে তুমি যদি আমার বিশ্বাস ভঙ্গ কর তবে মনে রেখ সেটার জন্য তোমাকে অনুতাপ করতে হবে।”
“আমার নজর সবসময় তোমার ওপর থাকবে, ডাচম্যান,” অ্যাবোলি বিড়বিড় করে বলতে থাকে।
“গুড, তাহলে অন্তত আপনি দুয়েকটা জিনিস শিখতে পারবেন।” ট্রোম্প অনেকটা বিদ্রুপাত্মক স্বরে বলল। এরপর যেতে যেতে অ্যাবোলির দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“সাবধানে কথা বল মি. ট্রাম্প,” হাল সতর্ক করে দিল সাথে-সাথে। “একটা ঝামেলা মাত্র শেষ হয়েছে। আমি চাচ্ছি না যে তোমার কারণে আরেকটা ঝামেলা হোক।”
“হা-হা ক্যাপ্টেন, ট্রোম্প দ্রুত জবাব দিল।
.
হাল-এর জন্য স্বস্তির ব্যাপার এই যে মি. ট্রোম্প নিজের যোগ্যতা বেশ ভালভাবেই প্রমাণ করছে। তারা দুজনে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে চার্ট দেখছে। ওলন্দাজ লোকটি উপকূল সম্পর্কে তার সমস্ত অভিজ্ঞতা হাল-এর সাথে শেয়ার করেছে যেন তাদের দুজনের একত্রিত জ্ঞান ভবিষ্যতের জন্য অমূল্য কিছু বয়ে আনতে পারে।
তবে খুব শীঘ্রই ট্রোম্পকে এলিফ্যান্ট লেগুন এবং এর গুপ্তধন সম্পর্কে বলার ইচ্ছে নেই হাল-এর। কিন্তু তারা যে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে, সেটা তাকে না বললেও সূর্যের দিকে একবার তাকিয়েই সে ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে। সে জাঞ্জিবার এবং কেপ-এর মাঝে নিরাপদ কিছু জায়গা চিনে যেখানে তারা নিরাপদে নোঙর ফেলতে পারবে। সেখানে ওমানি আরব সৈন্য বা মাদাগাস্কান দস্যুদের আক্রমণের কোনো ভয় থাকবে না।
ডেফট-এর নাবিকেরাও বেশ কাজ করছে। এমনকি নেড টেইলর-এর মতো অভিজ্ঞ নাবিকও বিরক্তির সাথে খেয়াল করল যে এই লোকগুলো আসলেই অনেক বেশি কর্মঠ। তারা সারা দিন কাজ করে; প্রধান মাস্তুলের ওপর উঠা-নামা করে, এরপর জাহাজ-এর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ায় কাজের খোঁজে, এরপর আবার নিচের ডেকে চলে যায় নতুন কাজ করার জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের শরীর বেয়ে ঘামের পানি চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে, তাদের শরীর সোজা করেই দাঁড় করাতে কষ্ট হয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা থামে না।
