টেবিলের চারপাশ থেকে এক ধরনের আক্ষেপ ধ্বনি শোনা যায়। যারা সবসময় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, শত্রুর আশেপাশে বাস করে তাদের আর্তনাদ যেন কেবিন জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। নেড টেইলর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হাল তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকায় যে সে মুখ বন্ধ করে ফেলতে বাধ্য হয়।
“এরপর আর কোনো বাধা আসবে না, আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি, মি পেট”, হাল বলে উঠে, “এখন দয়া করে, আপনি আপনার গল্প শেষ করুন।”
“অবশ্যই, ক্যাপ্টেন। তো যা বলছিলাম। ক্যাপ্টেন গোডিংস জাহাজে করে খনিজপদার্থ নিয়ে লন্ডনে ফিরছিল। মি স্ট্যানলি এরই মধ্যে লক্ষ করেছেন যে কাজটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ভীরু ভাববেন না যদি আমি বলি যে আমি ইচ্ছে করে আর্ল অব কামব্ৰায় উঠিনি। আমার ইংল্যান্ডে ফেরা প্রয়োজন ছিল-যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তাই এরপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। জাহাজে আগুন লেগে গিয়েছিল।”
সে তার চোখের দৃষ্টি টেবিলের চারদিকে বসা সবার দিকে একবার ঘুরিয়ে আনে। “আপনারা সবাই আমার মতো একজন নির্বোধ ব্যক্তির জন্য আফসোস করতে পারেন। কেননা আপনারা সবাই জানেন যে সমুদ্রে আগুন লাগা কতটা বিপজ্জনক ব্যাপার। যদিও গতকাল রাতে ক্যাপ্টেন কার্টনির গল্প এরকমই একটা ঘটনার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। তবুও অন্তত আপনারা সেই অগ্নিকাণ্ডের কারণটা জানতেন যেটাতে বুজার্ড নামের সেই লোকটা মারা গিয়েছে। কিন্তু আমি এখনো জানি না যে আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড-এ কেন আগুন লেগেছিল। আমি শুধু বলতে পারি যে আমি ক্যাপ্টেন গোডিংস-এর সাথে তার কোয়াটারে এক মনোরম আলোচনায় মগ্ন ছিলাম। তখন আমরা সতর্কধ্বনি আর চিৎকার শুনতে পাই। এরপর একজন নাবিক চোখ বড় বড় করে আগুন আগুন বলে চিৎকার করতে করতে এসে বলে, “তাড়াতাড়ি আসুন ক্যাপ্টেন, জাহাজে আগুন লেগেছে।”
“তারপর সেই সাহসী ক্যাপ্টেন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। প্রথমে আমিও তার পিছু পিছু ডেক পর্যন্ত যাই। মানুষজন এখান থেকে সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছিল। এদিকে অন্ধকারে আগুনের শিখা বেড়েই চলেছে। শিখা উঁচু হতে হতে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রধান মাস্তুলের অনেক উপরে উঠে পড়েছে সেই ধোয়া।”
“তো, আপনি সেখান থেকে কীভাবে মুক্ত হলেন?” ট্রোম্প জিজ্ঞেস করে “আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি খুব একটা সাহসী নন।”
“কথাটা উঠিয়ে নিতে অনুরোধ করছি আমি. পেট আপত্তি জানায়।
“তাহলে হয়তো আমি ভুল বুঝেছিলাম,” ট্রোম্প বলতে থাকে। আমি ভেবেছি আপনি খনিজ পদার্থ ভর্তি জাহাজে উঠতে চাননি কারণ আপনার সাহসের অভাব ছিল। সে টেবিলে বসা সবার দিকে তাকিয়ে সমর্থন লাভের আশায় বলে, “আমি কী ভুল বলেছি?”
ব্যাপারটা নিয়ে সবার মাঝেই একটা থমথমে ভাব বিরাজ করতে শুরু করে। হাল বুঝতে পারে এবার ব্যাপারটাতে তার মধ্যস্থতা করে দেয়া উচিত। “তুমি হয়ত পেট-এর কথাটা বুঝতে ভুল করেছে। সে আগেই বলে নিয়েছে যে আমরা যেন তাকে ভীরু না ভাবি। কিন্তু এটা সত্য যে খনিজপদার্থ ভর্তি একটা জাহাজে চড়া খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়, সেই সাথে অনেক বিপদজনকও বটে।” “আমি নিশ্চিত যে আমার ব্যাখ্যার পর কেউই মি. পেটকে আর কাপুরুষ ভাববেন না অথবা তার সেন্টিমেন্ট-এ আঘাত করবেন না।”
ট্রোম্প তার মুখে একটা অলস হাসি ফুটিয়ে বলে উঠে, “উপস, আমি সম্ভবত আপনার ইংরেজি ভাষায় অর্থ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। এই অজ্ঞতার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। চিজহেড শব্দটা হয়ত বা আমার মতো ওলন্দাজ-এর জন্যই সঠিক।”
“আপনাকে ক্ষমা করব? পেট বলতে শুরু করে। এই ভুল বোঝাবুঝির জন্য আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু কোনো অপরাধ না করেও আমাকে যে বন্দি থাকতে হয়েছে…সেটা নিয়ে ক্ষমা পাওয়া অনেক দূরের ব্যাপার, অনেক দূরের।”
“আমি আপনাকে অনেক বার বলেছি কথাটা, এটা আমি আপনার নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য করেছি।”
যথেষ্ট হয়েছে ভদ্রমহোদয়গণ। আমার টেবিলে আমি এ ধরনের তর্ক বিতর্ক হতে দেব না। মি. পেট আপনি দয়া করে আরেকটা তথ্য দিয়ে আপনার গল্প শেষ করুন।” “এত লোকের মাঝে আপনি একা কিভাবে আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড থেকে মুক্তি পেলেন?”
পেট কয়েক মুহূর্তের জন্য কিছুই বলল না। তার শীতল দৃষ্টি এখনো সে মি. ট্রোম্প-এর ওপর স্থির করে রেখেছে। এরপর স্বপ্ন দেখার পর মানুষ যেভাবে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে সেও সেভাবে চেতনা ফিরে পেয়ে বলতে শুরু করে। “আমি আগেই বলেছি যে আমি দুটো জিনিসের ওপর আস্থা রাখি : সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা এবং আমার পদক্ষেপ। আমি যদি নাবিকদের সাথে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতাম তাহলে হয়ত কোনো লাভই হতনা। যদি আমি তা করতাম তাহলে হয়ত আমার অবস্থাও তাদের মতো হত। এটা নিয়ে আমি উভয় সংকটের মধ্যে ছিলাম। আমার কী জাহাজে থাকা উচিত, তার সাথে সাথে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়া উচিত? নাকি আমি এই রাতের অন্ধকারে মাঝসমুদ্রে লাফ দিয়ে নিজেকে সম্ভাব্য মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিব?”
“এ সময় আমি সৃষ্টিকর্তার পথ প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করতে থাকি। এবং আমাকে তিনি নিরাশা করেন নি। আমি তার উপস্থিতি বুঝতে পারি। তার কণ্ঠ আমার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তিনি আমাকে সেখান থেকে নিজেকে মুক্ত করতে বলেন। আমিও সেই অনুযায়ী কাজ করি। কিন্তু সেটা করার জন্য আমাকে ক্যাপ্টেন-এর বিছানাটা ব্যবহার করতে হয়েছিল যেটা অনেকটা ক্যাপ্টেন কার্টনির বিছানার মতো দেখতে, তবে অনেকটা সরু।”
