হাল উত্তর দিকে তাকিয়ে ডাচদের কোনো চিহ্ন দেখা যায় কি-না সেটা খুঁজতে থাকে। হঠাৎ করে সাদা রঙের কিছু একটা হাল-এর চোখে দৃশ্যমান হলো-পরমুহূর্তেই সে বুঝতে পারল যে ওটা আর কিছুই নয়, বরং মেঘ ভেদ করে চাঁদের আলো বেরিয়ে এসেছে। হাল-এর নিজের দৃষ্টি শক্তির প্রখরতার ওপর আত্মবিশ্বাস আছে। সে জানে জাহাজের অন্য কারও চেয়ে তার চোখের তীক্ষ্ণতা অনেক বেশি। একারণেই সে নিজ চোখে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যকারও ওপর ভরসা করে সে স্বস্তি পাচ্ছিল না। কিন্তু সে চাঁদের মৃদু আলোতে দূর থেকে দূরান্তে দৃষ্টি প্রসারিত করেও কিছু খুঁজে পেল না।
“তাহলে তুমি কোথায়?” সে বিড়বিড় করে নিজের মনে বলে উঠল। রাতের চাদরের কিনারায় লেগে থাকা এক চিলতে রক্তের দাগের মতো করে সকালের সূর্যটা উঁকি দিতে থাকে। জাহাজটা উদ্দেশ্যহীনভাবেই একটু নড়ে উঠল যেন ওটা তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। কুয়াশা জাহাজটার চারপাশটাকে ঘিরে রেখেছে। সামুদ্রিক ঢেউ এসে জাহাজের গায়ে ধাক্কা খেয়ে এক ধরনের মৃদু শব্দ করছে। জাহাজটাও সেই ঢেউ-এর তালে তালে দুলতে থাকে। হাল হয়ত বাচ্চা ছেলের মতো তার কেবিন-এ ঘুমিয়ে থাকত যদি না নেড টেইলর তাকে হঠাৎ করেই ডাকত। সে চাচ্ছিল নোঙর ফেলে এখানেই থেকে যেতে। এরকম জোরালো ঢেউ-এর ভেতর যাত্রা শুরু করাটা ভয়ংকর ব্যাপার হবে, তার চাইতে জাহাজটা এখন যেখানে আছে সেখানে থাকাটাই অনেক নিরাপদ মনে করছে সে।
হাল-এর মনে এখন একটু অপরাধবোধ কাজ করছে। তারুণ্যের পতাকা বহন করে ছেলেমানুষের মতো এখানে উঠে না এসে ক্যাপ্টেন-এর মতো করে ডেক-এ থাকলেই বরং বেশি ভাল হত। কিন্তু সে এখনি হাল ছেড়ে দিতে নারাজ; তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় তাকে বলছে যে এখনো ডাচরা আশেপাশেই রয়েছে। তিনটা পালযুক্ত ছোট্ট একটা কারাভেল ছিল ওটা। হাল অনুমান করল যে ওটা স্পেনিশ বা পর্তুগীজদের কাছ থেকে কেনা হয়েছে, কারণ ডাচদের এরকম কারাভেল দেখা যায় না। ওটা আকারে বড়জোর বাউ-এর অর্ধেক হবে তাই এরকম জাহাজ নিয়ে হাল দুশ্চিন্তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ যুদ্ধ করতে আসলে ওটাকে উড়িয়ে দেয়া বাউ-এর জন্য কোনো ব্যাপারই না।
সে চোখদুটোকে সরু করে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন কুয়াশা ভেদ করে তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে অসীমে। যুদ্ধ শেষে ইংরেজ এবং ডাচদের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যদিও হাল-এর তাতে কিছু যায় আসে না; তার বাবার মৃত্যুর জন্য ডাচরাই দায়ী। কেপ কলোনির ডার্চ গভর্নর-এর আদেশেই তার বাবার ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। যুদ্ধ সে বৈধতা দিয়েছে। যে নিয়ম। বেঁধে দিয়েছে সেটা হাল মেনে নিয়েছে। কিন্তু সুযোগ পেলে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিবে সে। ডাচদের রক্তের বন্যা বইয়ে দিবে।
হঠাৎ তার মনে হলো যে সে ডাদের জাহাজটাকে দেখতে পেয়েছে। কিন্তু ওটা নিমিষেই কোথায় যেন গায়েব হয়ে যায়। অ্যাবোলি ঠিকই বলে? স্যার ফ্রান্সিস হালকে জাহাজ পরিচালনার জন্য যথাযযাগ্যভাবেই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এছাড়াও আরও একটা ব্যাপার আছে যেটা হালকে তার বাবা শিখিয়ে দেয় নি। কিন্তু একজন যোদ্ধার সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে সেটা এমনিতেই তার মধ্যে তৈরি হয়েছে। হাল অনুভব করে সেই সহজাত প্রবৃত্তি যেটা তার রক্তের সাথে মিশে শিরায় প্রবাহিত হয়। সেই সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই সে তার নরম বিছানা এবং বিছানার ওপর সুন্দরী রমণী রেখে উঠে আসতে পেরেছে। সেই সহজাত প্রবৃত্তিটাই তাকে এখনকার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছে।”
গোল্ডেন বাউ-এর ডেক-এর ওপর উড়ে আসা হুকগুলোকে হাল প্রথমে দেখতে পায়নি ঠিকই, কিন্তু কুয়াশার মাঝ দিয়ে অন্ধকার ভেদ করে আসতে থাকা ছায়াগুলোকে সে-ই প্রথমে দেখতে পায়।
“তৈরি হও! তৈরি হও সবাই,” চিৎকার করে সতর্ক বাণী পাঠাল হাল। আর তখনই অন্ধকার ভেদ করে বন্দুকের গুলির শব্দ পাওয়া যায়। বন্দুকের গুলির আলোয় শত্রু পক্ষের মুখ সে প্রথমবারের মতো দেখতে পায়। হাল এরই মধ্যে ওপর থেকে নামতে শুরু করে দিয়েছে।
.
সে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাল কারণ অ্যামাডোডা উপজাতিরা খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। আর তাই, সবার আগে এই লোকগুলো দ্রুত লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হয়ে যেতে পারল। উপজাতীয়রা লাঠি, বর্শা, কুঠার এসব হাতে নিয়ে প্রস্তুত হতে থাকে। মাস্তুল থেকে প্রায় অর্ধেকটা পথ নেমে যার পর সে বুঝতে পারল যে যারা আক্রমণ করতে এসেছে তাদের হাতে ভারী অস্ত্র রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে পিস্তল আছে, সেই সাথে কাঁধে ঝুলানো আছে আরো এক জোড়া। যখন হাল নিচের দিকে তাকায়, সে দেখতে পায় যে শক্রর ছোঁড়া বুলেট একজন অ্যামাডোডার বুকে বিঁধেছে। লোকটি ডেক-এর ওপর পড়ে যায়, তার চোখের বল ঘুরে গিয়ে সাদা অংশ সামনে চলে আসে।
আর পাঁচ ফিট বাকি থাকতেই লাফ দিয়ে ডেক-এর ওপর নেমে আসল হাল। যখন সে পাটাতনের ওপর পা রাখল তখনই তার মনে হলো যে সে অস্ত্র শূন্য। কেবিন থেকে বের হওয়ার সময় তার পিস্তল এবং তলোয়ার দুটোই আনতে ভুলে গিয়েছে সে।
“গান্ডওয়েন, এটা নাও!” হাল ঘুরে তাকিয়ে অ্যাবোলির ছুঁড়ে দেয়া তরবারির বাঁটটা দ্রুত ধরে ফেলে। এরপর তরবারি হাতে সে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমেই একজনের মুখে আঘাত করে, এরপর অন্য একজনের পেটে সজোরে ঢুকিয়ে দেয় ধারালো প্রান্তটা।
