বুজার্ড তার একচোখ দিয়ে সবাইকে ভালভাবে দেখতে পাচ্ছে না, তাই পাখির মতো মাথা নাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করা তার জন্য স্বাভাবিক। তার এক চোখ দিয়ে সে কখনো কোনো সুন্দর মুখ, কোনো সুন্দর ঠোঁট বা চোখ, কখনো বা কারও শরীরের ভাজ দেখতে পাচ্ছে। সে কখনো একসাথে এতগুলো সুন্দরী রমণী দেখেনি। যদি সে কয়েকমাস আগেও এমন সুযোগ পেত তাহলে হয়ত নারীজাতির কাছে নিজের পৌরুষ প্রমাণের একটা সুযোগ পেত।
এখন যদিও নিজের হীনতা নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া বুজার্ডের আর কিছুই করার নেই। এলিনা কিছুক্ষণ তার দিকে খুব কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে এরপর উচ্চস্বরে বলতে থাকে, “আমি ভাবছি, এটা দিয়ে কী কোনো স্বাভাবিক নারী-পুরুষের মতো আনন্দ করা সম্ভব।” এরপর সে জাহানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলতে থাকে, “আমি কী এটা নিয়ে খেলা করতে পারি, স্যার?”
মহারাজা উচ্চস্বরে হেসে উঠেন। “না, তুমি পার না। আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে খেলা কর। এদিকে এস। তাহলে তুমি বুঝতে পারবে যে একজন প্রকৃত পুরুষ কেমন হয়।” সে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে, “একে নিয়ে যাও।” বুজার্ডকে তার নোংরা বন্দিখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর থেকে আজকের আগ পর্যন্ত জাহানের সাথে বুজার্ডের আর দেখা হয়নি। এমনকি হারেমে যাওয়ার অনুমতিও বুজার্ডের ছিলনা। এখন এলিনার কণ্ঠ তাকে আবার সেই পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তার দুই পায়ের সন্ধিস্থল থেকে সেই তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করে সে।
“এদিকে তাকাও”, কুৎসিৎ মানব এলিনা চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে। “তোমার জন্য আমার কাছে কিছু একটা আছে।”
বুজার্ড এদিক সেদিক তাকিয়ে কণ্ঠের উৎস খুঁজতে থাকে। তার উপরের দিকে দোতলা সমান উঁচু খোলা একটা গ্যালারি রয়েছে। সেটাতে শুধু এলিনা আর জাহান বসে আছে। এলিনার মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা, যেন তার মনিব ব্যতীত বাইরের কেউ তাকে দেখতে না পায়। হারেম-এর বাইরে গেলে তাকে এইভাবেই থাকতে হয়।
“দেখ”, সে ডাক দিয়ে বলে। তার দুই হাত সামনে বাড়ানো। বুজার্ড দেখতে পায় তার হাতে লম্বা, বাঁকানো একটা তলোয়ার। এটার সঠিক ব্যবহার। কর। “তাহলে পুনরায় আমাদের দেখা হবে।”
এলিনা সামনের দিকে ঝুঁকে হাত দুটো নিচু করে তলোয়ারটা তার দিকে ছুঁড়ে দেয়। বুজার্ড সেটা তুলে নেয়। এরপর জাহান তার উদ্দেশ্যে কথা বলে উঠে।
“যাও, পিছিয়ে গিয়ে মাঠের মাঝখানে দাঁড়াও। তুমি যে গেটটা দিয়ে ঢুকেছে সেটার দিকে তাকিয়ে দেখ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা খুলে যাবে আর সেখান থেকে একজন মানুষ প্রবেশ করবে। সে হচ্ছে মৃত্যু দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামী। তোমার তাকে হত্যা করতে হবে।”
“তাকে হত্যা কর।” এলিনার কণ্ঠও প্রতিধ্বনিত হয়।
বুজার্ড তার দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু এতবেশি ছড়ায়নি যাতে তার ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হয়। গত এক মাসের মধ্যে সে এই প্রথম এতটা শক্তিশালী অনুভব করল। কোনো সুন্দরী রমণীর সামনে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পেল। তাকে দেখানোর সুযোগ পেল যে সবকিছু সত্ত্বেও সে এখনো একজন পুরুষ।
কয়েক সেকেন্ড পরে গেট খুলে যায়। একজোড়া অপরিচিত হাত একজন বন্দিকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়। রোগা চর্মসার, ছোট খাট একজন মানুষ ভেতরে প্রবেশ করে। লজ্জা নিবারণের জন্য তার কোমড়ে জড়ানো ছিল শুধু এক টুকরো কাপড়। তার রুক্ষ সোনালি চুলের ওপর একটা কাপড় বাঁধা ছিল। মাঠ পাড়ি দিয়ে তার যে চোখ বুজার্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল সে চোখে কোনো ভয় ছিল না। ছিল বিদ্বেষ।
বুজার্ড ভালভাবে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করতে লাগল এবং নিজের দুর্বলতাগুলো খুঁজতে লাগল। সেগুলো খুঁজে পাওয়া অবশ্য কঠিন কিছু নয়। তার বাম হাত নেই। বাম চোখ নেই। তার লম্বা ঠোঁট তার দৃষ্টির এক অংশ প্রায় ঢেকে রেখেছে। তাই তার শরীরের অন্যপাশ প্রতিপক্ষের জন্য অনেক দুর্বল অংশ। বুজার্ড নিশ্চিত যে বৃদ্ধ লোকটি তার বর্শা দিয়ে বুজার্ড-এর বাম পাশে আঘাত করার চেষ্টা করবে। তাই বুজার্ড লোকটির গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু লোকটি আস্তে আস্তে পেছনে সরে যাচ্ছে।
“তোমার পেছনে,” এলিনা আর্তনাদ করে উঠে।
“ঘুরে দাঁড়াও,” জাহান বলে উঠে।
বুজার্ড অতি দ্রুত বাম দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। বৃদ্ধ লোকটির অল্প একটু অংশ ছায়ার মতো তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। গ্যালারি থেকে তীব্র চিৎকার শোনা যাচ্ছে এখন। সাথে-সাথে বুজার্ডের ভেতর নিজের যুদ্ধের স্পৃহা ফিরে আসল। সে ভুল পথে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার ডানদিকে ঘুরা উচিত যেদিকে তার একটি হাত আর একটি চোখ ভাল আছে। তলোয়ার ধরা হাতটা সামনের দিকে দিয়ে সে ঘুরতে থাকে যাতে সামনে যা-ই পড়বে সব কেটে যাবে।
হাত ছড়িয়ে দিয়ে ঘুরতে থাকার ফলে তার ভারসাম্য রক্ষা করতে সহজ হয়। এক পর্যায়ে সে বুঝতে পারে তার তলোয়ারটা শক্ত কিছুর ওপর আঘাত করেছে। এরপরই সে ব্যথাতুর চিৎকার শুনতে পায়। বুজার্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দেখতে পায় বৃদ্ধ লোকটি তার ডান হাতটি বামহাত দিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর বুজার্ডের চোখ যায় মাটিতে। দেখতে পায় দুটো কাটা আঙুল মাটিতে নড়াচড়া করছে। এরপর সে মাথা তুলে দেখতে পায় বৃদ্ধ লোকটি পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যথার কারণে সে আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারছে না।
