“আমি বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী লোক, ক্যাপ্টেন কার্টনি।” সে সাধারণভাবেই কথাটা বলল। তার কথা শুনে মনে হচ্ছে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার কাছে ক্ষুধার মতোই ভয়ংকর, যে ক্ষুধা তাকে অল্প কয়েকজন নাবিক নিয়ে এত বড় অস্ত্রসজ্জিত জাহাজ আক্রমণে তাড়িত করেছে।
“তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল্য এখন তোমাকে জীবন দিয়ে দিতে হবে।” হাল বলল। সে তার ঔদ্ধত্য, উগ্রতা থামিয়ে রাখার চেষ্টা করল। তার বাবা একসময় তাকে বলেছিল বিজয়ী যোদ্ধাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হয়। প্রতিশোধ স্পৃহাকে ঝেড়ে ফেলতে হয়। সেই ধৈর্যশীলতাকে সে কোমলতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। একজন মহান যোদ্ধা হতে গেলে এই ভুলগুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির যে চুক্তি হয়েছিল তুমি সেটা ভেঙে ফেলেছ, ক্যাপ্টেন ট্রাম্প।” নিজের তলোয়ারের রক্ত একটা রুমাল দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে হাল ওলন্দাজটাকে বলল।
“চুক্তি হয়েছিল নাকি? ট্রোম্প চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে জানতে চাইল।”
“তুমি জান না? মাথা মোটা কোথাকার!” মাস্তুল-এর পেছনে লুকিয়ে থাকা হাল-এর একজন লোক চিৎকার দিয়ে উঠে।
“ক্যাপ্টেন ট্রোম্প, চুক্তি না হলেই বরং খুশি হতো, এখানে এমন লোক তুমি একা নও।” হাল বলতে থাকে। এই চুক্তি নাহলে আমি অন্তত খুশিমনে সীমান্তের ভেতরে, বাইরে, এমনকি নরকের দরজা থেকেও ওলন্দাজ ধরে এনে হত্যা করতাম। আমিও আমার বাবার মতো ওলন্দাজদের মৃত্যুর দূত হতাম। দুই দিন আগে যখন তোমার ছায়া দেখতে পাই আমি তখনই তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতাম।”
“শুনে ভাল লাগল যে, আমাদের দুই দেশ তাদের পুরোনো শত্রুতা ভুলে গিয়েছে। ট্রোম্প খুব ধূর্ত হাসি দিয়ে কথাটা বলল। যে হাসিটার জন্য হয়তো বা অনেক সুন্দরী নারী সারাজীবনের জন্য তার গোলাম হয়ে যেতে রাজি হয়ে যাবে।
ট্রোম্প-এর চেহারা ক্ষুধায় কুচকে যাচ্ছিল। তারপরও হালের মনে হলো যে মেটে রঙের চুল আর ইন্ডিয়ান মহাসাগরের মতো একই রঙের চোখ নিয়ে গঠিত টোম্প-এর চেহারাকে বেশ হ্যান্ডসামই বলা যায়। হাল বুঝতে পারে অ্যাবোলি ঠিকই বলেছে। ট্রোম্প কখনোই জড়িথকে হত্যা করতে পারত না। পাশার দান উল্টে দিতে গিয়ে সে নিজেই হেরে গিয়েছে। এখন সে হাল-এর বন্দি, আর সমুদ্রের নিয়ম অনুযায়ী তার জাহাজ ডেফটও এখন হলি-এর দখলে।
যখন হাল চারদিকে পরীক্ষা করে দেখছিল, তখন সে বুঝতে পারে যে ওলন্দাজরা বাউ আক্রমণ করার জন্য দুটি পানসিতে করে এসেছিল। তবে একদম সামনা সামনি এসে আক্রমণ চালানোর কারণে ওদের সাহসের প্রশংসা করতেই হয়। ওরা হয়ত গোল্ডেন বাউ দখল করেই ফেলত যদি না অ্যামাডোডা সৈন্যরা খোলা আকাশের নিচে না ঘুমাত। তারা সবাই মিলে একসাথে। চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধ করেছে। আর সবশেষে জুডিথ-এর সাহস আর দক্ষতাই গোল্ডেন বাউকে ওলন্দাজদের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছে। এখন জুডিথ-এর জন্য হাল-এর বেশ গর্ব হচ্ছে।
নাবিকেরা জুডিথকে তার সাহসের জন্য অভ্যর্থনা জানানোর পর সেই গর্ব আরও বেড়ে গেল। তারা জুডিথকে আগে থেকেই পছন্দ করত, তার খ্যাতির প্রশংসা করত। কিন্তু আজকে তারা স্বচক্ষে দেখল যে জুডিথ আসলে কি করতে পারে। জুডিথকে নিয়ে তাদের সমস্ত ভয় এখন গর্বে পরিণত হয়েছে।
“যাও গিয়ে বিশ্রাম নাও”, হাল জুডিসকে বলে। ওদিকে বিগ ডেনিয়েল আর অ্যাবোলি, ট্রাম্প আর তাদের লোকদের ঠিক মতো বাঁধা হচ্ছে কি-না, তা দেখছে। উইলিয়াম স্টেলি আর অন্যান্য নাবিকরা মৃতদেহগুলো জাহাজ থেকে সরাচ্ছে।
“আমি প্রার্থনা করেছিলাম আমার যেন আর মানুষ খুন করতে না হয়।” জুডিথ তার একটা রক্তমাখা হাত পেটের ওপর রেখে কথাটা বলল। যদিও সে ভয় পাচ্ছিল যে তার পেটের ভেতর থাকা সন্তান যদি কোনোভাবে এসব দ্বারা প্রভাবিত হয়।”
“তুমি জাহাজটা রক্ষা করেছে। মাই হার্টু,” হাল খুব নরম সুরে বলে।
“আমি এক পর্যায়ে ভয়ই পাচ্ছিলাম যে আমার কারণে না আবার তোমাদেরকে জাহাজ হারাতে হয়”, জুডিথ উত্তর দিল। এরপর সে ওলন্দাজ বন্দিদের দিকে তাকিয়ে দেখে ওদেরকে জাহাজের একেবারে নিচের ডেক-এ বন্দিখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে হাল-এর হাতের ওপর একটা নরম ছোঁয়া দিয়ে বলে, “ওদের ক্ষতি করো না।”
“না, আজকে আর কোনো খুনোখুনি নয়।” সে তাকে আশ্বস্ত করে। এরপর হাল পূর্ব দিকে তাকায় যেদিকে সাগরের বুক চিরে সূর্যের সোনালি রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই বলে, “যদি ক্যাপ্টেন ট্রাম্প তার জাহাজ আমার হাতে দিয়ে দেয়, তো এসবের আর দরকার হবে না।”
“আপনি চিন্তা করবেন না, ম্যাম, লোকটা এটাই করবে। নাহলে যে তাকে হাঙর-এর মুখে তুলে দেয়া হবে, সেটা সে ভাল করেই জানে।” বিগ ডেনিয়েল ক্যাপ্টেন ট্রাম্পকে ধাক্কা দিয়ে জাহাজের ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল।
আবোলি তাকিয়ে দেখল পরাজিত ক্যাপ্টেন-এর মাথা আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এরপর সে হাল-এর সঙ্গে নিজের ভাষায় কথা বলতে শুরু করল যেন অন্য কেউ তা বুঝতে না পারে। আমরা জাহাজ আক্রমণ করতে গেলে যদি ওদের নাবিকেরা আমাদের বাধা দেয় গান্ডওয়েন? আমরা আজকে আমাদের যথেষ্ট লোক হারিয়েছি। আমরা আক্রমণ চালালে হয়ত আরও লোক হারাব। আর বাতাসও আজকে খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। যদি ওরা কোনোভাবে জানতে পারে আমরা আসছি তাহলে ওরা আরও সতর্ক হয়ে যাবে।”
