“ডেফট-এর নাবিকেরা মন দিয়ে শোন,” ডাচদের উদ্দেশ্যে হাল চিৎকার করে উঠল। “তোমাদের ক্যাপ্টেন কোনো বিজয় অর্জন করেনি। সে আর তার লোকেরা অত্যন্ত সাহসের সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র অল্প কয়েকজনই বেঁচে আছে, যারা সবাই আমাদের বন্দি হিসেবে আছে। তোমরা যদি আমাকে তোমাদের জাহাজ দিয়ে দাও তাহলে আমি তোমাদের খাদ্য দিব। আর যদি না দাও তাহলে এক টুকরো রুটিও পাবে না। সেই সাথে আমি তোমাদের সাগরে নিক্ষেপ করব।”।
বাউ-এর নাবিকেরা জাহাজের কিনারায় যে অগ্নিমূর্তি ধরে দাঁড়িয়েছিল সেটার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ডেফট-এর লোকদের ভরপেটে খাবার দেয়ার আশ্বাসই যথেষ্ট ছিল। বিনা বাক্য ব্যয়েই হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিয়ে দিল লোকগুলো।
.
যে লোকটি জাহাজের লণ্ঠন হাতে বন্দিশালায় প্রবেশ করল সে পায়খানার গন্ধে চোখ মুখ কুঁচকিয়ে ফেলল সাথে সাথে, এরপর মৃতদেহটি দেখতে পেয়ে ওটার ওপর আলো ফেলল। জুতার অগ্রভাগ দিয়ে দেহটাকে কয়েকবার তত দিয়ে পেছনে দাঁড়ানো লম্বা আফ্রিকান লোকটার দিকে তাকাল সে। আফ্রিকান লোকটার শক্ত, পেশিবহুল দেহ লণ্ঠনের আলোতে চকচক করছিল।
“এটা বরং কাঁকড়ার খাবার হিসেবেই থাক,” সে বলে উঠে। বাতির আলোতে পেট দেখতে পায় যে লোকটা অনেক অল্পবয়স্ক হলেও তার মধ্যে একটা নেতৃত্বের ভাব আছে। তার ঈগল পাখির ঠোঁটের মতো নাক দেখেই বোঝা যায় সে কোনো উচ্চ বংশীয় পরিবার থেকে এসেছে। দেখে মনে হয়, নিজের ওপর অগাধ আস্থা রয়েছে লোকটার ভেতর, যে ভরসার অর্ধেকটা এসেছে ওর আদেশ দেয়ার ক্ষমতার কারণে, যার ওপর মানুষের জীবন নির্ভর করে, আর বাকি অর্ধেকটা এসেছে স্বীয় আদেশ পালন হওয়ার নিশ্চয়তা সম্পর্কে সে পুরোপুরি সংশয়হীন বলে। দরজা থেকে যতদূর সম্ভব দূরে গিয়ে অবস্থান নেয় পেট। আগত লোকদুটি এখনো পেট-এর অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেনি। এদের দুজনের আগমনই পেটকে বলে দিয়েছে যে অভিযাত্রী দল ডেফট ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাকে কি কি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে ডাচরা সফল হয়নি এবং তাদের এই ব্যর্থতার কারণে জাহাজটাও তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। এখন ওর সামনে রয়েছে সেই জয়ী ক্যাপ্টেন। যদিও লোকটার প্রতি পেটের বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার ব্যাপারে পেট এখনো কোনো কিছু ঠিক করে নি। সে কি লোকটাকে তার একজন মক্কেল হিসেবে দেখবে? নাকি সে এমন এক লোক যাকে পেটের অন্য মক্কেলরা মৃত অবস্থায় দেখতে চায়? পেট এখনো কিছু বুঝতে পারছে না।
“কাকড়াদের অবশ্যই এটা খাওয়া উচিত গান্ডওয়েন,” আফ্রিকান লোকটা তার তরবারি দিয়ে ঘৃণাসহকারে একটা খোঁচা দিয়ে বলল। এই লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছে সে যথেষ্ট সাহসী যোদ্ধা, একই সাথে তার ক্যাপ্টেন-এর ডান হাত। পেট এই লোকটিকেই সম্ভাব্য প্রতিবন্ধক হিসেবে মনে করতে শুরু করে দিল। ক্যাপ্টেন-কে যদি কখনো হত্যা করার প্রয়োজন হয় তবে এই লোকটিই সবার আগে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া অন্য কোনো কারণে এই লোকটির ব্যাপারে পেট-এর কোনো আগ্রহই নেই।
“এ তো খুবই দুঃখের ব্যাপার স্যার, এই লোকটি মুক্তি পাওয়ার পূর্বেই মারা গেল।” হঠাৎ করেই কথা বলে উঠল পেট।
আরও দ্রুত মারা যেত। আরও দ্রুত। সেই স্বর্গীয় কণ্ঠটি পেট-এর মাথার ভেতর এত উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে যে পেট-এর বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে সে ছাড়া অন্য কেউ এই গর্জন শুনতে পাবে না। কিন্তু সাদা লোকটি শুধু তার কণ্ঠটিই শুনতে পায়। হাতের লণ্ঠন উঁচিয়ে এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে সে। এরপর চিৎকার করে উঠে, “কে ওখানে?”
“স্যার আমার নাম পেট। গত এক সপ্তাহ যাবত আমাকে এখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে, যতদূর আমি মনে করতে পারি আরকি। অবশেষে আমার প্রার্থনা সফল হয়েছে। এই একটু আগে যখন আমি আবারো একজন ইংরেজ লোকের কণ্ঠ শুনতে পেলাম, আমি আমার নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, স্যার।” সে তার শেকল লাগানো পা-সহ সামনে আগানোর চেষ্টা করে বলতে থাকে, “আপনারা কী সেই জাহাজের যেটাকে ঐ মাথা মোটা ক্যাপ্টেন ট্রাম্প ধরতে চেয়েছিল?”
“আমি স্যার হেনরি কার্টনি,” গোল্ডেন বাউ-এর ক্যাপ্টেন। যুবক লোকটি বলে উঠে, “তুমি জেনে খুশি হবে যে তোমার বন্দিদশা শেষ হয়েছে।”
কার্টনি মত দেহটির দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করে, “এই লোকটি কীভাবে মারা গেছে?”
“তুমি যখন তাকে শ্বাসরোধ করতে গিয়ে অনেক সময় নিচ্ছিলে, ঠিক তখনই সে মারা গিয়েছিল-তোমার উপর বিরক্ত হয়ে।” স্বর্গীয় কণ্ঠটি বলে উঠল।
“ক্ষুধা?” পেট একটা কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে জবাব দেয়। আমি কোনো কবিরাজ নই ক্যাপ্টেন। আমি যদিও এই গরিব লোকটিকে ভালভাবে চিনি না কিন্তু আপনি এখন যা দেখছেন সেটা হয়তো আমি আটকাতে পারতাম। এই জাহাজটা আসলে ক্ষুধার্ত নাবিকদের জাহাজ। তারা আমার প্রতি কোনোরকম মানবিকতা দেখায় নি। আরেকটি মুখ বাড়বে ভেবে তারা আমাকে এই অন্ধকার, পাতালপুরীতে নিক্ষেপ করে। কিন্তু এই লোকটিই আমার একমাত্র সঙ্গী ছিল। এই লোকটিকে আমি আমার নিজের হাতে সমাধিস্থ করতে চাই, “ক্যাপ্টেন, যদি আপনার অনুমতি থাকে তো। অন্য কেউ এই লোকটির দুর্দশা দেখার আগেই ওটা করতে চাই আমি।”
