“গোল্ডেন বাউ-এর অধিবাসীরা কোথায়?” সে চিৎকার দিয়ে উঠে। তার সাথে সাথে অ্যামাডোডারাও হর্ষধ্বনি দিয়ে সামনের দিকে ধেয়ে গেল। ততক্ষণে গোল্ডেন বাউয়ের বাকি ক্রু মেম্বাররাও চলে এসেছে।
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাল আর অ্যাবোলি শত্রুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ওদিকে গুলি ভরা পিস্তল হাতে ওলন্দাজরা এগিয়ে আসছে।
এক বিশাল আকারের ওলন্দাজ-যার ঘন কালো দাঁড়িতে সমস্ত মুখ প্রায় ঢেকে আছে-তার বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়ে, এরপর ওটা দিয়ে পেছন দিকে সজোরে আঘাত করে। তিনজন অ্যামাডোডা সৈন্য মাটিতে লুটিতে পড়ল। কিন্তু বিগ ডেনিয়েল এখনো টিকে আছে। তার তলোয়ার একটা মৃত মানুষের কাঁধে আটকে আছে। কিন্তু তার গায়ের শক্তিও কোনো ধারালো অস্ত্রের চেয়ে কম নয়। সে তার বাহু দিয়ে আঘাত করে এক ওলন্দাজের হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিল। এরপর লোকটার দাড়ি দুইহাত দিয়ে ধরে সামনে টেনে নিয়ে যেতে লাগল, এরপর নিজের মাথা দিয়ে ওলন্দাজটার নাকে আঘাত করে বসলো। হাড় ভেঙে যাওয়ার যে শব্দটা হলো তা এই বিশৃংখলার ভেতরেও শুনতে পেল হাল।
ওলন্দাজটার মুখ আর দাড়ি রক্তে ভিজে গিয়েছে। বিগ ডেনিয়েল অন্যদিকে তাকিয়ে মৃত লোকটার কাঁধ থেকে নিজের তলোয়ার ছাড়িয়ে আনে। এরপর কসাই যেভাবে মাংসের দিকে তাকায়, ঠিক সেভাবে ওলন্দাজটার দিকে তাকাল।
হাল চিৎকার দিয়ে বিজয়ের উল্লাস করে উঠে। হঠাৎ আক্রমণ করে ডাচ যে সুবিধাটা পেতে চেয়েছিল সেই সুবিধাটা ওদেরকে পেতে দেয়নি গোল্ডেন বাউ-এর নাবিকেরা। তারা অতিদ্রুত প্রস্তুত হয়ে দক্ষতার সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বিজয় এখনো সম্পূর্ণ তাদের হাতে আসেনি। কিন্তু হাল সেই ছোটবেলা থেকেই জাহাজের ওপর যুদ্ধ ক্ষেত্র দেখে শিখেছে যে বিজয় কার দিকে যেতে পারে। শেষ মুহূর্তের কোনো আক্রমণও যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সবাইকে একত্র করার উদ্দেশ্যে চিৎকার দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে সে অ্যাবোলির কণ্ঠ শুনতে পায়।
“গান্ডওয়েন!”
সে ঘুরে তাকায়-অ্যাবোলি তলোয়ার হাতে নিয়ে জাহাজের পেছনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
“না”, সে নিজের অজান্তেই বলে উঠে, “এটা হতে পারে না।”
*
জুডিথ অসুস্থ হওয়ার কারণে বিছানা থেকে উঠে বমি করার জন্য একটা বেডপেন খুঁজতে বের হয়। এই বমি বমি ভাবটাই তার জীবনকে বাঁচিয়ে দেয়। সে দেখতে পায় কুয়াশার মধ্যে কিছু ছায়াশরীর এগিয়ে আসছে। ক্যাপ্টেন-এর জানালা দিয়ে গোল্ডেন বাউ-এর ভেতরে ঢুকছিল লোকগুলো। এরপর ওদের মাঝেই একজন লোক পেন্ডুলাম-এর মতো দেখতে একটা মোটা রশি ঝুলিয়ে দেয় গোল্ডেন বাউ জাহাজ থেকে। সেই রশি বেয়ে আরো ছায়াশরীর উপরে উঠতে থাকে।
শত্রুর জন্য অপেক্ষা করছে জুডিথ। তার পরনে ছিল নাইট গাউন, হাতে শোভা পাচ্ছে ওর তলোয়ার যাকে সে কাস্কারা বলে ডাকে। ভাগ্যিস, গোল্ডেন বাউতে আসার সময় তার লাগেজের সাথে করে অন্যান্য মিলিটারি সরঞ্জামের সাথে ছোট্ট তলোয়ারটা এনেছিল!
যে ওলন্দাজটা সবার প্রথমে তার কেবিনে ঢোকার জন্য পা বাড়িয়েছিল, তার পুরো শরীর ভেতরে আনার আগেই কাস্কারার এক কোপে গলাটা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল। লোকটি যখন পড়ে যাচ্ছিল তখন জুডিথ অনেকটা নতত্যর ভঙ্গিতে খুব দ্রুত তার কাছ থেকে সরে গিয়ে দ্বিতীয় আক্রমণকারীর দিকে এগিয়ে যায়, এরপর লোকটির পেছনে গিয়ে কিডনি বরাবর শক্ত হাতে আঘাত করে। ওলন্দাজটা চিৎকার দিয়ে গোঙাতে গোঙাতে মুহূর্তেই ভূপাতিত হয়ে যায়।
আরও লোকজন জুডিথের কেবিনে ঢুকতে থাকে। জুডিথ বুঝতে পারে সে একটা বড় বিপদের মধ্যে রয়েছে। কেবিনের একপাশে সরে গিয়ে দরজাটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধ করতে থাকে সে। দরজার কাছ থেকে দ্রুত সরে এসে তলোয়ারটাকে যত দ্রুত সম্ভব ঘুরিয়ে শত্রুদের ঠেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে জুডিথ। ক্রমাগত বাড়তে থাকা শক্ৰসংখ্যার বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। হঠাৎ সে বুঝতে পারে যে তার বাম কাঁধের ওপর দিক থেকে একটা আঘাত এগিয়ে আসছে। নিজেকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে আঘাতটা প্রতিহত করার চেষ্টা করে জুডিথ। সেই সাথে নিজের তলোয়ারটা আক্রমণকারীর বাহুতে বসিয়ে দিয়ে দু’টুকরা করে ফেলে। জুডিথ তার কঠোর যুদ্ধ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে যুদ্ধে টিকে থাকার প্রধান শর্তগুলো হচ্ছে : শত্রুদের চিৎকার চেঁচামেচির ভেতর মাথা ঠাণ্ডা রেখে অস্ত্র চালনায় পূর্ণ মনোযোগ দেয়া, শান্তভাবে প্রতিটি হিসেব কষা, আশেপাশের শত্রুদের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করা, শত্রুর চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করা।
যদিও জুডিথ নিজের জীবন বাজি রেখে প্রাণপণে যুদ্ধ করছে তবুও সে শত্রুদের মধ্যে ভীষণ বেপরোয়া ভাব দেখতে পাচ্ছে। জুডিথের শত্রুদের চোখে মুখে বন্যক্ষুধা উপচে পড়ছে যখন তারা দেখছে যে তাদের তলোয়ার-এর আঘাতকে সে বারবার প্রতিহত করছে। কিন্তু প্রতিটা আঘাত ফিরিয়ে দেয়ার সাথে সাথে তার শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে আসছে।
সে আফ্রিকায় বেড়ে উঠেছে। সে জানে ক্ষুধা কি জিনিস, আর তাই, একজন ক্ষুধার্ত মানুষ দেখেই সে চিনতে পারে। এই হানাদার বাহিনীরা যারাই হোক না কেন তারা এমনভাবে আক্রমণ করছে যেন তাদের হারানোর কিছুই নেই। ওপর থেকে যুদ্ধের গোলাগুলি, চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসছে। জুডিথ বুঝতে পারে যে হাল এবং তার নাবিকেরা প্রাণপণে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছে। গোল্ডেন বাউ-এর ভবিষ্যৎ তলোয়ার-এর তীক্ষ্ণতা আর ধার-এর ওপর নির্ভর করছে।
