“হুম…”, হাল মাথা নাড়াল এবং ভাবতে লাগল অ্যাবোলির কথার কি জবাব দেয়া যায়। তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা কেবল সমুদ্রে রাজত্ব চালানোর জন্যই হয়েছে। সে কোনোভাবেই একজন পরাজিত ক্যাপ্টেন-এর জাহাজকে ছেড়ে দিতে পারে না।
সে অ্যাবোলির দিকে ফিরে শুদ্ধ ইংরেজিতে বলে উঠল, “আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। হাল কথাটা এমনভাবে বলল যেন নাবিকেরা শুনতে পায়, সেই সাথে তার কথা থেকে সাহস নিতে পারে।” “ডেনিয়েলকে বল ক্যাপ্টেন ট্রোম্পকে উপরে নিয়ে আসতে। তাকে আমাদের এখানে প্রয়োজন হবে।”
হাল-এর কথা শুনে জাহাজের অন্য সবার চেয়ে যে বেশি খুশি হলো সে হচ্ছে, অ্যাবোলি।
*
ডেফট জাহাজটার নোঙর এখনো ফেলে রাখা হয়েছে। নেড সে টেইলর গোল্ডেন বাউকে ঘুরিয়ে পূর্বদিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে যেন ডেফট-এর বামপাশে চলে যাওয়া যায় সহজেই। এতে করে ডেফট-কে উপকূলের মাটি আর গোল্ডেন বাউ-এর মাঝখানে আটকে ফেলা যাবে। কাছে যেতে যেতে গোল্ডেন বাউ যখন ডেট থেকে দুই নটিকেল মাইল দূরত্বে চলে এলো তখন হাল দেখতে পেলো যে কিছু নাবিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ডেফট-এর ওপর অবস্থান করছে। কেউ কেউ মাস্তুলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিছু নাবিক পাল ছাড়ার ব্যবস্থা করছে। হাল বুঝতে পারে ট্রাম্প গোল্ডেন বাউ আক্রমণ করতে যাওয়ার সময় কিছু কঙ্কালসার নাবিক জাহাজে রেখে গিয়েছিল। হাল বামহাতে তার চকচকে পাথর খচিত বন্দুক আর ডানহাতে তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যেটার শরীর থেকে এই কিছুক্ষণ আগেই শত্রুর রক্ত পরিষ্কার করেছে সে।
“ক্যাপ্টেন, আমাদের পতাকা দেখে তারা হয়ত সহজেই বুঝে ফেলবে। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে ওরা,” বিগ ডেনিয়েল হালকে বলল।
বাউ-এর ডেক-এর ওপর শুধু অল্প কয়েকজন নাবিক রয়েছে যারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে নিজেদের লুকিয়ে রাখার। আর বাকি সবাইকে হাল নিচে থাকার আদেশ দিয়েছে যেন তারা হাল আদেশ দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত ট্রোম্প-এর বন্দিদশা নিশ্চিত করতে পারে।
ট্রোম্প নিজে ডেকের পেছন দিকে হাল-এর কাছ থেকে আট ফিট দূরে দাঁড়িয়ে আছে আর ডান হাতে হাল-এর কথা বলার সিঙাটা ধরে আছে।
সকালের ঠাণ্ডা বাতাস এখনো বইছে। যদিও ওলন্দাজটার চেহারা থেকে নদীর মতো করে বইছে ঘামের পানি। অ্যাবোলি ছুরি হাতে নিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা তরবারিটা সে এমনভাবে ধরে আছে যে যদি ওলন্দাজটা কোনোরকম নড়াচড়া বা চালাকি করার চেষ্টা করে তবে সে খুব সহজেই খোঁজা হয়ে যাবে।
“সবকিছ যদি আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়, তাহলে শক্ররা মনে করে বসবে যে ওদের ক্যাপ্টেন আমাদের জাহাজটা জিতে নিয়েছে, বিগ ডেনিয়েল প্ল্যানটা সবাইকে বুঝিয়ে বলল। “আর সেখানেই ভুলটা করবে তারা।”
হাল-এর বাকি সব লোক অস্ত্র হাতে এখানে সেখানে লুকিয়ে আছে। প্রস্তুত হয়ে আছে যে কখন তাদের এখান থেকে বের হওয়ার ডাক আসবে। জাহাজে লাগানো বন্দুকের মুখগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে বন্দুকের পেছনে লোক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বন্দুকে গান পাউডর ভর্তি করা হয়েছে যেন আদেশ করা মাত্রই ওরা ডেট-এ গুলি চালাতে পারে।
হাল-একটা গভীর শ্বাস নেয়। পাশে রাখা আলকাতরার ট্যাংক থেকে ভেসে আসা গন্ধ তার ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে। ট্রোম্প-এর দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠে, “এবার আপনাকে যা বলতে বলেছি তা বলুন, স্যার,নয়তো যেকোনো মুহূর্তে আপনি নপুংসক হয়ে যাবেন।”
ওলন্দাজটা বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করতে লাগল। থুতনিতে থাকা দাড়িগুচ্ছকে নাড়াচাড়া করতে লাগল হাত দিয়ে। নিচের দিকে তাকিয়ে তার দুই পায়ের মাঝখানে তাক করা তরবারিটার দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ, এরপর কথা বলার সিঙাটা মুখের কাছে এনে সোজা সামনের দিকে তাকাল, এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কথা বলতে শুরু করল।
“ডেফট-এর লোকেরা আমার কথা মন দিয়ে শোন। আমরা অনেক বড় একটা বিজয় ছিনিয়ে এনেছি”, হাল খুব ভাল করেই জানে শান্ত পানির ওপর দিয়ে ট্রোম্প-এর কথা ভেসে গিয়ে ডেফট-এর লোকদের মনে কতটা আনন্দের জোয়ার বয়ে আনবে। “আমি তোমাদের জন্য ইংরেজদের জাহাজ গোল্ডেন বাউ জয় করে নিয়ে এসেছি। এর ভেতর যত ধন সম্পদ আর গুপ্তধন রয়েছে সব এখন তোমাদের।”
ডাচদের জাহাজ থেকে আনন্দ উল্লাসের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। ট্রোম্প বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে তার হাতের মুষ্টি আকাশের দিকে তুলে ধরল। তাকে আর কিছু বলতে হবে না। তার কাজ শেষ হয়েছে। অ্যাবোলি হাল-এর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল। কৌশল কাজে লেগেছে।
যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের জাহাজটা ডেফট-এর সাথে গিয়ে ধাক্কা লাগল ততক্ষণ পর্যন্ত হাল অপেক্ষা করল।
“বের হয়ে এসো সবাই,” হাল গর্জে উঠার সাথে সাথেই জাহাজের পাটাতনগুলো খুলে দেয়া হল। সাথে সাথে অস্ত্রে সজ্জিত মুখোশ পরা সব ইংরেজ, স্কটিশ আর আইরিশ লোকেরা সমস্বরে যুদ্ধনিনাদ দিতে দিতে বের হয়ে এল। তাদের পেছনে অ্যামাডোড়া সৈন্যরাও কুঠার হাতে বের হয়ে এসে আরেকবার তাল মেলালো সবার সাথে।
নাবিকরা সবাই এসে ডেক-এ জমা হওয়ার পর হাল কথা বলার শিঙাটা আবার হাতে তুলে নিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ট্রোম্পও ওটাকে হাল-এর হাতে দিয়ে দিল। অ্যাবোলির তাক করে রাখা ছুরিটার দিকে আবারো তার নজর গেল-সেটা যেকোনো মুহূর্তে তার বংশ উৎপাদনের অঙ্গটা কেটে ফেলতে পারে।
