সবার মুখে একটা উজ্জ্বলতা ফুটে উঠে কেননা সবাই বুঝতে পারে কেন ক্যাপ্টেন কার্টনির বিছানাটা চওড়া, পেট ব্যাপারটার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ না করে আবার বলতে শুরু করে। “আমি জানতাম যে আমাকে কী করতে হবে। আমি প্রথমে জাহাজের জানালাটা চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলি। এরপর আমি বিছানাটা সাগরের বুকে ছুঁড়ে দেই এবং এর পরপরই আমি নিজে লাফ দেই। কারণ আমি সাঁতার কাটতে জানি না…”
সবার হাসির উজ্জ্বলতা একটা বিস্ময়ে রূপ নেয়। কিন্তু কীভাবে…?” বিগ ডেনিয়ে বলে।
“আমি জানি। আমি নিজেকেও একই প্রশ্ন করেছি। আমি কিভাবে সাগরের বুকে এই বিছানা খুঁজে পাব, সেই সাথে নিজের পথ করে নিব? সত্যি বলতে, আমার কোনো পূর্বধারণাই ছিল না…”
এইটুকু অন্তত নির্ভেজাল সত্য, পেট মনে মনে চিন্তা করল। এরপর আবার বলতে শুরু করে দিল। আমি যেটুকু বলতে পারি তা হচ্ছে, “লাফ দেয়ার পর আমি নিজেকে ভাসমান বিছানার ওপর দেখতে পাই। এর কিছু সময় পর উজ্জ্বল আলো দেখতে পাই আমি। এতটাই উজ্জ্বল যে মনে হচ্ছিল সূর্য থেকে সরাসরি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আমার চোখ প্রায় পুড়ে যাবার অবস্থা। এর কয়েক সেকেন্ড পরেই খনিজপদার্থ বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ পেয়েছিলাম। এত তীব্র যে আমার প্রায় বধির হয়ে যাবার মতো অবস্থা হয়েছিল আরকি। কিন্তু সময় যত যেতে থাকে শব্দের তীব্রতা ততই কমতে থাকে। একসময় সব চুপচাপ হয়ে গেল। অদ্ভুত রকমের শান্ত, নীরবতা চারদিকটাকে ঘিরে ফেলে। জাহাজ এবং জাহাজের সমস্ত মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তাদের কোনো চিহ্নই আর সাগরের বুকে থাকে না।”
পেট-এর এরূপ ভয়াবহ বর্ণনা শুনে টেবিলের চারপাশে বসা সবার মাঝেও ভয়াবহ নীরবতা নেমে আসে। এরপর পেট তার গল্পের উপসংহারে চলে আসে। “বাতাস আর তরঙ্গের স্রোতে ভাসতে থাকি আমি-ডেফট-এর লোকদের চোখে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত। তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
“আচ্ছা আমরা সবাই জানি যে এরপর কি ঘটেছিল।” হাল গল্পের সমাপ্তি টানতে চায় যেন আবার সবার মাঝে কোনোরকম তর্ক-বির্তক শুরু না হয়। “এখন আমরা সবাই এখান থেকে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছি…।”
“এক্সকিউজ মি, ক্যাপ্টেন”, ট্রোম্প বাধা দেয়।
“বলুন?”
“আপনি আমাকে নিজের গল্প বলতে বলেছিলেন।”
“হা, কিন্তু সেটার জন্য আমাদেরকে আগামীকাল রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।”
“আমার গল্প খুবই ছোট্ট, ক্যাপ্টেন।”
“ক্যাপ্টেন তাকে এখনই সুযোগ দিন”, নেড টেইলর বলে উঠে।
“যদি বেশি ছোট হয়, তাহলে আমরা নিজেরাই তার সাথে কিছু যোগ করে বড় করে নেব।” বিগ ডেনিয়েল বলল।
“যেহেতু ক্যাপ্টেন ট্রাম্প-এর গল্প খুবই ছোট তাহলে বরং আমরা এখনই তা শুনে ফেলি। সবাই মনে হচ্ছে এখনই শুনতে চাচ্ছে। শুরু করুন ট্রোম্প,” হাল ট্রোম্প-এর উদ্দেশ্যে বলে উঠল।
ট্রোম্প টেবিলের সবার দিকে একবার করে তাকায়। এরপর গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করে। “বাতাবিয়ায় একটা মেয়ের সাথে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তার নাম ছিল ক্রিস্টিনা। সে ছিল এডমিরাল-এর কন্যা।”
টেবিলের অন্যান্যের মতোই হাল-এর কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছিল। বাউ-এর নাবিকেরা তাদের নিঃশ্বাসের সাথে নানা রকম আওয়াজ করেই চলছিল। জুডিথ যদিও সেদিকে কান দিচ্ছিল না কিন্তু তার ঠোঠে হাসি খেলা করছিল।
“বলতে থাকুন”, হাল বলল।
ট্রোম্প আবার বলতে থাকে, “আমার পুরনো ভালবাসার গল্প। আমরা কখনো নাচতাম, কখনো বা হাসতাম, পরক্ষণেই আবার ভালবাসায় মেতে উঠতাম…সে তার এক চোখের ভ্রু উঁচু করে বলল। এরপর সে একদিন আমাকে বলে যে তার গর্ভে আমার সন্তান আছে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো সে এটা তার বাবাকেও বলে দিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম তার বাবা পাউডার ভর্তি শট ফিউজ-এর মতো ফেটে পড়বে। তিনি আমাকে জাহাজের একজন অফিসার হিসেবে পছন্দ করতেন। কিন্তু নিশ্চয়ই এমন একজন হিসেবে নয় যে তার মেয়ের গর্ভে বীজ বপন করবে।”
“তো, সে কি ওভাবেই ফেটে পড়েছিল?” হাল জিজ্ঞেস করে।
ট্রোম্প মাথা নাড়ায়। “না, তার চেয়েও খারাপ। তিনি বলেছিলেন যে আমাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মেনে নেয়ার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। কিন্তু এখন তার হাতে অন্য কোনো উপায় নেই। আমাকে এক সপ্তাহের মধ্যে সেই মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।”
“তারপর আপনি পালিয়ে আসেন।”
“আমি ক্রিস্টিনাকে ভালবাসতাম না, আর ক্রিস্টিনাও আমাকে ভালবাসত না। আর তাই আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রথমে আমি এডমিরাল-এর কাছে গেলাম। গিয়ে তাকে বললাম যে, আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করব। কিন্তু সেটা সঠিক নিয়মে কোনো চার্চে গিয়ে। উৎসব হবে, খাওয়া-দাওয়া হবে। যেন লোকজন এটাকে সত্যিকার ভালবাসা মনে করে। আর এর জন্য অন্তত আমাদের দুটি সপ্তাহের প্রয়োজন হবে। সে প্রথমে রাজি হতে চাচ্ছিল না। কিন্তু পরে ভেবে দেখল যে আমার কথায় যুক্তি আছে। এটা তার এবং তার পরিবারের সম্মান বাঁচাবে।” এরপর আমি বাতাবিয়ার এক কারিগর-এর কাছে গিয়ে বললাম, “আমাকে এই নকশাগুলো বানিয়ে দিন। অন্তত প্রত্যেক রকমের ছয়টা করে। তারপর দশ দিনের মধ্যে আমি যে জাহাজে চাকরি করতাম সেখানে গেলাম। সেখানকার সব নাবিককেই আমি চিনতাম। তাদেরকে বললাম যে আমার একটা পরিকল্পনা আছে। আমার সাথে কাজ কর তাহলে ধনী হয়ে যেতে পারবে।”
