ট্রোম্প চোখে মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “এগুলো হচ্ছে সত্যিকার ক্রস-এর টুকরো।”
ক্রিশ্চিয়ান ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে এরকম কিছু অভিজ্ঞতা আছে হাল-এর। তাই প্রথম কয়েক সেকেন্ড তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে সেই সত্যিকার ক্রসের টুকরো হাতে ধরে আছে সে যেটার ওপর যিশু খ্রিস্ট মৃত্যুবরণ করেছিলেন। “কিন্তু যদি তাই হয় তবে ট্রোম্প কেন হাসছে। তার কী নিজের ভাগ্যের প্রতি এতটুকু বিশ্বাস নেই। সে কিভাবে যিশুখ্রিস্টের মৃত্যু নিয়ে মজা করতে পারে?”
খানিকক্ষণ চুপ করে পর্যবেক্ষণ করে হাল। এরপর কাঠের টুকরোগুলোকে আবার আগের জায়গায় রেখে দেয় সে। তারপর সর্ব প্রথমে যে সবুজ রঙের কাঁচের বোতলটা পেয়েছিল তারা, সেটা তুলে ধরে।
“আহ!” ট্রোম্প আক্ষেপের সুরে মাথা নাড়ায়। “সবচেয়ে পুরনো গুপ্তধনটাই খুঁজে পেয়ে গেছেন আপনি। এই পুরনো বোতলটাতে ভার্জিন মেরীর বুকের দুধ রয়েছে। এরকম আরেকটা বোতল রয়েছে যেটাতে ভার্জিন মেরীর চোখের অশ্রু পাবেন, যে অশ্রু তার চোখ থেকে ঝরেছিল ছেলেকে পাওয়ার খুশিতে।”
অবশেষে কথা বলে উঠল হাল। বেশ রেগে আছে ও। “গড।” “তুমি আমাদের যিশু খ্রিস্টের নাম মুখে আনবে না। মাতা মেরীর নামও না। তোমার মুখে এসব কথা মানায় না। তুমি ঈশ্বরনিন্দা করবে আর আমি সেটা চুপচাপ শুনব, তা হবে না।”
ওলন্দাজটা বেশ দৃঢ়ভাবে হাত উপরে তুলে হালকে থামিয়ে দিল। “ক্যাপ্টেন কার্টনি।” “আমার তো মনে হয় না আপনি সহজে বোকা হওয়ার মতো লোক। আপনাকে তো বেশ বুদ্ধিমান লোকই বলা যায়। অথচ আপনি এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। আমি এই মূল্যবান জিনিসগুলো চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যেই রেখে দিয়েছিলাম।”
“আর বাকি যেগুলো রয়েছে সেগুলোতে কী আছে?” হাল বাকি ব্যারেলগুলো দিকে ইঙ্গিত করে বলে।
ট্রোম্প একজন দক্ষ ব্যবসায়ীর মতো হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমার কাছে খ্রিস্টের দাঁত, চুল এবং রক্ত আছে। আমার কাছে সেই কাপড়ের টুকরা আছে যে কাপড় দিয়ে ছোট বেলায় যিশু খ্রিস্টকে মোড়ানো হয়েছিল। এরপর সে ঠোঁট কামড়ে মনে করার চেষ্টা করে যে তার কাছে আর কী কী আছে।” “আমার কাছে সেই স্বর্গীয় দূত-এর কাটা আঙুল রয়েছে। এমনকি আমার কাছে তার ফোরস্কিনও পাবেন, যেটা তার খানা করার সময় কাটা হয়েছিল। সে একটা হাত ব্যারেলগুলোর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এখন আমার জাহাজ যেহেতু আপনার তাই এই জিনিসগুলোও আপনার।”
হাল ঠোঁট বকিয়ে এক ধরনের মুখভঙ্গি করল, যা দেখে পুনরায় হাত উঠাল ট্রাম্প।
“আমি স্বীকার করি যে এই কার্গোটা খুবই অস্বাভাবিক আর ক্ষমার অযোগ্য” ট্রোম্প আবার বলতে থাকে। কিন্তু আমি যে অবস্থায় ছিলাম সেখানে থাকলে ধর্মীয় নৈতিকতা এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যায়।”
“এমনিতেও তোমাকে দেখতে খুব একটা নৈতিকতাসম্পন্ন লোক বলে মনে হয় না”, হাল দ্রুত বলে উঠল।
“আপনার সাথে কথায় পারবো না।” ট্রোম্প একটা বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দিয়ে বলে উঠল।
“ড্যাম, এই ওলন্দাজটাকে বেশিক্ষণ অপছন্দ করে থাকা যাচ্ছে না।” মনে মনে ভাবল হাল।
“এপাশের দুনিয়ার সম্পর্কে আপনারা ইংরেজরা সব সময় একটা কথা বলেন, ট্রাম্প বলল। কিভাবে যেন বলেন? ওহ? হ্যাঁ…অল ইজ ফেয়ার বিয়ন্ড দ্য লাইন। ঠিক না?”
হাল অ্যাবোলির দিকে তাকাল। তারা দুজনেই এই কথাটা প্রায়ই তার বাবার মুখে শুনত-যখন ছদ্মবেশে কিংবা কৌশল খাঁটিয়ে কোনো ডাচ্ জাহাজ ধরার চেষ্টা করা হত, তখন। আর ঠিক তখনি, তার মাথায় একটা ব্যাপার কাজ করল। আজ ট্রোম্প যেভাবে তার ডেটকে গোল্ডেন বাউ-এর পেছনে লাগিয়ে ছিল, হাল-এর বাবাও মাঝে মাঝে তার জাহাজ নিয়ে একই কাজই করতেন।
“হ্যাঁ, এরকমই বলি আমরা”, বাদে আর কিছুই বলতে পারল না হাল। এরপর সে জিজ্ঞেস করল, “কে এসব তুচ্ছ জিনিস কিনবে?”
ট্রোম্প চিন্তা করল কিভাবে এর সর্বোত্তম উত্তর দেয়া যায়। আমার মনে হয় ক্যাপ্টেন, আপনি প্রোটেস্টট্যান্ট বাদে বিশ্বাসী।”
“তোমার ধারণা সঠিক।”
“যাক আমি তাহলে ঠিক ধরেছি। আপনি জানেন যে, আমরা ওলন্দাজরা ব্যবসায়ী। আমরা লাভের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়াই। আর সেই লাভ আমরা ইস্ট ইন্ডিয়ায় খুঁজে পেয়েছি। মশলার ওপর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা করছে সেখানে।”
“ব্যতিক্রম ঘটে তখন, যখন ইংরেজরা কিছু মশলা নিজেদের সাথে করে নিয়ে যায়”, হাল বলে উঠে। সেই সাথে তার বাবার আটক করা কার্গোগুলোর কথা ভাবতে থাকে।
“ডাকাতি করছে বললে কি আরো ভাল হয় না, ক্যাপ্টেন কার্টনি?” ট্রোম্প আরেকটা হাসি দিয়ে বলে। “আপনি লক্ষ করবেন অনেক আগে থেকেই আমাদের দুই জাতির মধ্যে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি চলছে। তাই ডাদের মশলা নিয়ে যাওয়াটা ডাকাতির সমপর্যায়ের অপরাধ।”
এই লোকটা তো বেশ ধূর্ত, হাল মনে-মনে চিন্তা করল। তারপর বলল, “এসবের সাথে তোমার এসব নকল ধ্বংসাবশেষ-এর কী সম্পর্ক রয়েছে?”
“সহজ হিসাব। আমরা ওলন্দাজরা ধর্মপ্রচারক নই। দেখুন স্পেনিস ও পর্তুগীজ যারা দীর্ঘদিন ইস্ট ইন্ডিজ-এ আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তারা তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতোই ক্যাথলিক বিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। জিউসরা ফিলিপাইন, চীনা এবং জাপানের দ্বীপগুলোতেও তাদের হাত প্রসারিত করছে যেখানে তাদের শাসকেরা নিজেদেরকে আড়াল করে রাখছে বিশ্ব থেকে। তারা যেখানেই যাচ্ছে সাথে করে ধর্মীয় ধ্বংসাবশেষ নিয়ে যাচ্ছে, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ওগুলোকে। এসব অস্ত্র নতুন বিশ্বাসীদের মনকে প্রভাবিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।”
