ট্রোম্পস-এর লোকেরা সাথে সাথে উল্লাসধ্বনি করে উঠল। গোল্ডেন বাউ এর নাবিকেরা হতবাক হয়ে হাল-এর দিকে তাকিয়ে রইলো। তাদের হাতে এখনো রক্তমাখা অস্ত্র। হাল আদেশ দিলেই তারা আরেকবার গর্জে উঠবে। গোল্ডেন বাউ-এ রক্তের বন্যা বইয়ে দিবে। কিন্তু হাল-এর ভালবাসা আর তার আগত সন্তানের কারণে ওরা সেটা করতে পারছে না।
“আমরা এক থেকে পাঁচ গুনব”, ক্যাপ্টেন ট্রোম্প। হাল জুড়িথের প্রতি তার দুর্বলতা লুকোনোর চেষ্টা করে গর্জে উঠল। এবং আশা করল জুডিথও যেন সেটা বুঝতে না পারে। একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে জাহাজের প্রতি তার দায়িত্বকে সে সবকিছুর উপরে উঠিয়ে আনার চেষ্টা করে।
“কিন্তু আপনি এখন আর যুদ্ধ করছেন না”, ট্রোম্প বলে উঠে। তাই আমি বলতে পারি যে, এই নারীকে বাঁচানোর জন্য আপনি যেকোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি আছেন, তাই না?” “ক্যাপ্টেন আমি মনে করি যে, আপনি একজন ভদ্রলোক। যে কারণে আপনি হাতের তলোয়ার ফেলে দিয়েছেন সেটা শুধুই একজন নারীর জীবন রক্ষা করার জন্য নয়। এই মেয়ের কাছে আপনার হৃদয় দিয়ে বসে আছেন, তাই না, ক্যাপ্টেন?”
জুডিথ-এর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল হাল। ভোরের সূর্যের আলোতে সে ঐ চোখের তেজ দেখতে পেল পরিষ্কারভাবে। জুডিথ-এর মধ্যে ভয়ের কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছে না সে। একজন লোক পেছন থেকে তার গলায় ছুরি ধরে থাকার পরেও জুডিথ স্থিরচিত্তে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
‘“আমার মনে হয় না ওরা জুডিথকে হত্যা করবে,” হাল-এর কাঁধের ওপর দিয়ে অ্যাবোলি ফিসফিসিয়ে বলে উঠে, “কারণ ওরা জানে যে ওরা যদি এটা করে তবে ওরা সকলেই এখানে মারা পড়বে।”
|“আমাদেরকে শুধু একবার আদেশ দিন। আমরা ওদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলব। রবার্ট মুন নামে গোল্ডেন বাউ-এর একজন সর্দার হালকে উদ্দেশ্য করে বলে।”
জন লোভেল নামে আরেকজন সর্দার ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠে, “আমরা ওদের কলিজা কেটে হাঙরকে খেতে দিব।”
হাল তার মস্তিষ্কে এক ধরনের চাপ অনুভব করে। এরকম মুহূর্তে তার কী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত সে বুঝতে পারছে না। একদিকে তার জাহাজ, তার নাবিকেরা আর অন্যদিকে তার ভালবাসার মানুষটা, যার পেটে তার সন্তান।
“আমি কীভাবে ওর ক্ষতি হতে দেই অ্যাবোলি?” হাল ফিসফিস করে বলে উঠে, সেই সাথে তার তলোয়ারটা নামিয়ে নিতে শুরু করে। ঠিক সেই মুহূর্তেই জুডিথ মাথা দিয়ে তার গলা ধরে থাকা লোকটার নাকে সজোরে আঘাত করে। লোকটার নাকে ডিমের খোলস ভাঙার মতো আওয়াজ পাওয়া গেল। ব্যথায় কাতরে উঠে লোকটি। নাবিকটি সাথে সাথে জুডিথকে ছেড়ে দিল, এরপর ছুরিটা ফেলে দিয়ে দুই হাত দিয়ে রক্তাক্ত নাকটা চেপে ধরল। মুহূর্তের মধ্যেই জুডিথ তার তলোয়ার উঠিয়ে নিল, এরপর তার দিকে এগিয়ে আসা লোকটির পেটে ঢুকিয়ে দিল বাটসহ। পরক্ষণেই ট্রোম্প-এর দিকে লাফ দেয় সে। ট্রোম্প-এর সমস্ত মনোযোগ ছিল হাল-এর দিকে। তার পেছনে কি ঘটে যাচ্ছে এটা বুঝতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগে। যতক্ষণে সে বুঝতে পারে ততক্ষণে জুডিথ তার তলোয়ার-এর লম্বা অগ্রভাগ ট্রাম্প-এর গলায় বসিয়ে দিয়েছে।
এটা দেখার সাথে সাথে ট্রোম্প-এর কিছু লোক হাল-এর লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যুদ্ধ কিংবা মৃত্যু এই দুটোর যে কোনো একটি তাদের বেছে নিতে হবে। কিন্তু তারা টিকতে পারে না। ট্রোম্প-এর বাকি লোকেরা হাঁটু গেড়ে বসে হাতের তলোয়ার উঁচিয়ে ধরল-আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে ওরা।
“ইট ইজ ওভার, ক্যাপ্টেন”, অ্যাবোলি ট্রোম্প-এর গলায় জুডিথ-এর ধরে রাখা তলোয়ারটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে।
এই লোকগুলো জুডিথকে কতটা বিপদের মুখে ফেলেছিল, সেই সাথে তার জাহাজকে আত্মসমর্পণের কতটা শেষ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, এটা মনে আসা মাত্র হাল প্রচণ্ড রাগে, ক্ষোভে উন্মত্ত হয়ে উঠে। হাল সামনের দিকে এগিয়ে ট্রোম্প-এর গলা কেটে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু অ্যাবোলি তার কাঁধে হাত রেখে বাধা দিল।
“ইট ইজ ওভার”, সে আবারও বলে। ক্রোধ থামিয়ে নিজের শরীর আর পেশিকে শান্ত করতে হাল-এর কিছুটা সময় লাগে। তারপর সে হেঁটে হেঁটে জুডিথ আর ক্যাপ্টেন ট্রোম্প-এর দিকে এগিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন ট্রোম্প আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তার তলোয়ার-এর বাটটা সামনের দিকে এগিয়ে রেখেছে। জুডিথ-এর কাস্কারার অগ্রভাগ এখনো ট্রোম্প-এর গলায় ঠেকানো আছে।
“আমি আত্মসমর্পণ করলাম, ক্যাপ্টেন কার্টনি”, ওলন্দাজটা তার নাকটাকে হাল-এর দিকে ঘুরিয়ে বলল। সে তার মাথাটাকে এক বিন্দুও এদিক সেদিক নাড়ানোর সাহস পাচ্ছে না।
“এত সহজ নয়”, হাল গর্জন করে উঠে এবং তলোয়ারটা তার হাত থেকে কেড়ে দিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাবোলির দিকে ছুঁড়ে মারে। “তোমার মতো বোকার পক্ষেই আমার জাহাজ কেড়ে নেয়ার কথা চিন্তা ভাবনা করা সম্ভব।”
হাল জুডিথ-এর দিকে তাকায়। জুডিথ দ্রুত মাথা নাড়িয়ে তাকে আশ্বস্ত করে যে, সে আর তার সন্তান অক্ষত আছে। তার হয়ত একে অপরকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে বিজয় উদযাপন করার সময় পাবে, কিন্তু সেটা এখন নয়।
ট্রোম্প তাকিয়ে তাকিয়ে তার সামনে ঘটে যাওয়া ব্যক্তিগত নাটক দেখতে লাগল। বিশালদেহী আফ্রিকান আর তারা ক্যাপ্টেন-এর মধ্যেকার নিবিড় বন্ধন অনুভব করতে পারল সে। সেই সাথে বুঝতে পারল সেই আত্মিক বন্ধন, যেটা ক্যাপ্টেন আর তার সেই প্রেয়সীর মাঝে বিদ্যমান, যে অপূর্ব রূপসী হয়েও অন্য যেকোনো বীর পুরুষের ন্যায় যুদ্ধ করতে পারে।
