“ঠিক আছে। তাহলে সবকিছু জানা হয়ে গেল।” টেবিলের চারদিকে বসা সবার দিকে তাকাতে থাকে পেট, বিশেষ করে যারা সেসময় ক্যাপ্টেন কার্টনির সাথে ছিল তাদের দিকে। ডেনিয়েল এবং স্ট্যানলির দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া তার চোখ এড়ায় নি। এরপর সে অ্যাবোলির দিকে তাকায় যদিও অ্যাবোলি শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তারপর পেট-এর মনে হয় আফ্রিকান লোকটা কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করছে।
এরপর হাল ডিনার-এর সমাপ্তি ঘোষণা করে, তারপর তার সিনিয়র নাবিকদের রাতের নির্দেশনা দিতে থাকে। পেটও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার জন্য নির্ধারিত কেবিন-এর দিকে রওনা দেয়। নিজের রুম-এ গিয়ে শুয়ে-শুয়ে একটা কথাই ভাবছিল সে : গুপ্তধন তাহলে আসলেই আছে! যদিও তার মনে হয়না যে হাল কার্টনি তার সব নাবিককে জায়গাটার সন্ধান দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এরপরেও…অন্তত একজন জানে। লোকটার দৃষ্টিই সব বলে দিচ্ছিল।
ঐ আফ্রিকান অ্যাবোলি, যাকে কার্টনি অসম্ভব বিশ্বাস করে।
৩. জাঞ্জিবার-এর রাস্তায়
আর জাহান বুজার্ডকে নিয়ে খোলা বাহনে চড়ে জাঞ্জিবার-এর রাস্তায় বের হলো, যেন সারা পৃথিবীর মানুষ এই মুখোশ পরা দানবটাকে দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হয়। একটা পুরো অশ্বারোহী সৈন্যদল তাদের বাহনটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, পাশাপাশি আরেকটা অশ্বারোহী সৈন্যদল তাদের পেছনে পাহারা দিয়ে যাচ্ছিল যেন কেউ কোনোরকম সমস্যা তৈরি করতে না পারে। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে এক হাতওয়ালা দানবটাকে দেখছে। যারা সেই ছোট বালকটার অবস্থা দেখেছে তারা কেউই বুজার্ডকে অপমান করার কথা চিন্তাও করতে পারছে না। অনেকে তাদের মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে যেন তাদেরকে এই অমানুষ প্রাণীটাকে দেখতে না হয়। তারা ওকে শয়তানের সৃষ্টি জিন বলেই মনে করে।
মাত্র একঘণ্টা আগে জাহান বুজার্ডকে পুরনো একটা মন্দির ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। এর সমাধিস্থান আর আনুবিস এর ছবি দেখিয়েছে। আনুবিস হচ্ছে মিসরীয় শেয়ালের মাথাওয়ালা আন্ডারওয়ার্ল্ডের লর্ড। “এ হচ্ছে মৃত্যুর দেবতা” এটা বলার পর বুজার্ড মাথা ঘুরিয়ে এক চোখ দিয়ে ভালভাবে তাকিয়ে দেখল। “তাকিয়ে দেখ এর নাকটা দেখতে অনেকটা তোমার চামড়ার নাকের মতো। তুমি নিজেকে আনুবিস ভাবতে পার-মৃত্যুর দৃত, যে কি-না মানুষের আত্মাকে মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে নিয়ে যায়।”
“যেটা বলতে চাচ্ছিলাম। তুমি তোমার মুখে ময়লা ছুঁড়ে দেয়া ছেলেটাকে যেভাবে হত্যা করেছে এতে আমি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছি। এতে আমি আশ্বস্ত হয়েছি যে তোমার মানুষ হত্যা করার দক্ষতা বাড়বে। তুমি এক বাহু আর এক হাত নিয়ে আগের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছ। তোমাকে আরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সকাল থেকেই এই প্রশিক্ষণ শুরু করা হবে।”
এখন বুজার্ডকে তার ট্রেইনিং-এর প্রথম সেশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু সে এবং জাহান এই ভ্রমণে যাচ্ছে না। তাদের খোলা বাহনের পেছনে একটি বদ্ধ বাহনও রয়েছে। তাদের ভোলা বাহনের জানালার শাটারগুলো ফেলে দেয়া হয়েছে। এর ফলে ভেতরে কে আছে তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। এর ভেতরের মানুষও বাইরের কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কোচ তার জায়গায় বসে আছে এবং রওনা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। খানিক বাদে বুজার্ডকে বহনকারী বাহন আর তার চারপাশের প্রহরীরা বড় একটা গেট-এর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে চতুষ্কোণ একটা জায়গার মাঝামাঝি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জাহান এবং বুজার্ডকে বাহনটা থেকে নামার পর প্রিজন গর্ভনর তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, এরপর বুজার্ডের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় লোকটা। এরপর সে দুই হাতে তালি বাজানোর পর তিনজন প্রিজন গার্ড তাদের হিংস্র চেহারা নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। একজনের হাতে লম্বা একটা লোহার চেইন। বাকি দুইজন তার দুইপাশ দিয়ে এগিয়ে আসছে। তাদের হাত কোমড়ে ঝুলানো তলোয়ার-এর বাট-এর ওপর।
বুজার্ড দেখতে পায় শেকলটার একপাশে একটা তালা লাগানো। সবকিছুর অর্থ বুজার্ড একমুহূর্তে বুঝে ফেলে। তার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে যদি সে কোনো কিছুতে বাধা দেয়। তাই সে মূর্তির মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার গলায় লাগানো চামড়ার কলারের সামনের হুক-এ শেকলটা আটকানো হয়। এরপর জেলের ভেতর থাকা লোকগুলোর চোখের সামনে দিয়ে তাকে পশুর মতো টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে বিশাল বড় এক উঠোনের মাঝখানে নিয়ে দাঁড় করানো হয় যেটার চারপাশে বড় বড় উঁচু দেয়াল তোলা। দাঁড়ানোর পর বুজার্ড তার মাথাটা যতদূর সম্ভব ঘুরিয়ে একচোখ দিয়ে চারপাশটা দেখতে থাকে। চারপাশে লাল রঙ্গা উঁচু দেয়াল। দেয়ালের পেছনে দর্শকদের বসার জন্য এক ধরনের গ্যালারিও রয়েছে। সেই গ্যালারি থেকে দর্শকদের উল্লাস ধ্বনি ভেসে আসছে। চিৎকার দিয়ে কেউ একজন বলে উঠে, “জঘন্য লোকটাকে দেখতে পাচ্ছি আমি!” কণ্ঠটা তার কাছে অনেক পরিচিত মনে হয়। জাহানের প্রিয় উপপত্নী এলিনা। উত্তর-পূর্ব উপকুলে সারকাশিয়ান জাতির মেয়ে সে। ওখানকার রমণীরা যেমন তাদের সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত ছিল তেমনি পুরুষের চাহিদা মেটানোর দক্ষতার জন্যও কম বিখ্যাত ছিল না। কন্সট্যান্টিনোপাল-এ ওটোম্যান সুলতানের হারেমে সবচেয়ে বেশি ছিল সারকাশিয়ান রমণী। এদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সুন্দরী তারা দিল্লীর লাল কেল্লায় গ্রেট মোগল-এর চাহিদা মেটাত।
