কিছুক্ষণ পর বুজার্ড যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন জাহান তার কক্ষে আসে। “তুমি আজ যথেষ্ট ভাল করেছ।” সে বলতে থাকে। “এখন থেকে আলী তোমাকে প্রতিদিন প্রশিক্ষণ দিবে। মাঝে মাঝে সে আর তুমি একা কাজ করবে। অন্যসময় তোমাকে বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হবে-তুমি কী শিখেছো সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য। সেখানে তোমাকে বন্দিদের সাথে যুদ্ধ করতে দেয়া হবে।”
জাহান বুজার্ডের দিকে এগিয়ে তার কাঁধে হাত রাখে এবং সরাসরি তার চোখের দিকে তাকায়। “এলিনা খুবই অসাধারণ এক রমণী। তাই না?” সে এমনভাবে বলে যেন দুই বন্ধু মিলে গল্প করছে।
“হ্যা”, বুজার্ড উত্তর দেয়।
“মাঝে মাঝে আমি বুঝতে পারি না, সে ডাইনি, নাকি পরী, নাকি দেবী…অথবা সে সবই। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, সে যেভাবে মানুষকে আনন্দ দিতে পারে-এমনকি তোমার মতো কাউকেও”-তার তুলনাই হয় না। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে জাহান। “সে তোমার অনুভূতি জাগিয়ে দিয়েছিল। তাই না? মানে যতটা জেগে উঠা তোমার পক্ষে সম্ভব ছিল আরকি।”
“হ্যা”, বুজার্ড অন্যদিকে তাকিয়ে জবাব দেয়। তার কণ্ঠে কেমন যে দোটনা ভাব চলে এসেছিল।
“তুমিও চাও সে তোমাকে আনন্দ দিক, তাই না?”
“হা…হা…অবশ্যই”, খুব দ্রুত জবাব দেয় বুজার্ড।
জাহান বুজার্ডের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দেয়। আমি এটা নিয়ে চিন্তা করেছি। কিন্তু এলিনা অথবা আমার অন্যকোনো উপপত্নীর সাথে স্বর্গসুখ উপভোগ করতে চাইলে তোমাকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে যতদিন পর্যন্ত না তুমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে। হেনরি কার্টনিকে হত্যা করতে পারবে।”
“কিন্তু এরপর…?” বুজার্ড জিজ্ঞেস করে।
জাহান হেসে জবাব দেয়, “যদি তুমি কার্টনিকে হত্যা কর, সে আমাদেরকে যেভাবে অসম্মান করেছে, তোমাকে যেভাবে অপমান করেছে, আমাদের লোকদের ক্ষতি করেছে, সেগুলো তাকে কড়ায় কণ্ডায় হিসেব বুঝিয়ে দিতে পারো, তবেই তুমি আমার হারেমের কোনো এক রত্নকে পাবে। সেটা এলিনাও হতে পারে-যদি আমি ততদিনে তাকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি আরকি। আমার উপহার হিসেবে তুমি তাকে রেখে দিতে পারবে অথবা যা খুশি করতে পারবে।”
*
উইলিয়াম পেট অনেকটা খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ, সেই সাথে সক বেশ অদ্ভুত। হাল তাকে নিজের অলিভ ওয়েল আর বেরিলা অ্যাসেস সোপ ব্যবহার করতে দিয়েছে। সাগর থেকে বালতি ভর্তি পানি তুলে গোসল করে লোকটা। ডেফট-এর বন্দিশালায় বন্দি থাকা অবস্থায় তার শরীরে যে ময়লা ও ধুলাবালি জমেছিল সেগুলো সে পরিষ্কার করে খুব ভালভাবে। শুধু শারীরিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষার জন্যই যে সে তা করে তা-ই নয়। বরং সবার মাঝে নিজেকে যেন আকর্ষণীয় মনে হয় সেদিকেও লক্ষ রাখে সে।
ক্যাপ্টেন-এর টেবিলের চারদিকে খেতে বসা সবার চেহারা যেখানে অপরিষ্কার বা অগোছালো থাকে সেখানে পেট-এর চেহারা উচ্চ গোত্রীয় ইউরোপীয়ানদের মতো চকচক করতে থাকে। যেভাবেই হোক সে বোম্বে (মুম্বাই) ভ্রমণ করে এসেছে, সেই সাথে আর্ল অব কাম্বার ল্যান্ডে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে এসেছে। কিন্তু তাতে তার চেহারার উজ্জ্বলতা খুব একটা মলিন হয়ে যায়নি। বন্দিদশা তার ধূসর রঙটাকে শুধু একটু বাড়িয়ে দিয়েছে।
হাল আর তার নাবিকেরা উঠে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তরতাজা খাবারের স্বাদ নিচ্ছিল। জুডিথ জাহাজের রাঁধুনীকে কিভাবে আরও ভাল রান্না করা যায় সে ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিল একনাগাড়ে।
হাল তার গল্প বলার পর দুই রাত পার হয়েছে। এরই মাঝে সে একবার তার নাবিকদের মাঝে কয়েকজনকে জন লোভেল-এর নেতৃত্বে ডেট-এ পাঠিয়েছে। দুটি জাহাজই এখন অ্যাস্টার্ন লাইন-এর ওপর দিয়ে যাচ্ছে যদিও প্রতিকূল বাতাসের কারণে তারা খুব একটা দ্রুত এগুতে পারছে না। আটক করা ওলন্দাজ নাবিকদের এখনো বন্দি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে শেকলে বাঁধা হয়নি। জাহাজের অন্যান্য নাবিকের মতো তাদেরকেও একই খাবার এবং পানীয় দেয়া হচ্ছে। দিনে দুইবার তাদেরকে ডেক-এর ওপর যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে যেন তারা সূর্যের আলো পেতে পারে, নির্মল বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারে। সেই সাথে পরাজিত নাবিকদের ব্যাপারে তার পিতা যে কৌশল অবলম্বন করতেন ট্রাম্প-এর ব্যাপারেও সে একই কৌশল অবলম্বন করেছে কার্টনি। তাকে প্রতিদিন রাতে ক্যাপ্টেন-এর খাবার টেবিলে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
জুডিথ-এর পরামর্শ অনুযায়ী তৈরি করা আজকের মার্টনকারি বেশ সুস্বাদু হয়েছে বলা যায়। টেবিলে বসা প্রায় সবাই প্রাণভরে খেয়েছে শুধু পেট বাদে। পেট-এর খাবারের থালা প্রায় একইরকম রয়ে গিয়েছে। প্লেটের খাবার প্লেটেই গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার এই খামখেয়ালিপনা হয়ত উপস্থিত লোকদের কাছে বিরক্তির কারণ হতে পারে কিন্তু পেট এরকম পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলার মতো দক্ষতা তৈরি করে নিয়েছে নিজের ভেতর। তার উপস্থিতি অন্যদের কাছে যেন উপভোগ্য হয় সেটা নিশ্চিত করতে সে ভালই পারে।
হাল হাসতে হাসতে তার ওয়াইন-এর বোতল সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল, “আপনার পালা ঘনিয়ে আসছে মি. পেট। গত দুইদিন আগে আপনি আমাকে গল্প বলতে বাধ্য করেছিলেন। এবার আপনি আপনার গল্প বলবেন। কোন ভাগ্যের প্যাঁচে পড়ে আপনি সাগরের এখানে এসে পৌঁছেছেন যে ট্রোম্প-এর মতো লোকের আপনাকে দয়া দেখিয়ে উদ্ধার করতে হয়েছিল।” আর “আমি একইসাথে আপনাকেও জানিয়ে রাখছি মি. ট্রাম্প। এরপর আপনার ভ্রমণকাহিনী শুনব আমরা।”
