“এখনই সময়…” সেই সিদ্ধপুরুষ কণ্ঠটির প্রতিধ্বনি পেট অবশেষে শুনতে পায়। তার পথপ্রদর্শক এবং তার রক্ষাকর্তা তার সাথেই আছে। তাই সবকিছুই ভাল ভাবে সম্পন্ন হবে।
সিঁড়ির পেছন থেকে বেরিয়ে আসে উইলিয়াম পেট, এরপর আস্তে আস্তে ক্যাপ্টেন কার্টনির কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়। ডান বাহু উঁচু করে ধরে লম্বা পাতের মতো অস্ত্রটা তার জামার হাতার নিচে রেখে দেয় পেট। এরপর আঙুল দিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝ থেকে মোটা পিনটা বের করে আনে, তারপর সেটাকে আস্তে আস্তে তালার ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। খুট শব্দ করে তালা খুলে যায়।
সাথে-সাথে তার মনে একটা ভাবনার উদয় হয়। যখন ডেফট-এর নাবিকরা তাকে সাগর থেকে টেনে তুলেছিল তখন থেকেই কি তার রাস্তা পরিষ্কার ছিল না? আর যুবক কার্টনি কী সবার জন্য ভুরিভোজ-এর আয়োজন করেনি?
“তুমি কী মনে কর যে আমরা সবকিছু করি শুধু তোমার জন্যই?” কণ্ঠটি জিজ্ঞেস করল।
এরপর পেট খুবই ধীরে ধীরে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা ভেতরের দিকে খুলে ফেলল। ভুল ক্রমেও সে হাতল ধরে ধাক্কা দিল না। কারণ কোনরকম শব্দে যদি কার্টনির ঘুম ভেঙ্গে যায় তাহলেই সব নিঃশেষ হয়ে যাবে।
ভেতরে ঢুকে সে দেখতে পায় কার্টনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়ে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। কোনো সন্দেহ নেই যে ক্যাপ্টেন কার্টনিও তার বাবার মতোই লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্প। তার স্ত্রী তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে। তার মুখ কার্টনির গলার বিপরীতে রাখা আছে। তার গায়ে থাকা সাদা রঙের পোশাক তার পা এবং বাহুতে একটা রঙের শেড তৈরি করেছে। পেট কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, তারপর আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যায়।
তার পায়ের নিচ থেকে কাঠের মড়মড় আওয়াজ হয়। সাথে-সাথে সে ঝুঁকে পড়ে স্থির হয়ে যায়।
জুডিথ নড়াচড়া করে উঠে, এরপর আরাম করে শোয়। কিন্তু সে জেগে উঠে না। এরকম পরিস্থিতিতে কোনো অনভিজ্ঞ লোক হয়ত দুশ্চিন্তায় পড়ে যেত। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যেত। কিন্তু পেট-এর শ্বাসপ্রশ্বাস এখনো স্বাভাবিক আছে। বিছানার চারদিকে ঘুরতে-ঘুরতে কার্টনির মাথার পাশে এসে দাঁড়ায় পেট। কার্টনি তখন চিৎ হয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল।
পেট তার পেটের পেশি শিথিল করে নিঃশব্দে একটা গাঢ় শ্বাস নেয়। যেন রক্তে অক্সিজেন ঢুকিয়ে পরিপূর্ণ শক্তি পায়। সেইসাথে কাউকে খুন করার আগে যে দুশ্চিন্তা আসে সেটা দূর করার চেষ্টা করে।
কার্টনির শ্বাস-প্রশ্বাস আরও গম্ভীর হতে থাকে। এদিকে পেট তার জামার হাতার নিচ থেকে স্টীলের মারলিনস্পাইকটা বের করে। সেটাকে শক্ত করে ডান হাত দিয়ে ধরে আঘাত করার জন্য হাতটা পেছনে নেয়। যদিও মারলিনস্পাইকটা আঘাত করার জন্য বেশ উপযুক্ত কিন্তু এর তীক্ষ্ণতা কাউকে কাটার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই পেটকে যথেষ্ট শক্তি দিয়ে কাজটা করতে হবে। বিছানার ওপর ঝুঁকে পড়ে বাম হাত দিয়ে কার্টনির মুখ বন্ধ করে ডান হাত দিয়ে খুঁতনির হাড়ের নিচে তীব্রভাবে আঘাত করতে হবে। কানের একটু নিচ দিয়ে যেন সরাসরি ক্যারোটিও আর্টারিকে ভেদ করে চলে যায় পাইকটা। তখন হয়ত তার শরীর, বিছানার চাদর, এমনকি পেট-এর শরীরও রক্তে ভেসে যাবে। তার পাশে শুয়ে থাকা মেয়েটিও হয়ত রাতে দুঃস্বপ্ন দেখার মতো করে ভয়ে জেগে উঠবে। তখন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাকেও একের পর এক আঘাত করতে হবে যেন সে চিৎকার করার সময়ও না পায়।
ঠিক তখনই এক চিলতে চাঁদের আলো কেবিন-এর ভেতরে প্রবেশ করল। পেট জাহাজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। একটা মেঘ খণ্ড হয়ে দুদিকে সরে গিয়ে কিছু তারাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে, রুপালি চাঁদের আলো ক্যাপ্টেন এর কোয়ার্টার-এ প্রবেশ করেছে যার প্রভাবে পেট-এর শিরায় প্রবাহিত রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। তখনই পেট কার্টনির বিছানার পাশে টেবিলের ওপর সোনালি কভার-এ মোড়ানো একটা বাইবেল দেখতে পায়।
আর সাথে-সাথেই পেট-এর মনে একধরনের তছনছ শুরু হয়। সেই সাথে তার মন ভেসে যায় সেই সময়ে যখন সে জ্বলন্ত আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড থেকে সাগরে লাফ দিয়েছিল। এটা কী সেই দৈববাণী থেকে কোনোরকম ইঙ্গিত? এভাবেই কী ঈশ্বর হেনরি কার্টনিকে ছেড়ে দেয়ার কোনো ইশারা করছেন? অবশ্যই না। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো সেই দৈব কণ্ঠ এখনো পর্যন্ত চুপচাপ রয়েছে। সাধারণত এই সময়ে তার পরিষ্কার কণ্ঠ শোনা যায়।
পেট দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, এরপর পা দিয়ে মেঝেতে মৃদু আঘাত করতে থাকে। একটু একটু করে ঘামতে থাকে সে। কপাল চুঁইয়ে সেই ঘামের পানি পড়তে থাকে মেঝেতে।
“কিছু একটা ইঙ্গিত করুন, যাতে আমি বুঝতে পারি যে আপনি কার্টনির হত্যার ব্যাপারে সায় দিচ্ছেন,” পেট মনে মনে বলে উঠল।
মেঘ খণ্ড দুটো আবারও জোড়া লেগে গিয়ে হাল-এর কেবিনকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল। কিন্তু পেট যা দেখেছে তা এখনো ভুলতে পারছে না। এরকম মুহূর্তে খ্রিস্টের ক্রস যেভাবে আলোকিত হয়ে উঠেছে সেটা যে কোনো স্বর্গীয় ইঙ্গিত ছিল, সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা কী কাউকে হত্যা করার জন্য নাকি কাউকে বাঁচানোর জন্য?
কিন্তু সে খুবই কাছাকাছি চলে এসেছে। যেকোনো মুহূর্তে কাজটা করে ফেলা সম্ভব। মাংস ভেদ করে দুটো তীক্ষ্ণ আঘাত করতে পারলেই তার কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু তার কাছে কিছু একটা ভুল মনে হচ্ছে। জীবনে সে বহুবার খুন করেছে। কিন্তু এই প্রথমবার তার মনে এমন সন্দেহ হচ্ছে। যদি ঈশ্বরের এমন কোনো ইচ্ছে থাকে যে তিনি এই লোকটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছেন, তবে তাকে অবশ্যই থামতে হবে। কিন্তু সে যদি এখন খুন না করে তবে তার মনে কতটা গোলমাল দেখা দিবে কে জানে!
