ওলন্দাজ নাবিকটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দেয়, “দুই-একটা ঘটনা শুনে আপনারা মজা পেলেও পেতে পারেন।
একগ্লাস ওয়াইন পান করার পরও খালি গ্লাসে চুমুক দিতে থাকে পেট। এরপর সে গলা পরিষ্কার করে বলতে থাকে। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, আমি আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড-এ চড়ে বোম্বে (মুম্বাই) থেকে যাত্রা শুরু করি। আমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে কিছু ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য গিয়েছিলাম। যখন আলোচনা শেষ হয় তখন গভর্নর-এর বাসস্থানে ক্যাপ্টেন গোডিংস-এর সাথে পরিচয় হয়। সে খুব খুশি মনে আমাকে আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড-এ জায়গা দিতে রাজি হয়েছিল। জাহাজটা তখন খনিজ পদার্থ বোঝাই করে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল মাত্র।”
উইল স্ট্যানলি আর বিগ ডেনিয়েল-এর দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যায়। “আমার তো মনে হয় এরকম জাহাজে চড়া অর্ধেকটা মৃত্যুর সমতুল্য। যেকোনো মুহূর্তে আগুন লেগে বিস্ফোরিত হতে পারে ওটা।”
“আপনার ভয়ের যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে,” পেট বলতে শুরু করে। “যখন আমরা যাত্রা শুরু করি তখন সবই ছিল গুজব। ক্যাপ্টন গোডিংস ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক একজন মানুষ। সেই সাথে সে বেশ মজাদার মানুষও বটে।
আমার যতদূর মনে পড়ে তার জাহাজের নাবিকেরা তার নাম দিয়েছিল। সসেজ।”
চারপাশে মৃদু একটা হাসির রোল শোনা গেল। জুডিথ বলে উঠে, “মাফ করবেন মি. পেট। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এই নামের মধ্যে হাসির কী। আছে?”
“ম্যাডাম, ব্যাপারটাকে এত জটিলভাবে নেয়ার দরকার নেই। আমারও সঠিক ধারণা নেই যে এই নাম কিভাবে রটেছে। ক্যাপ্টেন গোডিংস-এর কাছ থেকে যতটুকু ধারণা পেয়েছি, ব্যাপারটা মাংস আর কসাইখানার সাথে সম্পর্কিত। সম্ভবত আর্ল অব কাম্বারল্যান্ড-এর লোকেরা বিশেষ পদ্ধতিতে সসেজ রান্না করতে পারে। এর বেশি কিছু আমি জানি না।”
“তাহলে আমাদের সসেস সম্পর্কে বলুন। অথবা ঐ জাহাজ সম্পর্কে নেড টেইলর অনেকটা অধৈর্য হয়ে বলে উঠল। “জাহাজটা কী যথেষ্ট বড় ছিল?”
পেট মাথা নাড়ায়। “আমি তাই বলব। কারণ মি, গোডিংস আমাকে এটার গঠন সম্পর্কে বলেছিলেন যা শুনে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। এমনকি ওটার ভেতর মজুদ করা ধন-সম্পদের কথা বলেও তিনি আমাকে মুগ্ধ করেছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন এটার ভেতর দুইশরও বেশি রকমের গাছ রয়েছে। পাইন গাছের কাঠ রাখা হয়েছে জাহাজটার মাস্তুলের জন্য। স্পার কাঠ আনা হয়েছে বিভিন্ন কলোনী থেকে সংগ্রহ করে। এছাড়াও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা তা হল ইংলিশ ওক কাঠ আনা হয়েছে ফরেস্ট অব ডীন থেকে-কিংবা অন্য কোনো বন থেকে যেটা আমার মনে নেই। কিন্তু মি. টেইলর আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, এটার মাস্তুল, এটার পাল, আর এটার বন্দুক সবই ছিল অত্যন্ত গুণগত মানসম্পন্ন। কোম্পানির আদেশ অনুযায়ী অনেক উন্নতভাবে সাজানো হয়েছিল এটাকে। জাহাজটার লাভ নির্ভর করত এর কার্গোগুলো কতটা নিরাপদে পৌঁছাতে পারে সেটার ওপর।
“ক্যাপ্টেন গোডিংস নামটা আমার কাছে বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে।” হাল বলে উঠে। “আমি নিশ্চিত যে আমার পিতা তাকে চিনতেন। ওহ, হ্যাঁ মনে পড়েছে। তারা দুজন একসাথে স্কেভেনিংজেন-এর যুদ্ধে লড়েছিলেন। আমার বাবা বলেছিলেন, “জাহাজের যুদ্ধে তাকে নিজের পক্ষে পাওয়াটা অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।”
“আহ, স্কেভেনিংজেন”, নেড টেইলর তার ধূসর মাথাটা নাড়িয়ে বলতে থাকে। অনেক মানুষ সেদিন সাগরের তলায় হারিয়ে গিয়েছিল। সে তার বুকের শুকিয়ে যাওয়া রুপালি রঙের ক্ষতটাতে হাত লাগিয়ে বহুবছরের পুরনো স্মৃতিটার কথা মনে করতে থাকে। তার আগের রাতের ঝড়ো বাতাসটা ছিল আসলে ঈশ্বরের ক্রোধ। সবার বোঝা উচিত ছিল যে ঈশ্বর আমাদেরকে কিছু একটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।”
“তোমার পুরনো গল্প বাদ দাও তো, টেইলর”, হাল বলতে শুরু করে, “নয়ত আমরা কখনোই পেট-এর গল্পের শেষটা শুনতে পারব না।”
“আরে, বলতে দাও তো। টেইলর বলতে শুরু করে।” “একবার কি হয়েছে শোন। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত, শুনে অবাক হবে। আমি তখন প্লাইমাউথ-এর এক সরাইখানা থেকে বের হয়ে আসছিলাম, এমন সময় লালচুলো এক সুন্দরী আমাদের মাল্লাদের সর্দারের কাছে এসে নিজে থেকেই তার সেবা দিতে চাচ্ছিল-সে কোনো কথা বলার পূর্বেই।”
“আরও কিছু বলার আছে?” অ্যাবোলী জোর গলায় বলে উঠল। এরপর জুডিথ-এর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ওর হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।”
“সেটার কোনো প্রয়োজন নেই,” জুডিথ হেসে জানাল। “আমি বহুবছর পুরুষ সৈন্যদলের মাঝে একমাত্র নারী ছিলাম। আমি এর চেয়েও বেশি কিছু শুনে অভ্যস্ত।”
“আমাকে ক্ষমা করবেন মি. টেইলর, কিন্তু মাঝি-মাল্লার সর্দারদের সাথে এসব নারীদের ঘটনা উল্লেখের কী কোনো সম্পর্ক আছে?”
“নেড বিশ্বাস করে যে এসব লাল চুলো রমণীদের আগমন জাহাজের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে আনে, হাল তাকে ব্যাখ্যা করে বোঝায়।
“ওহ, আচ্ছা”, পেট বলে উঠে। “কিন্তু সেই ঘটনার পর সেই যুবকটির কী হয়েছিল?”
“সে জাহাজ থেকে নামার সময় কাঠের পাটাতন উল্টে পাথরের মতো সমুদ্রে ডুবে যায়”, নেড জানায়।
“আমি আর কল্পনাও করতে পারছি না, মি. টেইলর, পেট বলে উঠে। “আমি প্রথমে সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রাখি, দ্বিতীয়ত, রাখি আমার নিজের ওপর। এবং সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। এই যে দেখুন না, এতদিন বন্দি হয়ে কাটানোর পরেও আমি আপনাদের সাথে এখন চমৎকার খাবার উপভোগ করছি। ওদিকে ক্যাপ্টেন গোডিংস আর তার লোকেরা পুড়ে ছাই হয়ে সাগরের নিচে ডুবে গিয়েছে।”
