তাদেরকে জিততে হবে। জুডিথকে বেঁচে থাকতে হবে। তার নিজের জন্য না হলেও তার ভেতরে বেড়ে ওঠা অনাগত সন্তানের জন্য বেচে থাকতে হবে। সে নিজের ভেতর যুদ্ধ করার এক ধরনের স্পৃহা, এক ধরনের প্যাসন অনুভব করে। সে জানে শত্রুপক্ষকে কখনো তার মুখোমুখি আসতে দেয়া যাবে না। তার আগেই যেভাবে হোক তাদের প্রতিহত করতে হবে। কেবিনের দরজার পাশে সে এরই মধ্যে দুই তিনজনকে ধরাশায়ী করে ফেলেছে। পরবর্তী আক্রমণের জন্য কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করতে থাকে সে। যখন দেখে কেউই আসছে না তখন সে আস্তে আস্তে কেবিনের বাইরে বের হয়। কোয়াটার ডেক এর দিকে এগুতে থাকে যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা দেখার জন্য।
জুডিথ-এক সেকেন্ডের জন্য থামে। কিন্তু সেই এক সেকেন্ড সময়ই তার জন্য অনেক দীর্ঘ সময় হয়ে দাঁড়ায়। সে হঠাৎ বুঝতে পারে যে পেছন থেকে কেউ একজন তাকে ধরে ফেলেছে। একটা হাত তার কোমড় জড়িয়ে ধরেছে, আরেকটা হাত তার গলায়। পেছনের লোকটি তাকে আঁকড়ে ধরে উপরে উঠিয়ে ফেলে। হাত দিয়ে, তলোয়ার দিয়ে নানাভাবে লোকটিকে আঘাত করে মুক্ত হবার চেষ্টা করে জুডিথ, কিন্তু তার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
লোকটি হাসতে হাসতে চিৎকার করে ওলন্দাজ ভাষায় কিছু একটা বলছিল।
জুডিথ ওলন্দাজ ভাষা জানে না। কিন্তু সে বুঝতে পারে লোকটি চিৎকার করে ক্যাপ্টেনকে ডাকছে। সে খুব ভালভাবেই জানে যে হাল কখনোই জুডিথের জীবনের ঝুঁকি নিবে না। এমনকি গোল্ডেন বাউ-এর জন্যও না। তার মানে হচ্ছে, জুডিথ যার কজায় থাকবে, গোল্ডেন বাউও তারই হবে।
জুডিথ অসহায়ভাবে তলোয়ার ফেলে দিয়ে হাল ছেড়ে দেয়। তলোয়ার নিচে পড়ার শব্দ তার কানে যায় না। সে শুধু বুঝতে পারে যে তার কারণেই গোল্ডেন বাউ আজকে যুদ্ধে হেরে যাবে।
.
জুডিথ-এর পেছনে একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পায় হাল। সাথে সাথে সে বুঝতে পারে যে জুডিথ কোনো একটা বিপদে আছে। তার এবং জুডিথ-এর মাঝখানে ওলন্দাজ আর অ্যামাডোডা যোদ্ধারা আছে। সবার মাঝখান দিয়ে জুডিথ-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। জুডিথকে ধরে ফেলে লোকটি, এরপর ঝাঁপটে ধরে তার গলায় ছুরি বসিয়ে দেয়।
তাদের সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে যাকে জুডিথ ওলন্দাজ ক্যাপ্টেন বলে সনাক্ত করে। তার পোশাক অন্যান্য নাবিকদের চেয়ে একটু আলাদা। সিল্কের পাড় দেয়া সাদা রঙের ওয়েস্টকোট পরে আছে লোকটা। সামনে এগুতে এগুতে লোকজনকে আদেশ দিচ্ছে সে। হঠাৎ মাথার হ্যাটটা খুলে ডেক-এর ওপর ভেসে থাকা ধোয়ার মধ্যে ছড়িয়ে দিল ক্যাপ্টেন। পূর্ব দিকে আস্তে আস্তে সূর্য উঠতে থাকে। সকালের কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলো জাহাজের ওপর পড়তে শুরু করেছে। ওলন্দজরা যদি আর কিছুক্ষণ পর আসত তাহলে হাল ওদেরকে জাহাজে উঠার সুযোগই দিত না। কিন্তু ভাগ্য আজ শত্রুদের পক্ষে।
হাল সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তার ধারালো তলোয়ারটা এখনো তার হাতে ধরা। কিন্তু এটা ব্যবহার করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। সবাই আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে। তাই এখন আর লড়াই করার চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। লড়াই বাদ দিয়ে কেউ কেউ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কেউ কেউ ব্যথায় চিৎকার করছে। একজন তার উড়ে যাওয়া ডান হাতটা বাম হাত দিয়ে ধরে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে-ভাবছে, ওটা কিভাবে এখানে এল।
“আমি স্যার হেনরি কার্টনি। গোল্ডেন বাউ-এর ক্যাপ্টেন।” হাল চিৎকার করে বলল, এরপর নিজের তলোয়ারটা ডাচ্ ক্যাপ্টেন-এর দিকে বাড়িয়ে দিল। “আর তুমি? তুমি একজন কাপুরুষ!” তুমি চোরের মতো একজন নারীকে পেছন থেকে আক্রমণ করে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছ।’
ওলন্দাজ ক্যাপ্টেন ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকাল। পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি ফিরে এলো সামনের দিকে। “যে নারী পুরুষের মতো যুদ্ধ করতে পারে তাকে আমাদের সেভাবেই ভাবা উচিত। কাঁধ ঝাঁকাল ক্যাপ্টেন, এরপর চেহারায় এক ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে বলল, “এসবে কী আসে যায়? চলুন আমরা এসব অর্থহীন যুদ্ধ বন্ধ করে ভাল মানুষের মতো কথা বলি।”
দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায় হাল। সে তার আগের প্রেমিকা সুকিনাকেও একই রকম পরিণতি বরণ করতে দেখেছে-ওই সময় সেও তার সন্তান-এর মা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। সুকিনা আর তার অনাগত সন্তান হাল-এর বাহুর উপরে মারা গিয়েছিল। সে জুডিথেরও একইরকম পরিণতি দেখতে চায় না। সে চায় না তার আরেকটি সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগে মৃত্যুবরণ করুক।
যে কারণে সে আর তার নাবিকেরা প্রাণপণে যুদ্ধ করেছে, সেটা সে এত সহজে কীভাবে ছেড়ে দেয়? একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে এখন তার কী আচরণ করা উচিত? কোয়ার্টার ডেক-এর দিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ মনে মনে ভাবতে লাগল যে তার বাবা স্যার ফ্রান্সিস সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। গর্বিত, সোজা মস্তকে তার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি, সেই সাথে হাল-এর মধ্যে নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।
কিন্তু সেই প্রতিচ্ছায়া হালকে বলে দিল যে এখন কি করতে হবে। গোল্ডেন বাউ তারই জাহাজ ছিল। সে-ই এটার প্রথম ক্যাপ্টেন ছিল।
“আমি ডেফট-জাহাজের ক্যাপ্টেন, ট্রোম্প। আর এখন দেখা যাচ্ছে…” ওলন্দাজটা মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলতে শুরু করল, “…এখন থেকে এই গোল্ডেন বাউ-এরও ক্যাপ্টেন।”
