পিছিয়ে যেতে যেতে বৃদ্ধ লোকটি দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল। সাথে-সাথে বুঝতে পারে সে ফাঁদে আটকা পড়েছে। লোকটা বুজার্ডের দিকে তাকিয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইলো। কয়েক মুহূর্ত পুজার্ড ইতস্তত করতে থাকে যে কি করবে। এরপরই সে জাহানের কণ্ঠ শুনতে পায়। “ও একজন খুনী। ওকে হত্যা কর।” আবেগহীন রুক্ষ কণ্ঠে জাহান আদেশ করে উঠল। এরপরই এলিনা চিৎকার দিয়ে উঠে। “ওকে হত্যা কর কুৎসিৎ মানব।”
এরপর আর কোনো চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিল না। তার কাজ সে চালিয়ে যায়। নিজের তলোয়ারটা লোকটির পেটে ঢুকিয়ে দেয় সে। এরপর লোকটি যখন সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে তখন তার উন্মুক্ত গলায় বুজার্ড তলোয়ার বসিয়ে দেয়। লোকটিকে হত্যা করার পর বুজার্ডের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। জাহানের হারেমে তাকে যে অপমানের শিকার হতে হয়েছে তাতে সে গত কয়েকদিন যাবত কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিল না। এখন কিছুটা হলেও সেটা কমেছে। কিন্তু এখন সেটা নিয়ে আনন্দিত হওয়ার সময় নেই কারণ জাহান এরই মধ্যে তার নাম ধরে ডেকেছে। “গেট! গেট-এর দিকে তাকাও।”
বুজার্ড মাথাটা ঘুরিয়ে গেট-এর দিকে তাকিয়ে দেখে আরেকজন লোক প্রবেশ করছে। তার বয়স আগের লোকটির চেয়েও কম এবং তাকে বেশ শক্তিশালী মনে হচ্ছে। কিন্তু লোকটির পায়ে একধরনের অসংগতি আছে। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছে। বুজার্ড বুঝতে পারে তার মাথাটা সবসময় নড়াচড়ার ওপর রাখতে হবে যেন তার দৃষ্টি লক্ষ বস্তুর ওপর থেকে সরে না যায়। শুধু যে তাকে মাথা নাড়াতে হচ্ছে তা-ই না। মাথার গতিবিধির সাথে তাল মিলিয়ে শরীরকেও নাড়াতে হচ্ছে। সে বুঝতে পারছে যে অস্ত্র হাতে ধেয়ে আসতে থাকা শত্রুর সামনে সে যদি একদিন য় দাঁড়িয়ে থাকে তবে তার মৃত্য অনিবার্য।
যদিও বুজার্ডের যুদ্ধ কৌশল আয়ত্তে আনতে একটু সময় লাগে তবুও শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় মানুষটিকেও শায়িত করে ফেলে সে। তলোয়ার দিয়ে তার পেট চিরে ফেলে বুজার্ড। রক্তে ভেসে থাকা খাদ্যনালী এবং পেটের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
এরইমধ্যে মাঠে তৃতীয় যোদ্ধার প্রবেশ ঘটে। বুজার্ড তার নিজস্ব গতিতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাকে কুপোকাত করে ফেলে।
“যথেষ্ট হয়েছে,” এলিনা বিরক্তির স্বরে বলে উঠে। “গুড”, জাহান উত্তর দেয়। আমরা একে নিয়ে আরও ভাল কিছু করতে পারি।”
এরপর তারা দুজন বুজার্ড-এর দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে উঠে চলে যায়। স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়ে গেল যে বুজার্ড তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। এলিনার উদাসীনতায় বুজার্ড স্কুলপড়ুয়া বালকের মতো দুঃখ পেল। ওরা চলে যাওয়ার পরপরই গ্যালারি থেকে মোটা কণ্ঠের একজনের চিৎকারে সে সম্বিত ফিরে পায়
“হে মুখোশ মানব!” বুজার্ড দেখতে পায় বেশ লম্বা মোটাসোটা একজন লোক কথা বলছে। তার মাথার চুল ফেলে দেয়া, খালি গা, বাহুর প্রস্থ একজন সাধারণ মানুষের উরুর চাইতেও বেশি।
“আমার নাম আলী। আমি তোমার প্রশিক্ষক। তোমার আরো কাজ আছে। মহারাজার আদেশ অনুযায়ী তোমাকে একজন ভাল যোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যা আমি অবশ্যই করব। তাই বলছি, সতর্ক থাকো, সেই সাথে চারপাশে নজর রাখো। যতগুলো শক্র সামনে আসবে তাদের বধ করতে হবে তোমাকে-যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি থামতে বলব। এটা আমার আদেশ এবং …একই সাথে উপদেশ। তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”
বুজার্ড মাথা নাড়ায়।
“গুড”, আলী বলতে থাকে। “এখন তোমার যাদের সাথে দেখা হবে তারা আরও তরুণ এবং শক্তিশালী, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করতে পারো-যদি তুমি তাদেরকে হত্যা না কর তাহলে তারা তোমাকেই হত্যা করবে।”
প্রশিক্ষক ঠিকই বলেছিল। পরবর্তী যে দুজন বন্দিকে তার দিকে ঠেলে দেয়া হয় তারা তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে সেখান থেকে যথেষ্ট কৌশলে তাকে সরে আসতে হয়েছে। তাদের প্রতিহত করে একদম প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। ছয় নাম্বার লোকটি বুজার্ডকে আঘাত করতে সক্ষম হয়। বুজার্ড যদি শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করতে না পারত তাহলে হয়ত সে-ই বুজার্ডকে হত্যা করত। সাত নাম্বার লোকটি বুজার্ডকে কয়েকটা ঘুষি মেরে বসে। কিন্তু মাঠের এখানে সেখানে পড়ে থাকা মৃত মানুষগুলোর দিকে নজর পড়ার পর তার সাহস আর আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছিল। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে দুটো গুণ অনেক প্রয়োজন ছিল। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তলোয়ার-এর এক আঘাতে নিজের শেষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধ্বংস করে দেয় সে। এর পরপরই হাঁটুগেড়ে মাঠের ওপর বসে পড়ে বুজার্ড। এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে তলোয়ার ধরে রাখা আঙুলগুলো অনুভবই করতে পারছিল না।
.
ক্ষুধার্ত এবং ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় বুজার্ড তার কোয়াটার-এ ফিরে আসে। আফ্রিকান চাকরটা যখন নল ঢুকিয়ে তাকে পানি খেতে দেয় সে একবারে সমস্ত পাত্র খালি করে ফেলে। তার জেল্লাবা খুলে দেয়া হয়, এরপর তাকে গরম পানিতে গোসল করাতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে তাকে গরম তেল মালিশ করে দেয়া হয়-পেশিগুলোকে শিথিল করার জন্য। গোসল শেষে তাকে দেয়া হয় শুকনো কাপড়। খেতে দেয়া হয় চিকপিস, শাকসবজি, এবং মিনস মিট-তার জন্য আজ বরাদ্দকৃত খাবার ওইগুলোই ছিল।
