“তারা তোমার কথা বিশ্বাস করল”, হাল বিস্ময়াবিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“ওহ, তারা সেটাই বিশ্বাস করে যেটা তারা চায়। তারা সবাই ইস্ট ইন্ডিস-এ পচে গলে মরতে চাচ্ছিল না। তারা সবাই বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিল। আমি তাদেরকে বলেছি যে আমি তোমাদেরকে হল্যান্ড-এ ফিরিয়ে নিয়ে যাব। অনেক সোনাদানা টাকা-পয়সা এবং মেয়ে মানুষ তোমাদের হাতে থাকবে।”
ট্রোম্প এমনভাবে কথা বলছিল যেন সবকিছু তার চোখের সামনে ভাসছে। হাল ধারণা করার চেষ্টা করছিল সেই নাবিকের দল কী পরিমাণ অশিক্ষিত ও মূর্খ ছিল, যাদেরকে ধনী করার আশ্বাস দিয়ে এভাবে ভোলানো সম্ভব।
“তারা সবাই কী ডেফট-এর নাবিক ছিল?” হাল জিজ্ঞেস করে।
“অবশ্যই”, ট্রোম্প উত্তর দেয়। “তো সেই দিন ঘনিয়ে আসতে লাগল। আমার দুশ্চিন্তা বেড়েই চলল। আমি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম নেটিভটা যদি সময়মত ধর্মীয় ধ্বংসাবশেষ-এর প্রতিলিপিগুলো তৈরি করতে না পারে তাহলে আমি এখানে ক্রিস্টিনা ও তার বাবার কাছে ধরা পড়ে যাব। কিন্তু বিয়ের দুইদিন পূর্বে সেগুলো প্রস্তুত হয়ে যায়। আমি সেগুলো বক্সে ভরে জাহাজে উঠানোর জন্য প্রস্তুত করে রাখি। ডেট আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। জাহাজে উঠার পর যখন জাহাজ ছেড়ে দেয় তখন আমরা মুক্ত, ট্রোম্প টেবিলের চারদিকে সবার দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে। সবাই একটু একটু করে ঝুঁকে বসে যাতে তারা গল্পের প্রতি আরও বেশি করে মনোযোগ দিতে পারে। “ডেট একটা বিশেষ ধরনের জাহাজ ছিল। ওটা নেভী জাহাজও ছিল না আবার ইস্ট ইন্ডিয়ার জাহাজও ছিল না। সেটা ছিল এডমিরাল-এর জাহাজ, ত্রিস্টিনার বাবার অত্যন্ত পছন্দের জাহাজ।”
ট্রোম্প সবার মনে যে দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল সেটা হাসিতে রূপ নেয়। টেবিলের চারদিক থেকে অট্টহাসির আওয়াজ শোনা যায়। “আমি তোমাকে স্যালুট করলাম, ক্যাপ্টেন,” অ্যাবোলি তার কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলতে থাকে। “তুমি প্রথমে তার কন্যাকে হাত করলে। তার কুমারিত্ব নষ্ট করলে। এরপর তুমি…”
“আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই,” ট্রোম্প বলতে শুরু করে, “কেননা প্রথম দিকে সে যে ধরনের আচরণ করছিল তাতে আমার মনে হয়নি সে কুমারী।”
“তুমি তার পেটে তোমার বীজ বপন করেছ, এরপর তাকে অসম্মান করেছে তার মা-বাবা এবং তার সমগ্র জাতির সামনে। তারপর তুমি পালিয়ে এসেছ তার বাবার জাহাজ নিয়ে। তোমার তো মরে যাওয়া উচিত ছিল। যদি তুমি এটা আমাদের উপজাতির প্রধান মনোমাতাপার সাথে করতে তবে সে তোমার পেছনে তার সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধাকে পাঠাত। তারা তোমাকে খুঁজে বের করে হত্যা করত এবং…” অ্যাবোলি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। “তারা তোমাকে আস্তে আস্তে মৃত্যু যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করত-যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার প্রাণবায়ু বের হয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত।”
“বিশ্বাস করুন, ক্যাপ্টেন ট্রাম্প বলল। “ক্রিস্টিনার বাবাও ঠিক এমনটাই ভেবেছিল। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি তিনি বাতাবিয়ার প্রত্যেকটা জাহাজকে বলেছেন আমাকে খুঁজে বের করার জন্য। তিনি আমার মাথার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন। তাই এখন এটা আপনাদের বিবেচনার বিষয় ক্যাপ্টেন। যদি আপনি আমাদেরকে ওলন্দাজদের হাতে সমর্পণ করেন তবে মৃত্যু অনিবার্য। এদিকে আপনাদের জাহাজ বেশ কয়েক মাস যাবত যুদ্ধ করেছে। আপনারা অনেক মানুষ হারিয়েছেন। যে কারণে আপনারা জাহাজটা চালিয়ে নিতে পারছেন তা হলো আপনারা আফ্রিকান যোদ্ধাদেরকে নাবিক হিসেবে নিয়েছেন। কিন্তু তারা এখানকার অধিবাসী। আপনারা শিঘ্রই কেপ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। এরপরই রয়েছে আটলান্টিক। সেখান থেকে আপনারা ইংল্যান্ড এবং হল্যান্ড-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন হয়তো বা। “আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে বলব, আপনারা নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরতে চান ক্যাপ্টেন কার্টনি। আপনার নিশ্চয়ই এমন নাবিক প্রয়োজন যে কি-না উত্তরের ঠাণ্ডা পানি সম্পর্কে জানে। সেক্ষেত্রে আপনারা আমাকে এবং আমার নাবিকদের নিতে পারেন…যদি আপনারা আমাদেরকে নেন তাহলে আমরা আপনাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেব।”
*
পেট সেই কণ্ঠ শুনতে পায়। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ওগুলো। সকখনো কখনো তারা একত্রে কথা বলে উঠে। আবার কখনো কত পার্লামেন্ট-এর মতো একের পর এক কথা বলতে থাকে। এসব কণ্ঠের চেয়েও তার মনে যে তীব্র বাসনা কাজ করছে তা হল কাউকে খুন করার বাসনা। যদিও দৈববাণীর উপস্থিতি এটার একটা অংশ। না, এর চেয়ে বেশি কিছু তার অনুভব করার প্রয়োজন নেই। এটা তার রক্তে মিশে আছে। তার হাড়ে গেঁথে আছে।
সে জানে না যে ঠিক কোন জিনিসটা তার মধ্যে এই অনুভূতি নিয়ে আসে। কিন্তু এটা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে। “এত শীঘ্রই কেন?” সে নিজেকে প্রশ্ন করে। কিন্তু কোনো উত্তর পায় না শুধু মেনে নেয়া ছাড়া।
মাত্র কিছুদিন আগে ডেট-এ সে তার সাথে থাকা বন্দি লোকটাকে শ্বাসরোধ করে মেরেছে। এ ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বে গোডিংস তার হাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। আস্তে আস্তে ঘটনাগুলোর মধ্যবর্তী সময় কমে যাচ্ছে। সে যতই হত্যা করছে প্রতিটা মৃত্যু নিয়েই ততই অতৃপ্তি তার মধ্যে কাজ করছে। এখন আবার তার সেই ইচ্ছাশক্তি, তার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা স্পৃহা, তাকে সেই ঘটনা ঘটানোর দিকে ধাবিত করছে। সেটা এতই তীব্র যে একসাথে দুটি খুন করারও হয়তো প্রয়োজন পড়তে পারে। কেবল তাহলেই হয়ত সেটা কিছুদিন লুকিয়ে থাকবে। তার সেই শিকার দুটি তার কেবিন থেকে অল্প কিছু দূরে পাশাপাশি শুয়ে আছে। ক্যাপ্টেন কার্টনি আর নাজেতকে একত্রে হত্যা করা অবশ্যই একটা বড় ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে। প্রথমত, তারা দুজনেই খুব ভাল যোদ্ধা। নিজদেরকে রক্ষা করার ক্ষমতা আছে তাদের। এছাড়াও, তাদের তলোয়ার চালানোর দক্ষতা হয়ত পেট-এর দক্ষতাকে ছাড়িয়ে যাবে। এরপর আসে আরেকটা ব্যাপার। ক্যাপ্টেন গোডিংস কিন্তু আগুনে পুড়ে মারা যায় নি। মারা গিয়েছিল তারই ছুরির আঘাতে। সেই ছুরির ব্যবস্থা তাকে সেই জাহাজের লোকদের কাছ থেকেই করতে হয়েছিল। এই ক্যাপ্টেন এবং তার লেডি জাহাজের নাবিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাই সেই ব্যবস্থা করা এখানে খুব একটা সহজ হবে না।
