“আমি কোনো গল্পকার নই”, বেশ ভদ্র কিন্তু গুরুগম্ভীর স্বরে বলে উঠল হাল। “আমি কাজ করি আর অন্য লোকেরা সেটা নিয়ে গল্প বানায়।”
পেট-এর আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। এই যুবক ক্যাপ্টেন-এর জীবনে অন্তত একজন শত্রু আছে। আর যখন কারো নতুন শত্রু গজায়, পেট তখন একজন নতুন মক্কেল পায়। সে হাল-এর দিকে তাকিয়ে এক অমায়িক হাসি দিয়ে বলে, “ওহ, আপনি একজন ন্যায় বিচারক স্যার। আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে আপনার মতো মানুষের শ্বাসরুদ্ধকর আর রোমাঞ্চকর অভিযান সবসময়ই শ্রোতাদের মনে আগ্রহ জাগায়। আমাকে অন্তত বলুন যে কে সেই বদমাশ যার কাছ থেকে আপনি গোল্ডেন বাউ কেড়ে নিয়েছেন? আর সে-ই বা কার কাছ থেকে এটা চুরি করেছিল?”
হাল বিরক্তিসহকারে পেট-এর দিকে তাকায়। কিন্তু তখনই পেট-এর। কথায় সারা দিয়ে আলোচনায় যোগ দেয় জুডিথ। “মাই ডিয়ার, আমি তোমার গল্পের শেষটুকু খুব ভালভাবেই জানি। কিন্তু তুমি কখনো আমাকে এটার শুরুটা বলনি। আমিও সেটা শুনতে চাই। তুমি কী আমাকে গল্পটা বলবে না?”
“এরকম সুন্দর একজন মানুষের সুন্দর অনুরোধ কীভাবে প্রত্যাখ্যান করবেন আপনি?” পেট বলে উঠে।
“বলুন স্যার”, বিগ ডেনিয়েলও যোগ দেয়। “মি. পেটকে বুজার্ড সম্পর্কে বলুন। তাকে বলুন যে আমরা কিভাবে বুজার্ডকে পরাস্ত করেছিলাম।”
হাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, এরপর আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলা শুরু করল, “আচ্ছা ঠিক আছে বলব। তার আগে আমাকে একটু ক্যানারির বোতলটা দিন তো মি পেট, গল্প শুরু করার আগে গলাটা একটু ভিজিয়ে নেয়া প্রয়োজন।”
এরপর পুরো একগ্লাস ওয়াইন গলায় ঢেলে দিল হাল। “পুরো ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল শেষ রাতের দিকে, ঠিক ভোরের সূর্য উঠার পূর্বে। ঐ সময় হঠাৎ করেই আমি আমার নাকের মাধ্যমে জাহাজটার সন্ধান পাই।”
“আপনার নাকের মাধ্যমে স্যার?” পেট বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলে উঠে, “তখন কী এতটাই অন্ধকার ছিল যে জাহাজটা আপনার নাকে এসে ধাক্কা দেয়ার আগ পর্যন্ত আপনি জানতেনই না যে সেখানে একটা জাহাজ ছিল?”
হাল উচ্চস্বরে হেসে উঠে, “না স্যার, জাহাজটা আমার নাকে এসে ধাক্কা লাগায় নি। আসলে ওটার ভেতর থাকা মসলার তীব্র গন্ধ আমার নাকে এসে লেগেছিল। আমি তখন লেডি এডউইনার মাস্তুলের ওপর ছিলাম। লেডি এডউইনার নামকরণ করা হয়েছিল আমার মৃত মায়ের নামে। আমার বাবা স্যার ফ্রান্সিস-এর মালিকানাধীন থাকার পূর্বে এটা ওলন্দাজদের জাহাজ ছিল। স্যার ফ্রান্সিস কার্টনি এটাকে দখল করে নিজের কাজে ব্যবহার করেন।”
“গন্ধটা পাওয়ার পর আমি দ্রুত মাস্তুলের নিচে নেমে এসে বাবাকে ঘটনাটা জানাই। আমরা দুই মাস যাবত সমুদ্রে ছিলাম শুধু এই সময়টারই অপেক্ষায়।
আমার বাবার কাছে শত্রুর জাহাজ আক্রমণ করার একটা অনুমতিপত্র ছিল যেটায় কিং চার্লস-এর পক্ষ থেকে লর্ড চ্যান্সেলর-এর স্বাক্ষর করা ছিল। সেটাতে বলা ছিল যে তিনি যেকোনো ওলন্দাজ জাহাজ আক্রমণ করার অধিকার রাখেন। ব্যাপারটা হচ্ছে, মি. পেট, ঐ সময় ইংল্যান্ড আর হল্যান্ড যুদ্ধে লিপ্ত ছিল।”
হাল আর এক পেগ ওয়াইন খাওয়ার জন্য থামে। এ সময় কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে। সেও চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে সেও গল্প বলায় খারাপ না।
“সেখানে আমাদের একা থাকাটা বিপজ্জনক ছিল। জায়গাটা ছিল ইন্ডিয়ান সাগরের দক্ষিণ দিকে। ক্যাপ্টেন কোকরান-যে কি-না বুজার্ড নামে পরিচিত ছিল-সমুদ্র অভিযানে আমার বাবার সাথে একসাথে কাজ করার ওয়াদা করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় সে অস্থির হয়ে গিয়েছিল, আর তাই, একদিন আগেই, সে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল-ভেবেছিল আশেপাশে জাহাজ পেলে লুটপাট করে নেবে।”
“আপনি ‘গাল অব মেরে’-এর গন্ধ নিয়ে তাকে তাড়া করতে পারতেন।” বিগ ডেনিয়েল মন্তব্য করল। “বুজার্ড যে নোংরা দাসগুলোকে জাহাজে রাখত, এদের শরীরের দুর্গন্ধ হাজার ধুলেও যাবে না।”
“গন্ধ দাসদের শরীর থেকে আসে না”, অ্যাবোলি বলল। তার হাতে থাকা ছুরিটা সে শক্ত করে ধরে আছে এখন। “দুর্গন্ধটা আসে মানুষেরই আত্মা থেকে। যেটা ওদেরকে দাস বানিয়ে রাখে।”
“আরে শোন তো”, হাল দ্রুত বলে উঠে। “যে জাহাজটাকে আমরা প্রায় আক্রমণ করতে যাচ্ছিলাম সেটার নাম ‘স্ট্যান্ডস্টিগেইড, যেটার অর্থ হচ্ছে রিজলিউশন।” লেডি এডউইনার চেয়েও অনেক বড় জাহাজ ছিল ওটা, আর লোকসংখ্যাও ছিল বেশি। বাউ আক্রমণ-এর ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন ট্রাম্প-এর যেমন কোনো আশা ছিল না, আমাদেরও তখন এর চেয়ে বেশি সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমার বাবার কাছে ডাচদের পতাকা ছিল যেটাকে উনি তখন জাহাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন যাতে করে ডাচরা আমাদের জাহাজটাকে বন্ধু জাহাজ মনে করে। আর একারণেই আমরা নির্ভয়ে ওদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম। একপর্যায়ে আমার পিতা স্যার ফ্রান্সিস নিজের স্বল্প বাহিনী আর আপন বীরত্বের বলে ওদের জাহাজ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।”
“আপনি যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত কাহিনী বললেন না, গান্ডওয়েন”, অ্যাবোলি বলে। ‘
“যেটুকু বলা প্রয়োজন আমি সবই বলেছি”, হাল উত্তর দেয়।
“আমি কি জানতে পারি কী কী বাদ দেয়া হয়েছে, পেট জিজ্ঞেস করে।
