অবশ্য পেটকে এসব ভাবলে চলবে না। তাকে যেভাবেই হোক এই কাজ করতে হবে। সেই দৈব বাণী যদিও এখন পর্যন্ত তার মস্তিষ্কে যে আওয়াজগুলো তুলছে সেগুলো বেশ অস্পষ্ট, কিন্তু সে জানে যে এটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই গভীর ইচ্ছাটা সে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে না। আর এই কাজ করা যে সম্ভব, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। সে এই কাজ সম্পন্ন করবে নীরবে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে। সে ভাবছে যে গতবারের মতো একইরকমভাবে ক্যাপ্টেন-এর বিছানাটাকে সাগরের বুকে নিজের অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করবে। গত কয়েকদিন ধরে সে আফ্রিকার উপকূল প্রত্যক্ষ করেছে। সে নিশ্চিত যে সে খুব সহজেই সেখানে পৌঁছাতে পারবে। ওটায় চড়ে ভাসতে ভাসতে সাগরের এক পাশে চলে যাবে। ক্যাপ্টেন কার্টনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই উপকূলে পৌঁছে যাবে সে।
কিন্তু একজন নারীকে হত্যা করাটা…এ ব্যাপারে সে একটু দুশ্চিন্তায় রয়েছে কারণ সে এর আগে কখনোই এই কাজ করেনি। সে নিজেকে একজন সভ্য মানুষ হিসেবে দাবি করে, এ নিয়ে গর্বও করে। পেট-এর মতে নারী জাতি অত্যন্ত কোমল এবং নমনীয় তাই তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মানায় না। সাথে-সাথে একটা কণ্ঠ তার সাথে তর্কে লিপ্ত হলো। “এই নারী মোটেও কোমল এবং নমনীয় নয়। সে তার নিজের ইচ্ছায় যুদ্ধে গিয়েছে। সে পুরুষের পাশাপাশি কুচকাওয়াজ-এ অংশ নিয়েছে, যুদ্ধ করেছে। যদি সে এগুলো করতে পারে তবে তার সাথে খেলা ভালই জামবে।”
মেয়েটা হয়ত ভাবছে যে সে তার ঈশ্বরের ইচ্ছায় তার দেশ, তার পবিত্র ভূমির জন্য লড়াই করতে এসেছে। কিন্তু পেট যেটা করছে সেটাও তার কাছে পবিত্র কাজ। আরও অনেকে আছে যারা মানুষ হত্যা করে। সে জানে এটা। কিন্তু তারা কেউই কাজটা তার মতো ভালভাবে সম্পন্ন করতে পারে না। সে তার কাজ নিয়ে গর্ববোধ করে। যখন অন্যান্য বাচ্চা পিন হেড বা অন্যকিছু নিয়ে খেলা করত সে তখন তলোয়ার চালনা বা স্টীল-এর স্লিং নিয়ে খেলা করত। ঐ বয়সে বিভিন্ন বিষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে খেলা করত সে। দক্ষ হাতে কিভাবে বিভিন্নভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া যায় সেটা নিয়ে পড়াশোনা করত। ক্যাপ্টেন কাটনি আর জেনারেল নাজেত-এর জীবন কেড়ে নেয়া হচ্ছে তার কাছে অন্যরকম একটা পরীক্ষা।
এবং এখনও পর্যন্ত পেট কোনোটাতেই অকতকার্য হয়নি। এ কাজের জন্য সে অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে মার্লিনস্পাইক নামক লম্বা স্টীলের পাত-এর মতো একটা জিনিস যেটা জাহাজের নাবিকেরা রশি বাঁধতে ব্যবহার করে। গোল্ডেন বাউ-এ আসার পরপরই সে এটা চুরি করেছে। প্রতিনিয়ত সে এটায় শান দেয়- যখনই সে একা থাকে। এটাকে এতটাই ধারালো করতে হবে যেন এটা খুব সহজেই মানুষের চামড়া এবং পেশি ভেদ করে কোনো অঙ্গের ভেতর ঢুকে যায়।
পেট এটাকে তার জামার ডান হাতার নিচে লুকিয়ে রাখে। এমনভাবে রাখে যেন একেবারে বাহুর সাথে লেগে থাকে। এছাড়া তার কাছে আরেকটা ছোট্ট অস্ত্র আছে-জাহাজের পেরেক, যেটা সে তার দুই ঠোঁটের মাঝে রেখে দিতে পারে। সে এখনই ক্যাপ্টেন-এর কোয়ার্টার-এর দিকে এগুতে চাচ্ছে না। ধীরে-সুস্থে ভেবে-চিন্তে তারপর এগুতে চায় সে। আগে জেনে নিতে চায় যে জাহাজের ওপর এমন কিছু বা এমন কেউ আছে কি-না যে তার কাজের জন্য হুমকিস্বরূপ।
তারা ভরা রাতে পেট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কাজের পরিকল্পনা করছে। জ্যোৎস্না রাতের মৃদু আলোতে সে যখন কোয়ার্টার ডেক-এ দাঁড়িয়ে ছিল তখন একটু দূর থেকে ফিসফিস করে কথা বলা কণ্ঠের আওয়াজ শুনতে পায় সে। পেট সাথে-সাথেই চিনতে পারে-এটা অ্যাবোলি নামে সেই আফ্রিকান লোকটার কণ্ঠ। প্রধান মাস্তুলের নিচে দাঁড়িয়ে আফ্রিকান লোকটা অন্যান্য অ্যামাডোডা সৈন্যদের গল্প বলছে। দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো কথা বলা সিংহ সম্পর্কে গল্প করছে। বাহুদুটো ছড়িয়ে দিয়ে হাত দুটোকে থাবার মতো করে রেখেছে লোকটা।
এমন সময় সে কারও এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পায়। তার পেশি শক্ত হয়ে যায়। নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যায় সে। কেউ একজন এগিয়ে আসছে। সম্ভবত উইল স্ট্যানলি তার রাতের ভ্রমণ শেষ করছে। পেট কোয়ার্টার ডেক এর মই-এর পেছনে লুকিয়ে পড়ে। ভয়ে জমতে থাকে ও। সে চায় না স্ট্যানলি এখন তাকে জিজ্ঞেস করুক যে এই মধ্যরাতে সে এখানে কি করছে।
স্ট্যানলি তাকে লক্ষ না করে রেলিং-এর দিকে এগিয়ে যায়। পেছন দিকে হাত দুটো রেখে সে কিছুক্ষণ সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক কদম এগিয়ে গেলেই পেট তার কাছে চলে যেতে পারে। তার লম্বা স্পাইকটা লোকটার কিডনির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে মৃতদেহটা তার নিজের কেবিনে লুকিয়ে রাখতে পারে।
কিন্তু কোনোভাবে যদি স্ট্যানলি হাত থেকে ফসকে যায় আর সবাই সজাগ হয়ে উঠে, তবে কী হবে? তখন সে কার্টনি আর জুডিথকেও হত্যা করতে পারবে না।
স্ট্যানলি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে জাহাজের সম্মুখভাগের দিকে তাকায়। তার কপাল কুঁচকানো বিস্ময় ভাবটা অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পেট জানে না যে স্ট্যানলি আসলে কী দেখেছে বা কী দেখতে পায় নি। তার চেয়ে বড় ব্যাপার স্ট্যানলি বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে। একটু পর ডেক-এর নিচে নেমে গেল সে। পুরোটা সময় পেট তার নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল।
